থানার ডিউটি অফিসার আমাকে বলেছিলেন, চব্বিশ ঘণ্টা দেখেন। বাচ্চা রাগ কইরা কোথাও হয়তো গেছে, ঠিকই ফিরা আসবো।
আমার ছেলে ফিরেছিলো।
ঠিক একচল্লিশ দিন পর। আমার দোকান থেকে সাতশো গজ দূরের একটা আধাপাকা বিল্ডিংয়ের নিচতলা থেকে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, তার আঠারো দিন আগেই ও মারা গিয়েছিলো।
ওই আঠারো দিন আমরা বিকাশে ওর মুক্তিপণের টাকা পাঠিয়েছি।
আমার দোকান বনশ্রীর সি ব্লকে। মোবাইল ফোন, কাভার, চার্জার আর ফ্লেক্সিলোডের দোকান। বারো বছর ধরে ওই এক জায়গাতেই বসি। এলাকার লোকে আমাকে নামে না চিনলেও, ফোনের দোকানদার হিসেবে ঠিকই চেনে।
আরহামের স্কুল ছুটি হতো পৌনে দুইটায়। বাসায় না গিয়ে ও সোজা দোকানে চলে আসতো। স্কুলব্যাগটা কাউন্টারের নিচে ছুঁড়ে ফেলে টুলে উঠে বসতো। তারপর আপনমনে গোছাতে লেগে যেতো চার্জারের বাক্স।
ওর বয়স সাত। পড়ে ক্লাস টু’তে। গোছানোর নামে জিনিসপত্র আরও এলোমেলো হয়ে যেতো। আমি কিছু বলতাম না।
ওর ডান পায়ের গোড়ালিতে একটা কালো সুতা বাঁধা থাকতো। জন্মের সাতদিনের মাথায় ওর মা বেঁধে দিয়েছিলো, মানুষের নজর যেন না লাগে সেই অভিপ্রায়ে।
ক্লাস টুতে উঠে ছেলেটা লজ্জা পেতে শুরু করলো। একদিন বললো, আব্বু, বন্ধুরা হাসে। খুলে ফেলি?
ওর মা রাজি ছিলো। বাধা দিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম, থাক না বাপ। কী এমন ক্ষতি করতেছে!
দোকানে আমার সাথে একটা ছেলে কাজ করতো। ওর নাম সোহাগ। বয়স হবে তেইশের মতো। বাড়ি জামালপুরে। তিন বছর ধরে কাজ করছে।
দুপুরে আমরা দুইজন একসাথে ভাত খেতাম। দুই ঈদের নতুন জামা আর বোনাস দিতাম নিজের ছোট ভাইয়ের মতো করে।
আরহাম ওকে ডাকতো সোহাগ কাকা। গত ঈদে সোহাগ নিজের টাকায় ওকে একটা খেলনা বন্দুক কিনে দিয়েছিলো।
ঘটনাটা ঘটলো মার্চের দশ তারিখ, দুপুর আড়াইটার সময়।
দোকানে তখন দুইজন কাস্টমার। একজনের সাথে সেকেন্ড হ্যান্ড একটা ফোনের দরদাম চলছিলো।
আরহাম টুল থেকে নেমে আমার পাঞ্জাবি ধরে টান দিলো।
আব্বু, ললি আইসক্রিম খামু।
মানিব্যাগ থেকে তাকে একটা বিশ টাকার নোট বের করে দিলাম।
সোহাগ বললো, মামা, আমি নিয়া যাই। পাশের দোকানই তো।
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। চোখ তখন কাস্টমারের হাতে ধরা ফোনটার দিকে।
ব্যস এটুকুই।
কুড়ি মিনিট পর সোহাগ একা ফিরে এলো। মুখটা তখন তার রক্তশূন্য। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, মামা, আপনার পোলায় তো মাঠের দিকে দৌড় দিলো! আমি পিছন পিছন ছুইটা গেছি, পাই নাই!
আমি দোকান খোলা রেখেই দৌড়ে বের হয়েছিলাম।
সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা পুরো সি ব্লক তোলপাড় করে ফেলেছি। সবার আগে দৌড়াচ্ছিলো সোহাগ। গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছেলেটা হাউমাউ করে কেঁদেছিলো।
সন্ধ্যা ছয়টায় আমি থানায় গেলাম। সোহাগ গেলো আমার সাথে।
ডিউটি অফিসার মুখ তুলে না তাকিয়ে বললেন, এতো অস্থির হওয়ার কিছু নাই! চব্বিশ ঘণ্টা পার হোক।
আমি শঙ্কিত গলায় বললাম, স্যার, বাচ্চাটার বয়স সাত বছর!
উনি খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন, আরে মিয়া, আপনের মতো রোজ দশজন আসে। বাচ্চা হারাইছেন আপনে, আমি কী করমু? যান, নিজেরা খোঁজেন। পাইলে আমারে জানাইয়েন।
জিডিটা লেখাতে দুইদিন লেগেছিলো। মামলা হয়েছে আরও নয় দিন পর, এলাকার এক কাউন্সিলরের হাত ধরে।
মাঝখানের ওই এগারোটা দিন আমার ছেলের খোঁজে কর্তৃপক্ষ এক পা ফেলেনি।
প্রথম ফোনটা এলো তিন নম্বর দিনে। একটা অচেনা নম্বর থেকে।
ওইপাশের গলাটা কেমন ভাঙা ভাঙা।
তোর পোলা আমগো হাতে। চাইর লাখ টাকা লাগবো। আর মনে রাখিস, পুলিশের কাছে গেলে লাশ ফেরত পাবি।
আমি চিৎকার করে বলেছিলাম, ভাই, একবার আমার বাচ্চাটার গলাটা শুনান। একটাবারের জন্য শুনান গো ভাই!
লাইন কেটে গেলো পরমুহূর্তে।
কণ্ঠটা আমার কাছে চেনা চেনা ঠেকেছিলো। আমি ভেবেছিলাম আটচল্লিশ ঘণ্টা না ঘুমানোর জন্য মাথা আউলে গেছে।
বারো বছর ফোনের দোকান চালানো একজন মানুষ এই ব্যাপারগুলো বোঝে।
আমি জানতাম নম্বরটা অন্য কারো এনআইডি দিয়ে তোলা। আমি এও জানতাম বিকাশের প্রত্যেকটা লেনদেনের হিসাব বিকাশের সার্ভারে সাজানো আছে। ট্রানজেকশন আইডি, সময়, ক্যাশ আউটের এজেন্টের নাম, সব কিছু।
তদন্ত কর্মকর্তার হাতে আমি কাগজে লিখে সেই সমস্ত তথ্য ধরিয়ে দিয়েছিলাম।
উনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, প্রসেস আছে ভাই। সিডিআর তুলতে উপরের অনুমতি লাগে। সময় লাগবো।
সেই সময় আঠারো দিনে গিয়ে ঠেকেছিলো।
টাকা আমি দিয়েছি। তিন কিস্তিতে সর্বমোট দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা।
দোকানের সব মাল বিক্রি করেছি। ওর মায়ের কানের দুল গেছে, গলার চেইন গেছে, হাতের দুইটা চুড়ি গেছে। শ্বশুরের কাছে হাত পেতেছি। দোকানের দলিল জমা দিয়েছি ব্যাংকে।
প্রত্যেকবার টাকা পাঠানোর পর ওরা বলতো, আইজ রাইতেই ছাইড়া দিমু। সকালে মোড়ে খাড়াইয়া থাকিস।
আমি চল্লিশটা সূর্যোদয় ওই মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি।
আরহামের মা দশদিনের মাথায় কথা বলা বন্ধ করে দিলো।
সে রোজ সকালে উঠে ছেলের স্কুল ড্রেসটা ইস্ত্রি করে রাখতো। টিফিন বক্সে রুটি আর ডিম ভরে সযতনে ঢুকিয়ে দিতো ব্যাগে।
আমি একদিন মেজাজ হারিয়ে বলেছিলাম, এইসব করতেছো ক্যান? মাথা খারাপ হইয়া গেছে তোমার?
ও শুধু বলেছিলো, ছেলেটা ফিরা আইসা খাইবো কী?
ওই একচল্লিশ দিনে আমি একটা জিনিস অন্তত চার হাজারবার দেখেছি।
দোকানের ক্যামেরার নয় সেকেন্ডের ফুটেজ।
আরহাম বাঁ দিক থেকে ফ্রেমে ঢোকে, হাতে কুড়ি টাকার নোট। পেছনে সোহাগ। দুইজন দরজা দিয়ে বেরিয়ে ডানে মিলিয়ে যায়।
মাত্র নয় সেকেন্ডে!
চার হাজারবার আমি ওই ফুটেজে অচেনা একটা মুখ খুঁজেছি। ব্যাকগ্রাউন্ডে কে দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তায় কোন মোটরসাইকেল থেমে আছে, কার চোখ ছেলেটার দিকে।
প্রত্যেকবার আমার চোখ সোহাগের উপর থেকে অবচেতনভাবে সরে গেছে।
কারণ ওইখানে অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। আমার দোকানের কর্মচারী আমার ছেলের হাত ধরে বের হচ্ছে। এর চেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য আমার জীবনে আর কী হতে পারে?
ওই ফুটেজ সোহাগ আমার পাশে বসে আমার সাথে দেখেছে। ঠিক কতোবার দেখেছে, আমি গুনিনি।
এই কয়দিনে ছেলেটা রোজ দোকানে এসেছে। ঝাঁপি খুলেছে, হিসাব মিলিয়েছে, মোড়ে গিয়ে চা এনেছে আমার জন্য।
দুপুরে আমরা দুইজন এক তরকারিতে ভাত খেয়েছি।
মাছের বড় টুকরাটা ও প্রত্যেকদিন আমার পাতের দিকে ঠেলে দিতো। নরম গলায় বলতো, মামা, আপনে খান। আপনের শরীর ভাইঙ্গা যাইতেছে।
সেই মুহূর্তে আমার ছেলে নিথর দেহে শুয়ে আছে সাতশো গজ দূরে।
পঁয়ত্রিশ নম্বর দিনে পুলিশ এজেন্ট পয়েন্টের ক্যামেরার ফুটেজ চাইলো।
ওইদিনই সন্ধ্যায় সোহাগ দোকান থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি।
ধরা পড়লো তার ছয়দিন পর, জামালপুরে নিজের গ্রামে।
ছেলেটা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য এক দালালকে এক লাখ টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে বসে ছিলো। বাকি চার লাখ না দিলে আগের টাকাটাও জলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো। দালাল নানা প্রকারের ভয়ভীতি দেখিয়ে তার গলা চেপে ধরেছিলো তিনমাস ধরে।
আরহামকে ও নিয়ে গিয়েছিলো ডি ব্লকের একটা আধাপাকা বিল্ডিংয়ে। রাতে ওইখানে কেউ থাকে না। ও ভেবেছিলো মাত্র দুইদিনের মামলা।
জবানবন্দিতে ও বলেছে, বাচ্চাটা কান্না থামাইতেছিলো না। খালি আব্বু আব্বু করতেছিলো। পাশের প্লটে লোক আছিলো। আমি মুখ চাইপা ধরছিলাম শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়া, যতোক্ষণ না পর্যন্ত নিস্তেজ হইয়া আসে! অবশ্য ওরে মারার পরেও ফোন দিছি। টাকাটা তো আমার লাগতোই।
ওই বিল্ডিংটার সামনে দিয়ে আমি রোজ যাতায়াত করতাম।
বিল্ডিংটার দেয়ালে আমি নিজের হাতে আমার ছেলের নিখোঁজ হবার পোস্টার লাগিয়েছিলাম। সোহাগ আঠার ডিব্বা ধরে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো বিষণ্ণ বদনে।
আমাকে ডাকা হয়েছিলো লাশ শনাক্ত করতে।
এর মাঝে আঠারো দিন পার হয়ে গেছে। মুখ দেখে চেনার মতো কিছু বাকি ছিলো না।
ডাক্তার সাহেব চাদর সরালেন।
ডান পায়ের গোড়ালিতে কালো সুতাটা তখনো বাঁধা।
আমি বললাম, জি, এইটা আমার ছেলে।
তারপর ওইখানেই মেঝেতে বসে পড়লাম।
যেই সুতাটা ছেলেটার পা থেকে আমি কাটতে দিইনি, শেষ পর্যন্ত ওইটাই আমার আত্মজকে চিনিয়ে দিলো।
দাফনের পর আরহামের মা তিনদিন একটা কথাও বলেনি। চতুর্থ দিন সকালে উঠে আরহামের স্কুলের শার্ট যত্ন নিয়ে ইস্ত্রি করা শুরু করলো।
আমি দৌড়ে গিয়ে ওর হাত ধরে ফেললাম। ছেলেকে হারাবার পর থেকে আর ওর চোখে চোখ রেখে কথা বলা হয়নি আমার।
সেই মামলার চৌদ্দ মাস পার হলো।
চার্জশিট দিতে সাত মাস লেগেছে। সাক্ষী হাজিরার তারিখ পড়ে, সাক্ষী আসে না। উকিল বলেন, ধৈর্য ধরেন, রায় একদিন হবেই।
যেই ডিউটি অফিসার আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, তার কিচ্ছু হয়নি। উনি এখনো বহাল তবিয়তে সেই থানায় আছেন। একদিন কোর্টের বারান্দায় ওনার সাথে চোখাচোখি হলো।
উনি আমাকে চিনতে পারেননি।
নিখোঁজ হবার পোস্টারে আমার দোকানের নম্বরটা প্রিন্ট করা ছিলো।
পোস্টারগুলো এখনো বনশ্রীর দেয়ালে ঝুলে আছে। রোদে রং উঠে গেছে, কোণাগুলো ছিঁড়ে গেছে।
এখনো মাসে দুই তিনটা করে ফোন আসে। অচেনা মানুষেরা দরদভরা কণ্ঠে বলে, ভাই, পোস্টারটা দেখলাম। বাচ্চাটা কি পাইছেন?
আমি বলি, জি, পাইছি।
বেশিরভাগ মানুষ গলার স্বর শুনেই বুঝে যায়। আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।
মাঝেমধ্যে এমন ফোন আসে, যেখানে ওইপাশের মানুষটার গলা কাঁপে।
ভাই, আমার মাইয়াটারে পাইতেছি না তিনদিন ধইরা। আপনে তো এইসব পরিস্থিতি পার করছেন। আমি এখন কী করমু?
আমি তাদের একটাই কথা বলি।
থানায় গিয়া জিডি না, সরাসরি মামলা করবেন। আর কেউ যদি বলে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, তার কথা বিশ্বাস করবেন না।
ওই নয় সেকেন্ডের ভিডিওটা আমার ফোনে এখনো আছে। অসংখ্যবার চেষ্টা করেও ডিলিট করতে পারিনি।
একটা কথা এতোক্ষণ বলা হয়নি।
আরহাম জানতো, আমি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে নিরাপত্তার খাতিরে দোকানের ক্যামেরা দেখি। তাই দোকান থেকে বের হওয়ার সময় ছেলেটা রোজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তো।
ওইদিনও নেড়েছিলো। ছয় সেকেন্ড পার হবার মুহূর্তে।
আমি তখন ফোনটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন কাস্টমারের সাথে দুইশো টাকা নিয়ে দরদাম করছিলাম।
আমার ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছিলো।
আর আমি একটাবারের জন্য তাকাইনি।
আরহামের বাবা
তাইমুর মাহমুদ শমীক
১৯/৯/২০২৬
ছবি: প্রতিকী
