প্রথম পাতা » গল্প » বিদ্যাভবন লাইব্রেরী

বিদ্যাভবন লাইব্রেরী

Library

পাকুটিয়া বাজারে মোটামুটি বড়সড় একটা লাইব্রেরী হয় ১৯৯৯ বা ২০০০ সালের দিকে মনে হয়, বা তারও আগে বা পরে৷ সঠিক সাল মনে নাই৷ নাম বিদ্যাভবন লাইব্রেরী৷ মালিক জনাব রুহুল আমীন৷ আসামের হাইলাকান্দি জেলায় এই নামে একটা লাইব্রেরী আছে৷ এটা পরে জেনেছি৷ বেশ অনেকদিন পুরোদমে টিকে ছিল পাকুটিয়ার এই বিদ্যাভবন লাইব্রেরীটি৷ এখন আর নাই-ই বলা চলে ৷ সেখানে হয়েছে এখন একটা দুই তলা বিল্ডিং৷ লাইব্রেরীর জায়গায় কাপড়ের দোকান৷ উপরের তলায় সোনালী ব্যাংক৷ এই সোনালী ব্যাংক আগে আমাদের বাসার পাশের টিন শেড দেয়া আধা-পাকা ঘরে ছিল৷ এখানে যখন ব্যাংক ছিল তখন একবার ডাকাত পড়েছিল৷ আমি তখন স্কুলে যাওয়াই শুরু করি নাই৷ ডাকাতির ঘটনা আরেকদিন বলবো৷ এখন বিদ্যার কথা, বিদ্যাভবনের কথা৷ কুবিদ্যার কথা, ডাকাতির কথা গৌণ৷ পরে বললেও চলবে৷ বিদ্যাভবন লাইব্রেরীটি আগে ছিল টিনের ঘরে৷ এটা স্কুল কলেজের বই বিক্রি করা লাইব্রেরী ছিল৷

এই লাইব্রেরী হওয়ার আগে বই কিনতে যেতে হতো নাগরপুর নাহয় সাটুরিয়া৷ বিদ্যাভবন লাইব্রেরীতে ফটোকপিও করা হত৷ পাকুটিয়া বাজারের প্রথম ফটোকপির মেশিন এটা। প্রথম প্রথম দাঁড়িয়ে থেকে ফটোকপি করা আগ্রহ নিয়ে দেখতাম৷ আমরা বেশির ভাগ বই বিদ্যাভবন লাইব্রেরী থেকেই কিনতাম৷ একটু বেশি দাম হলেও৷ দামে কম কিনতে চাইলে অনেকে চলে যেত সাটুরিয়া বা নাগরপুর৷ তখন বাস চলাচল শুরু হয়ে গেছে এই লাইনে ৷ জনসেবা নামে বাস সার্ভিস৷ জনসেবা নাম বদলায়ে এখন হয়েছে এসবি লিংক৷ সার্ভিস আগের মতোই খারাপ৷ ভাল হয়েছে কিনা জানা নাই৷ অনেকদিন এই বাসে যাওয়া আসা করি না৷

আমি যেসব বই বিদ্যাভবনে পেতাম না সেসব বই কেনার জন্য যেতাম সাটুরিয়া, জনসেবা বাসে চেপে৷ ছাত্র ভাড়া দিতাম ৬ টাকা৷ ফুল ভাড়া ১২ টাকা৷ বাসে হাফ ভাড়া দেয়ার জন্যই স্কুল থেকে আইডি কার্ড করে নিয়েছিলাম৷ নাগরপুর খুব কম যাওয়া হতো৷ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না৷ তখনো কেদারপুরের কাছে ধলেশ্বরী ব্রিজ হয়নি৷ “গোদারা ঘাট” থেকে খেয়া নৌকা পার হয়ে যেতে হতো নাগরপুর, মাঝপথে উত্তপ্ত ধুধু বালির চর পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হতো। যাহোক, অনেক সময় বই না কিনতে পারলে বিদ্যাভবন লাইব্রেরীতে গিয়ে বসে বসে বই পড়তাম৷ মালিক সম্পর্কে লাগে চাচা৷ রুহুল আংকেল ডাকতাম৷ রুহুল আংকেল আমাকে দোকানে মাঝেমাঝেএকা বসিয়ে রেখে নামাজ বা খাওয়ার জন্য চলে যেতো৷ আমি বসে বসে বই পড়তাম আর দুই একটা খদ্দের আসলে কথা বলতাম৷ এই লাইব্রেরীতে তখন গ্রামীণ ব্যাংকের ফোনও চলতো৷ মিনিটে ১৪ টাকা দিয়ে কথা বলতে হতো৷ ইনকামিং কলেও টাকা দিতে হতো, মিনিটে ৭ টাকা৷

আমি অংকের গাইডবই পড়তাম না বা কিনতাম না৷ অংকের জাহাজ ছিলাম বলতে পারেন৷ জাহাজের বাঁশি নিজেই বাজালাম! কিন্তু যদি অংক করতে করতে আটকে পড়তাম চলে যেতাম বিদ্যাভবনে৷ গাইডবই বের করে অংকের সমাধান দেখে নিতাম৷ গাইডবই কেনার দরকার হতো না৷ এভাবে বেশ অনেকবার বিনা পয়সায় অংকের সমাধান দেখে নিয়েছি৷ আমার বাসা থেকে লাইব্রেরীতে যেতে এক মিনিটও লাগে না৷ আমাদের বাসা পাকুটিয়া বাজারের মাঝখানে৷

এই লাইব্রেরীতে প্রায়শই বসে থাকতেন বর্তমান পাকুটিয়া ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান জনাব সিদ্দিকুর রহমান৷ আমাকে দেখলেই রসিকতা করে আট নম্বর ডাকতেন৷ আমি ছাত্র হিসেবে এক নম্বর তা তিনি জানতেন৷ এই আট নম্বরের মানে আমি বুঝতাম না৷ জিজ্ঞেস করার সাহস বা দরকার মনে করতাম না৷ ক্লাস সিক্স কি সেভেনের ছাত্র ৷ ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়া৷ আবার ক্লাস এইটেও ট্যালেন্টপুলে নাগরপুর থানায় প্রথম হয়ে বৃত্তি পাবে বছর দুই পরেই৷ এরকম ছেলেকে ডাকে কিনা আট নম্বর!! বুঝে আসতো না৷

যাই হউক, প্রথমে বুঝতাম না এই আট নম্বরের মানে কি? আরেকজন ছিলেন যিনি আমাকে আট নম্বর বলে মসকরা করতেন৷ হলুদ কাপড় পড়ে থাকতেন৷ সবাই তাকে একু পিশশাব ডাকতেন৷ টাংগাইলের আঞ্চলিক ভাষায়৷ আসল নাম ইয়াকুব সাহেব৷ পীর সাহেব বলতেন অনেকেই৷ হাড়িপাড়া পীর সাহেবের মুরিদ ছিলেন মনে হয়৷ খড়ম আর হলুদ কাপড় পরে থাকতেন৷ হাতে থাকত একটা বেতের কালো লাঠি৷ ছোটবেলায় এই লাঠি দিয়ে আমাকে আর রতন নামে আমার এক বাল্যবন্ধুকে একু দাদা দাবড়ানি দিয়েছিলেন৷ উনার বাড়ির পাশে ব্রিজের ধারেই একটা আতা ফল গাছ ছিল৷ সেই ফল গাছের ফল পেড়েছিলাম বলে দাবড়ানি৷ কিন্তু ধরতে পারেন নাই৷ পোলাপানের দৌড়ের সাথে মুরুব্বিদের পারার কথা না৷ এসব ছোটবেলার কথা৷

একু দাদা পরলোকগত অনেক আগেই৷ ভাগ্যিস তার আগেই উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দাদা আট নম্বরের মানে কি? সম্পর্কে দাদা লাগতেন৷ ঠাট্টা মসকরা করা একচেটিয়া অধিকার আছে৷ উনি বললেন বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের আট নম্বর বর্ণ কি? আমি কড়ি গুনে বললাম বর্গীয় জ। একু দাদা বললেন জ তে জোলা৷ আমাকে জোলা বলে মসকরা করতেন, আমার দাদা এক সময় নাকি কিছুদিনের জন্য তাঁত বুনিয়েছিলেন তাই৷ আমরা তাঁত বুনাতে দেখি নাই৷

সিদ্দিক দাদাও তাই আট নম্বর বলে রসিকতা করতেন।। ইনিও সম্পর্কে লাগেন দাদা৷ দাদা নানাদের রসিকতা তামাশার সীমা নাই৷ কানে ময়লা নাই, নানা দাদারা বলবে নাতি তোর কানে মাটি৷ নাতীরা সরল বিশ্বাসে কান ডলাডলি শুরু করে দিতো মাটি পরিষ্কার করার জন্য৷ আসলে কানে মাটি নাই৷ দাদা নানারা ঠাট্টা চালাকি করে কান ডলিয়ে নিলেন নাতীদের৷ ডলা খেয়ে কান যতো লাল হবে নানা দাদার মজা ততো বেশি৷ দাদিরা নানীরা এরকম করে না৷ এটা একটা পার্থক্য৷

যাই হউক ঠাট্টা করা জোলার ইতিহাস আরেকদিন বলা যাবে৷ জোলাদের নিয়ে অনেক গল্প আছে৷ সবার কম বেশি জানা৷ বিশেষ করে বোকা জোলা আর ভূতের গল্প৷ লোককথায় জোলাদের সাধারণত বোকা হিসেবেই দেখানো হয়েছে। আমার কাছে কয়েকটা বই আছে এই জোলাদের ইতিহাসের উপর৷ আট নম্বর শুনে শুনে বড় হওয়ার পর আট নম্বরের মর্মার্থ বুঝতে বই কিনে ফেলেছি জ্ঞান বাড়ানোর জন্য৷ তাছাড়া ইন্টারনেটের সুবাদেও অনেক ইতিহাস আর তথ্য পাওয়া গেছে৷ মসকরা করা মুখের কথায় বিশ্বাস অবিশ্বাস এর ব্যাপার করে লাভ নাই৷ প্রামাণিক, নির্ভর করা যায় এরকম বই এর উপর আস্থা রাখাই ভালো৷ সেসব পুঁথিগত বিদ্যা আর ইতিহাস আরেকদিন বলা যাবে৷

তবে একটা সময় গ্রামে গঞ্জের প্রায় সবাই খেত খামারের কাজ যখন কম থাকতো তখন তাঁত বোনাতো ৷ একারনে প্রায় ছোট বড় সব গেরস্থ বাড়িতেই দুই একটা তাঁত থাকতো৷ লুঙ্গিই বেশি বোনা হতো, নিজেদের পড়ার জন্য পাশাপাশি দুই একটা যদি বিক্রি করা যেতো। আমার দাদার বাড়িতেও হয়তোবা তাঁত ছিল৷ দাদা বেঁচে নাই৷ সেসব কথা জানার উপায় নাই৷ মুরুব্বিরা কেউ জানলে জানাতে পারেন আমাকে৷ আর আমাকে আবিব জোলা বলে ঠাট্টা মসকরা করলেও আমি কিছু মনে করব না৷ সিরিয়াসভাবে করলেও না৷ এমিল জোলা নামে বিখ্যাত ফরাসি লেখকের নামের সাথে মিল হয়ে যাবে বলে খুশিতে টগবগ করবো৷

এখন বিদ্যাভবনের ফিরিস্তি বলি৷ অবশ্য আর তেমন ফিরিস্তি নাই৷ বেশ অনেকদিন চলে লাইব্রেরীটা বন্ধ করে দিলেন রুহুল আমীন আংকেল৷ ঠিক নাকি বন্ধ হয়নি৷ কাপড়ের দোকানের পাশাপাশি যাকে বলে সিজনাল স্কুল কলেজের বই বিক্রি হয় বছরের শেষের দিকে৷ কেন এরকম হয়ে গেল জানি না৷ এক প্রকারের বন্ধ হয়ে গেলেও এই লাইব্রেরীটা আমাকে জ্ঞান অর্জনে অনেক সাহায্য করেছে৷ অংকের সমাধান বিনা পয়সায় গাইডবই থেকে করার ব্যাপার তো আছেই৷ আরো অনেক প্রচ্ছন্ন জ্ঞান এই লাইব্রেরীটি আমাকে দিয়েছে৷ তার জন্য কৃতজ্ঞতা৷ লেখাটি পাকুটিয়ার অনেকেই পড়বে৷ কৃতজ্ঞতা পৌছে যাবে৷

পাকুটিয়াতে এখন বলার মতো তেমন কোন লাইব্রেরী নাই৷ একটা ভাল মানের লাইব্রেরী থাকা বেশ জরুরি৷ স্কুল কলেজের বই বিক্রি করে এমন একটি পরিপূর্ণ লাইব্রেরী হলেও৷ পাঠাগার বা গণপাঠাগার হলে তো আরো ভালো৷ বই আর পাঠাগারের গুরুত্ব বুঝাতে বেশি কথার দরকার হয়না৷ সবাই এক বাক্যেই গুরুত্ব মেনে নেয় আর বুঝে যায়৷ একটি লাইব্রেরী হউক পাকুটিয়াতে৷ একটি কেন দশটা হউক৷ আরো বেশি হউক৷ আলো আসুক চারদিক থেকে৷ দেশের আনাচে কানাচে আলো ছড়িয়ে যাক৷ দেশের সব জায়গায় লাইব্রেরী হউক৷

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *