প্রথম পাতা » জীবনযাপন » একটি আসক্তির হিসাব-নিকাশ

একটি আসক্তির হিসাব-নিকাশ

screen time

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে আমি মোবাইলে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছি। এতো বেশি সময় কাটাচ্ছি যে এটাকে আসক্তি হিসেবে ট্যাগ করা যায়। কত বেশি সময় কাটিয়েছি বা কাটাচ্ছি তা এখন চাইলেই বের করা যায়। অনেক ফোনেই Digital wellbeing and parental controls নামে একটা ব্যাপার থাকে। একেক ফোনে একেক রকম নাম থাকতে পারে এই অ্যাপসটার কিন্তু কাজ বলা চলে একই। আপনি আপনার মোবাইলে কতটুকু সময় কাটালেন, আপনার স্ক্রিন টাইম কত ঘন্টা এসবের হিসাব রাখা। আমার ফোনেও এই জিনিসটা আছে।

এই অ্যাপস টার হিসেব অনুযায়ী আমি গত পাঁচ দিনে মোট ৩৫ ঘন্টারও অধিক সময় ব্যয় করেছি ফোনে। গড়ে ৭ ঘন্টার মতো। এই পাঁচ দিনের মধ্যে আমি সর্বোচ্চ ৯ ঘন্টা সময় ব্যয় করেছি ১০ এপ্রিল। এই দশ তারিখের হিসেব অনুযায়ী আরো যা আমি জানতে পারলাম তা হল এই দিনে আমি ৬৫ বার ফোন আনলক করেছি, ১৪০ বার ফেসবুক খুলেছি, মেসেঞ্জার খুলেছি ৮৫ বার আর গুগল ক্রোম খুলেছি ২১ বার। এসব ফিরিস্তি বাদেও আমি এই দিনে নোটিফিকেশন পেয়েছি ২৬৮ টি।

আমি জানি আপনারা এই পরিসংখ্যান দেখে অনেক বিরক্ত হচ্ছেন। আমি কোথায় কিভাবে সময় নষ্ট করেছি তা আপনাদের জেনে কি হবে। আপনারা আমার মত না তা জেনেই এই লেখা লিখছি। আমার মত কেউ যদি এই লেখা পড়ে নিজের সময় নষ্ট করার চিত্রটা আমার অকাজের ফিরিস্তিতে প্রতিফলিত দেখতে পায় আর একটা উপলব্ধি ধরনের কিছু আসে তাহলে খারাপ কি! উপলব্ধি মানে স্ক্রিন টাইম কমানো। আসক্তি কমানো।অপ্রয়োজনীয় কাজ কমানো। এই আর কি।

যাই হউক, আমার নিজের এই আসক্তি কিভাবে কমানো যায় সেটা জানার জন্য ভাবলাম একটু গুগল করি। গুগলে গিয়ে অনেক উপায় উপায়ন্তর দেখলাম। কিছু কাজের আর কিছু কাজের না বলে মনে হল। গুগল ছাড়াও আমার নিজের মনেও কিছু সমাধান বা উপায় মাথায় আসলো। ভাবলাম এই সব ব্যাপার নিয়ে আমি একটা ফর্দ তৈরী করি। কিভাবে ফোন আসক্তি কমানো যায়, কিভাবে স্ক্রিন টাইম কমানো যায়, কিভাবে ফোনের পর্দার বাইরের জগত টা কে চোখ মেলে দেখা যায় এইসব ব্যাপারে আর কি।

প্রথমেই দার্শনিক ধরনের একটা কথা মাথায় আসলো। জীবনের একটা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ঠিক করুন আর তা মনের এবং মাথার পর্দায় সবসময় আটকায়ে রাখুন। এই লক্ষ্যের কথা আপনার মনে থাকলে আজেবাজে উলটা পালটা কাজে সময় দেয়ার চিন্তাও মাথায় আসবে না বলে আমার বিশ্বাস। তবে এই লক্ষ্যের কথা ভুলে গেলে হবে না। মনের অলিগলি খুব চিকন আর সূক্ষ্ম। একটু চিন্তা ভাবনা করেই চলতে হবে আর কি।মন চাই বলতে একটা কথা আছে না! মন চাই চললেই বিপদ। মনের উপর লাগাম দিতে হবে যদিও মনটা ঘোড়া না। কিন্তু লাগাম বেশ কাজ করে বলে আমার বিশ্বাস। চাবুকও কাজ করে। এই চাবুক আর লাগামের ব্যাপার হল নিয়ন্ত্রন। জানেন আপনারা। মোদ্দা কথা নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রন থাকলে এতো কথার দরকার নাই। কিছুই আপনার উপর নিয়ন্ত্রন নিতে পারবে না। সামান্য ফোন তো নস্যি। আপনি হবেন দস্যি। মজা করলাম।

নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রন আনা সহজ বললে ভুল হবে। তাহলে আমার মত একদিনে ৯ ঘন্টা স্ক্রিন টাইম ওয়ালা লোক থাকত না।এই নিয়ন্ত্রন আনা কঠিন কিন্তু অসম্ভব না। নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রন আনার মূল অস্ত্র হল আত্মসচেতনতা। Self-awareness। এটার মানে যেমন অনেক ঘুরায়ে প্যাচায়ে বলা যায় তেমনি সহজেও বলা যায়। আমি সোজা মানুষ। তাই সহজে বলব। সহজ কথা সহজে বলা না গেলেও আমি সহজে বলার চেষ্টা করব। চেষ্টায় দোষ দিতে পারবে না কেউ।

আপনি কী ভাবছেন, আপনার মন কোথায় কোথায় ঘুরতে যেতে চায়, আপনার মনে কি চিন্তার উদয় হয় আর অস্ত যায়, ইতিবাচক-নেতিবাচক হাজারো কথা মনের মধ্যে আসা যাওয়া করে, এইসব গাছের উপর থেকে বসে বসে দেখতে পারার নামই  আত্মসচেতনতা। গাছটা হল মনের উপরের মন। আপনার  Watch Tower

এটা করা গেলে ভালো মন্দ বুঝতে পারা যাকে বলে ওয়ান টুর ব্যাপার। ভালো মন্দের ফারাক বুঝতে পারাই আসল জ্ঞান। এই জ্ঞান থাকলে ফোনে আসক্তি এমনিতেই আসার কথা না আর আসলেও দূর করা অতি সহজ ব্যাপার হয়ে যাবে।

এই করোনা কালে মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা একটা চ্যালেঞ্জ তা সবাই মানবে আশা করি। এই মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে বই পড়ার উপকারিতা যে অনেক তাও সবাই মানবে বলে আমার আশা। বই পড়ায় সময় দিতে পারলে মোবাইলে আসক্তি কমে যাবে। আবার মোবাইলেই বই পড়তে যাবেন না দয়া করে। কাগজের বই পড়েন। নিদেনপক্ষে, আমার মত যাদের স্ক্রিন আসক্তি চরম তাদের কাগজের বই পড়াই ভাল বলে আমার মনে হচ্ছে। তাছাড়া ফোনে বই পড়ায় আমি কোন আপত্তি দেখি না। ই বুক, পিডিএফ বুক এমনকি অডিও বুক সবই পড়া এবং শোনা যেতে পারে। কিন্তু আপনি যদি আমার মত শুধু ফেসবুক আর এরকম ধরনের রোগে আসক্ত থাকেন তাহলে এসব বই পড়ার ছলে চলে যাবেন ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করতে এই আর কি!

অনেকে বলবে মরব কিনা বাঁচব তার নাই ঠিক এরমধ্যে এসব কথা শুনে আর কি হবে আর বই পড়েই বা কি হবে। আপনার কথার সাথে আমি একমত। কিন্তু যতক্ষন বেঁচে আছেন একটু ভাল থাকার চেষ্টা করলে তো দোষের কিছু দেখি না আমি। যখন মরব তখন তো মরবই।একটা কথা আছে Live in the Moment. এই ভারী কথার মানে আমি না বুঝলেও “যতক্ষন শ্বাস ততক্ষন আশ” এই কথার মানে আমি বুঝি। প্রতিটা মূহুর্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটা সেকেন্ড দামি। আর আমি ৯ ঘন্টাই কাটাই মোবাইলের চেহারা দেখে দেখে। আফসোস।

ইন্টারনেটে আরো অনেক কথা বলেছে আমার এসব কথার বাইরে। তার দুই একটা কথা বলি-

১- আপনি কত সময় ফোনে কাটাবেন তার একটা পরিকল্পনা করে নিন। দিনে ২ ঘন্টা নাকি ৩ ঘন্টা নাকি আরো কম বা বেশি। মানে হিসাব নিকাশ করে একটু ফোনটা চালাতে হবে। একটা গান আছে না “আমি পড়ি নাই, প্রেমই আমার উপর পড়েছে। মানে ফোন আপনাকে চালাবেনা আপনি-ই ফোন কে চালাবেন। কথার মিল হল কিনা জানি না। মোদ্দা কথা নিজের উপর নিয়ন্ত্রন আনতে হবে।

২- আপনি যদি কম ফোন ব্যবহার করতে পারেন তাহলে নিজেকে পুরস্কার দেবেন বলে চিন্তা করে রাখেন। পুরস্কারের আশায় আপনি ফোন কম ব্যবহার করবেন। এটা কতটুকু কাজ করবে জানি না। তবে পুরস্কার পেতে সবার ভাল লাগে। কিন্তু নিজের কাছ থেকে নিজের পেতে কেমন লাগবে তা জানি না। আমি নিজেকে কখনও পুরস্কার দেই নাই।তবে এবার এই বুদ্ধিটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করব। একটা কথা, যে পুরস্কারই নিজেকে দেন না কেন নতুন একটা ফোন আবার পুরস্কার হিসেবে দিয়েন না।

৩- একদিনের জন্য ফোনের কাছ থেকে ছুটি নিতে পারেন। ছুটির দরখাস্ত করার দরকার নাই। শুধু ফোনটা বাসায় বা অন্য কারো জিম্মায় রেখে বের হয়ে যান একদিনের জন্য বা যতটুকু সময়ের জন্য গেলে ভাল বলে মনে হবে আপনার। ফোন ছাড়া আশেপাশে একটু ঘুরেফিরে দেখেন। ফোনে কেউ ফোন দিল কিনা, কিছু একটা মিস করে ফেললেন কিনা, কোন মেসেজ আসলো কিনা এরকম চিন্তা আসবে। পাত্তা দিয়েন না। ফোনের কাছে গিয়ে হয়ত দেখবেন কেউ আপনার খবর নেয়নি। আর ফেসবুকে উথাল পাথাল শুরু হয়নি।

আরো এরকম অনেক কথা আছে বলা। অত কথায় আর যাচ্ছি না। নিজের পরিবারের সাথে যাকে বলে Quality Time কাটান। নিজেকে নিয়ে জানালার পাশে বসে চিন্তা করেন, ছাদে গিয়ে কবুতরের উড়াউড়ি দেখেন, দেখেন কেউ ঘুড্ডি উড়াচ্ছে কিনা, আরো অনেক কিছু দেখতে পারেন। এসব কেমন শুনালো জানি না। সবাই এরকম কথাই বলে টাইপ এসব কথা। আমার কথা ভাল না লাগলেও ভেবে নিয়েন আমার নিয়ত ভাল। ফোনে আসক্তি কমে যাক। আমার এবং আমার মত সবার।

  •  
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



One thought on “একটি আসক্তির হিসাব-নিকাশ

  1. আত্ম-উপলব্ধির চমৎকার একটি লেখা। ল্যাপটপে আমার অনেক সময় ব্যয় হয়। বাস্তব জগতে ফিরে আসতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *