খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রিক দার্শনিক থিওফ্রাসটাস লিখেছেন, ‘আরেকটি বৃক্ষ রয়েছে, যা অত্যন্ত বড় এবং যার ফল অসাধারণভাবে মিষ্টি। ভারতের বস্ত্রহীন ঋষিরা এই ফল খান।’ সম্ভবত কাঁঠালের কথাই লিখেছিলেন থিওফ্রাসটাস। ফলটির উৎস ভারতবর্ষেই। বাংলাদেশে এটি কাঁঠাল নামে পরিচিত হলেও থাইল্যান্ডে কানুন এবং মালয়েশিয়ায় ফলটির নাম নাংকা।
কাঁঠাল (Jackfruit) এক প্রকারের হলদে রঙের সুমিষ্ট গ্রীষ্মকালীন ফল। বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus। কাঁচা কাঁঠালকে বলা হয় এঁচোড়। বৃক্ষে জন্মানো ফলের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। এটি প্রায় ১০০ পাউন্ড (৪৫ কেজি) পর্যন্ত হতে পারে। কাঁঠাল গাছের কাঠ আসবাবপত্র তৈরীর জন্য অত্যন্ত সমাদৃত।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ জোনাথান ক্রেন বলেছেন, কাঁঠালগাছ বহুবর্ষজীবী হওয়ায় এটি প্রতিবছর রোপণের প্রশ্ন আসে না। গ্রীষ্মকালীন একেকটা গাছে পাঁচ থেকে সাত বছর যাবৎ ফল ধরে। তা ছাড়া কোনো কোনো গাছে বছরে ১৫০ থেকে ২০০টি কাঁঠাল ধরে।
কোলস্টেরলমুক্ত এই ফলে নেই কোনো ক্ষতিকারক চর্বি। এতে রয়েছে ৯৪ কিলোক্যালরি শক্তি। ফলের রাজা কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি।
কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই খাওয়া যায়। বসন্তকাল থেকে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত কাঁচা কাঁঠাল ইচোড়’ সবজি হিসেবে খাওয় হয়।
কাঁঠাল পাকলে কোষ খাওয়া হয়, এই কোষ নিঙড়ে রস বের করে খাওয়া হয় এবং তা শুকিয়ে আমসত্বের মত ‘কাঁঠালসত্ব’ও তৈরি করা যায়। থাইল্যান্ডে কাঁঠালের চিপস্ তৈরি করা হচ্ছে।
আকারে বড়, সহজ প্রাপ্য, দামে সস্তা, একটি ফল অনেকে পরিবারের সকলে মিলে খাওয়া যায়, পুষ্টিগুণ বেশি- সম্ভবত এসব কারণেই জাতীয় ফলের খেতাব পেল কাঁঠাল।
বাংলাদেশ, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ ভারত, বিহার, মিয়ানমার, শ্রীলংকায় ব্যাপকভাবে কাঁঠালের চাষাবাদ হয়। তবে ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জ্যামাইকা প্রভৃতি দেশে সীমিত আকারে কাঁঠাল জন্মে।
কাঁঠালের কোনো অংশই অপ্রয়োজনীয় নয়। পাকা কাঁঠালের কোষ সুস্বাদু খাবার, বাকল গবাদিপশুর খাদ্য, বীজ ও কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। গ্রামাঞ্চালের প্রতিটি কৃষক পরিবারে বসতবাড়ির আশপাশে কম-বেশি কাঁঠাল গাছ দেখা যায়। একটি বড় গাছ থেকে শতাধিক কাঁঠাল পাওয়া যায়। কৃষকরা মৌসুমে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কাঁঠাল বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আয় করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতে চাষকৃত কাঠালের জাত হলো- গালা ও খাজা । গালা ও খাজা কাঁঠালের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিসেবে ‘রসখাজা’ নামে আরেকটি জাত আছে। এছাড়াও আছে রুদ্রাক্ষি, সিঙ্গাপুর, সিলোন, বারোমাসী, গোলাপগন্ধা, চম্পাগন্ধা, পদ্মরাজ, হাজারী প্রভৃতি জাতের কাঠাল। তবে এদের মধ্যে হাজারী কাঁঠাল বাংলাদেশে আছে, বাকীগুলো আছে ভারতে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং শিকাগো বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদ জীববিদ্যা ও সংরক্ষণ বিভাগের শিক্ষক নাইরি জেরেগা বলেন, কাঁঠালের অনুকূল আবাস গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলেও ফলটির ‘যথাযথ ব্যবহার’ নেই।
মার্কিন এ গবেষকের বক্তব্যের সত্যতাও রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে একসময় বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হলেও এখন ফলটির কদর কমে এসেছে। তাই ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস চলতি মাসের মাঝামাঝি পর্যায়ে দুদিনের একটি আয়োজনের মাধ্যমে কাঁঠালের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে সম্ভাব্য খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কাঁঠালের উৎপাদন বৃদ্ধি একটি সমাধান হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন।
কাঁঠালে আছে :
প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে : খাদ্যআঁশ ২ গ্রাম, আমিষ ১ গ্রাম, শর্করা ২৪ গ্রাম; চর্বি ০.৩ মিলিগ্রাম; ক্যালসিয়াম ৩৪ মিলিগ্রাম; ম্যাগনেশিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম; পটাশিয়াম ৩০৩ মিলিগ্রাম; ম্যাঙ্গানিজ ০.১৯৭ মিলিগ্রাম; লৌহ ০.৬ মিলিগ্রাম; ভিটামিন এ ২৯৭ আই.ইউ; ভিটামিন সি ৬.৭ মিলিগ্রাম; থায়ামিন (ভিটামিন বি১) ০.০৩ মিলিগ্রাম; রিবোফ্লেবিন (ভিটা বি২) ০.১১ মিলিগ্রাম; নায়াসিন (ভিটা বি৩) ০.৪ মিলিগ্রাম; ভিটামিন বি৬ ০.১০৮ মিলিগ্রাম ।
কাঁঠালের উপকারিতা
- কাঁঠালে চর্বির পরিমাণ নিতান্ত কম। এই ফল খাওয়ার কারণে ওজন বৃদ্ধির আশংকা কম।
- কাঁঠাল পটাশিয়াামের উৎকৃষ্ট উৎস। এ জন্যে কাঁঠালে উচ্চরক্তচাপের উপশম হয়।
- কাঁঠালে প্রচুর ভিটামিন এ আছে যা রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
- কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস- আলসার, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম।
- কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রির্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও আমাদেরকে সর্দি-কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
- টেনশন এবং নার্ভাসনেস কমাতে কাঁঠাল বেশ কার্যকরী।
- কাঁঠালে আছে বিপুল পরিমাণে খনিজ উপাদান ম্যাঙ্গানিজ যা রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ত্রণে সাহায্য করে।
- কাঁঠালে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়ামের মত হাড়ের গঠন ও হাড় শক্তিশালী করণে ভূমিকা পালন করে।
- কাঁঠালে আছে ভিটামিন বি৬ যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
- কাঁঠালে রয়েছে খনিজ উপাদান আয়রন যা দেহের রক্তাল্পতা দূর করে।
