সন্তান স্বাভাবিক হলে কৃতিত্ব বাবার কিন্তু অস্বাভাবিক হলে দায়টা পড়ে মায়ের ঘাড়ে! সমাজ এখনো এমনই। আর দশটা সন্তানের মতো না হওয়া সন্তানকে শেষ পর্যন্ত বহন করে বেড়াতে হয় মাকেই। বাবারা অনেক কিছু ভুলে যেতে পারেন, দূরে সরে থাকতে পারেন; কিন্তু মা পারেন না। নাড়ির মতোই অচ্ছেদ্য বন্ধনে তিনি জড়িত থাকেন সন্তানের সঙ্গে। সন্তান অস্বাভাবিক হোক কিংবা অমানুষ—মা তার পিছু ছাড়তে পারেন না। আর মা যদি সত্যিকার মা হন, তবে সন্তানকে কখনোই অস্বীকারও করতে পারেন না।
পুরুষের কাছে সন্তান পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে, আবার নাও পারে। কিন্তু মায়ের কাছে সন্তানই পুরো দুনিয়া। তার বেঁচে থাকা, পথচলা, স্বপ্ন দেখা—সবই সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঘিরে। কেউ সন্তানকে কষ্ট দেয়, তার প্রতি অন্যায় আচরণ করে—সেই মানুষটি যত ঘনিষ্ঠই হোক না কেন, মা মুহূর্তে তার থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন, ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে পারেন রক্তের সম্পর্কও। মায়ের স্বপ্ন, আশা, বুক ও চোখের স্বর্ণলতা—সবই সন্তানকে কেন্দ্র করে। যদি সত্যিকার অর্থে তিনি মা হন, তবে তাঁর জীবন মানেই সন্তানের জীবন।
অধিকাংশ নারীর সংসার টিকে থাকে মূলত সন্তানের মায়ায়। কত বিচ্ছেদ থেমে যায়, কত অভিমান গোপন থাকে, কত কষ্ট চেপে রাখা হয়—কেবল সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে। খারাপ দিনের শেষে সন্তানকে বুকে পাওয়া বা কাছে বসিয়ে একটুখানি কথা বলার সুযোগেই মায়ের বুক ভরে যায়। সহস্র যন্ত্রণা, অগণিত বেদনা মুহূর্তেই মুছে যায় সন্তানের মুখ দেখে। মায়েদের স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে এক জীবনে বহুবার—প্রতিবার যখন নতুন কোনো সন্তান মায়ের বুকে আসে, তখনই তিনি মহীয়সী হয়ে ওঠেন।
মায়েদের সংগ্রাম আসলে অন্যরকম। একজন বাবা এই ত্যাগের আসল মর্ম বুঝতে পারে না। হয়ত বোঝার চেষ্টাও করেন না। সন্তানের শৈশব ও কৈশোরে মায়ের হাতেই তৈরি হয় তার মন ও ভাবনার আকাশ। এই সময় যদি পুরুষ পাশে না দাঁড়ায়, তবে সেই আকাশে সহজেই জমে যায় মেঘ। প্রত্যেক নারী মা হয়ে ওঠেন ঠিকই, কিন্তু সমাজে বাবা হয়ে উঠতে পারেন ক’জন? দায়িত্ব কেবল উপার্জনেই সীমাবদ্ধ নয়—মানসিক সহায়তা, সময় ও স্নেহও জরুরি। এই সময়ের স্মৃতি মায়ের মনে যেমন থেকে যায়, তেমনি সন্তানের হৃদয়েও গেঁথে থাকে।
বাবারা আরও একটু বাবা হয়ে উঠুক। যাতে মায়ের দায়িত্ব সহজ হয়, মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে। সংসার একা টেনে নেওয়া যায় না—এখানে প্রয়োজন পারস্পরিক সহায়তা ও সহমর্মিতা। সন্তানের মনটা যদি উম্মুক্ত মাঠের মতো বিশাল করতে চাই, তবে সংসারে চাই সহানুভূতি, বোঝাপড়া আর মানবিক সঙ্গ। আগের যুগের যৌথ পরিবারে সন্তান কখন কার কোলে বড় হয়ে উঠতো, মা তা টেরই পেত না। এখন সময় বদলেছে, জগৎ-সংসারে কর্মজীবী মায়ের সংখ্যা বেড়েছে, সংসারের সংগ্রামও তীব্রতর হয়েছে। এখনকার মায়েদের সবচেয়ে বেশি দরকার সাপোর্ট।
তাই এখন প্রয়োজন মা-বাবা মিলে একসঙ্গে সংসার গড়ে তোলা—
যাতে সন্তান হয়ে উঠতে পারে দু’জনার।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com
