প্রথম পাতা » মতামত » বাংলা উচ্চারণ

বাংলা উচ্চারণ

pronunciation

দেশ-কাল-সমাজের নানাবিধ সংস্কার-আচার বিষয়ক কথামালা লিখে আর লাভ নেই। মাস্টারি করে খাই। তাই ভাবলাম সীমিত পরীক্ষাবিহীন পড়ালেখার যুগে ফেসবুকে একটু জ্ঞান কপচাই। আমি ছোটোবেলায়ই ফেসবুকের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলনকে অপপ্রয়োগ এবং সময়ের অপচয় বলেই সাব্যস্ত করেছি। আমি আগেই বুঝেছিলাম, যে বাঙালি চকলেট কামড়ায়ে খায় তাদের অচিরেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। ফেসবুক এখন জাতির এক মহাগুজব ও গজবীয় কালচারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাঙালির হাতে যে জিনিস একবার পড়েছে তার তো ষোল আনাই নিষ্ফল। আমরা এখন একটি টিকটক জাতিতে পরিণত হয়েছি। বাংলাদেশে ফেসবুকের এটিই হলো বিরাট অর্জন।

বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উচ্চারণ। ইন্টারমিডিয়েটে এর ওপর ৫ নম্বর বরাদ্দ। কেউ চাইলে উচ্চারণ পড়িয়ে কলেজে এক বছর কাটিয়ে দেওয়া যায়। বহু নিয়ম এবং ব্যতিক্রম পড়াতে অনায়াসে ছয় মাস পার করা কোনো ব্যাপারই না। বাংলাদেশে নাকি উচ্চারণে ভালো ক্লাস নিতেন নিরঞ্জন অধিকারী। তিনি গত হয়েছেন। আজ আমরা উচ্চারণের ভূমিকা নিয়ে কথা বলব। আরেকটি ক্লাসে এর নিয়ম নিয়ে আলোচনা হবে।

বাংলা ব্যাকরণে আরেকটি বিষয় আছে ধ্বনির পরিবর্তন। আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানে একজন স্যার এবং একজন ম্যাডাম পড়াতেন। একদিন স্যারকে বললাম প্রকৃতি প্রত্যয় বুঝিনা। পড়াবেন স্যার? সেদিন কী হয়েছিল জানি না। অজানা কারণে ক্লাসের সবাই মার খেলো! প্রকৃতি প্রত্যয় শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরীর বইয়ে আর্তনাদ করতে থাকল। আরেকদিন ম্যাডামকে বললাম ধ্বনির পরিবর্তন বুঝতে পারছি না। তিনি কিছুক্ষণ বুঝালেন। আমি খারাপ ছাত্র। তাই তিনি হাল ছাড়লেন। আমি বললাম ম্যাডাম রিক্সা কেন রিস্কা হলো? তিনি বললেন- এইডা এমনেই হইছে!

উচ্চারণ ভুলের অন্য একটি কারণ হলো স্লিপ অব টাঙ্ক। দ্রুত উচ্চারণের কারণেও এমনটা হয়। আঞ্চলিকতার প্রভাবেও চা, সমুচা ছা কিংবা সমুছা হয়ে যায়! অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ ধ্বনির জটিলতার কারণেও উচ্চারণ ভুল হয়। যখন কোনো মহামান্য উচ্চারণে আঞ্চলিকতা আনেন তখন তা শিল্পে পরিণত হয়। আমাদের বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মহামান্য আবদুল হামিদ উচ্চারণে ব্যাপক আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করতেন। কিন্তু বিষয়টি আমরা ইতিবাচক ভাবেই নিয়েছি। আবার যারে দেখতে না রি তার চলন বাঁকা সূত্রে ঢাবির ভিসি স্যার চা সমুচার গ্যাঁরাকলে পড়ে প্রচ্চুর সমালোচিত ও ট্রলের শিকার হয়েছেন। ফেসবুক আমাদের ট্রল করা শিখিয়েছে। বয়োবৃদ্ধ, মুরুব্বি বলতে আর কিছু নেই। একসময়ের মহাতারকা আবুল হায়াত, আনোয়ার হোসেন যাঁরা বাংলা নাটক সিনেমায় রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর এই জাতি তাঁদের ‘আমেনার বাবা’ বানিয়ে মজা পায়। বাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই জানে তারা কেবল দরিদ্র চরিত্রে অভিনয় করা হার্টের রোগী। অথচ আনোয়ার হোসেন শেষ স্বাধীন নবাব! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, তুখোর রাজনীতিবিদ, পণ্ডিত, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা সকলকেই হাসির পাত্র বানানো হয় সহজেই। নিজের আইডলজি, মত, দলের বিপক্ষে গেলেই তাকে নিয়ে মজা করো, ট্রল কর, হাসাহাসি করো। এতোটা হালকা আর চটুল বোধে আমরা আক্রান্ত যে ক্রমশ ভয়াবহতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এদেশে আজ আর এমন একটি চরিত্রকে অবশিষ্ট রাখা হয়নি যাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। এমন কেউ নেই যে একটা কথা বললে পুরো জাতি সে কথাটি মনোযোগ দিয়ে শুনবে। কোথাও কেউ নেই।

ছোটবেলায় একটি লাইব্রেরির সামনে দিয়ে প্রায়ই হেঁটে যেতাম। সেখানে বই পড়া নিয়ে একটি উক্তি ছিল প্রমথ চৌধুরীর। আমি নিজের মনে কতবার প্রশ্ন করেছি প্রথম চৌধুরী আবার কেমন নাম? ক্লাস টেনে পড়ার সময় মারাত্মক ভুলটি ধরা পড়ে। আমি দীর্ঘসময় প্রমথ চৌধুরীকে প্রথম চৌধুরী পড়েছি।

ফেসবুকে অনেকের লেখা দেখি। কিছ কিছু পড়ি। এই জাতির মিনিমাম ৪০% লোক জানে না কোথায় ‘ই’ এবং কোথায় ‘য়’ বসাতে হয়! এরা যা লেখে তার আশিভাগ বানান ভুল। এদের চিন্তায় ভুল, কর্মে ভুল, জীবনজুড়ে শুধু ভুল আর ভুল। ভুল করাটাও স্বাভাবিক। মানুষের ভুলেই তো কতকিছু। ভুলকে স্বীকার করার মাধ্যমেই সত্যকে পাওয়া যায়। কিছু কিছু ভুল কখনো ফুল হয়েও ফোটে।

সংবাদে কখনো চোখে পড়ে পিতার কাছে কন্যার নিরাপত্তাহীনতার কথা। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি এ জাতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। এরা মুখে যতটা ধর্মের স্লোগান তোলে জীবন যাপনে তার ছিঁটেফোটাও নেই। বাঙালি এতিমের হক নষ্ট করতেও ছাড়ে না। ভাই তার বোনের হক বুঝিয়ে দেয় না। পিতা তার কন্যার ভাগ দেয় না। স্বামী তার স্ত্রীর হক আদায় করে না। সিন্ডিকেট দেশটা ফাক করে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহ অবস্থার জন্য লোভী, চতুর বঙ্গীয় মুসলমানেরাই দায়ী বেশি। এদের জাতীয় ক্রাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃখ জনাব জায়েদ খান। এদেশের প্রধান নায়ক একজন অবিবাহিত অথচ দুই ঘরে দুই সন্তানের গর্বিত পিতা! তার সাথে ছবিতে নাম লেখালেই নাকি ‘বাবু’ হয়!

প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন বাঙালি সারাজীবন ভুলভাল উচ্চারণ করে একটি ছোট মেয়ের একটি কথায় তারা ব্যাপক ভুল খোঁজে পেয়ে ফেসবুকে ট্রল করে, ব্যক্তিগত বুলিং করে তার জীবনটা নরক বানিয়ে তুলেছে। যে বাঙালি সাপকে হাপ কয়ে জীবন পার করল সে-ও নাকি খুব মজা পেয়েছে! ঐ মেয়েটি ছাড়া এই জাতির কেউ কোনোদিন ‘কেন্দে দিয়েছি’ বলেনি! মানুষ কতোটা অসভ্য বর্বর হলে সাকিব আল হাসানের মেয়েকে একবার কী একটা ক্ষেতকে পাটক্ষেত বানিয়ে কী সব মম্তব্য করেছিল! এদের কাছে মা, মেয়ে, সন্তানের কোনো মূল্য নেই!

অবদমনের অভাবে ধ্বজরোগে আক্রান্ত এই জাতির মুক্তি যে নেই তা সহজেই বুঝা যায়। এই জাতিকে এখন ক্ষয়রোগে ধরেছে। এদের উচ্চারণ শিখিয়ে বিশেষ লাভ হবে না।

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *