প্রথম পাতা » সেরা » মুসলিম স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র, হলিস্টিক মেডিসিনের প্রনেতা- ইবনেসিনা

মুসলিম স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র, হলিস্টিক মেডিসিনের প্রনেতা- ইবনেসিনা

Ibn Sina

কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং আগ্রহ থাকলে জীবনে সাফল্য আসতে বাধ্য, এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন জ্ঞানসাধক ইবনে সিনা। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তি। পশ্চিমে তিনি ‘দ্য প্রিন্স অব ফিজিশিয়ানস’ নামে সমধিক পরিচিত। ইবনে সিনার আসল নাম আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। তিনি সাধারণত ইবনে সিনা। আবার বু-আলী সিনা এবং আবু আলী সিনা নামে পরিচিত। ১৬ বছর বয়স থেকে ডাক্তার হওয়ার নেশা জাগে তার। ১৮ বছর বয়সেই তিনি পুরোদমে ডাক্তার হয়ে যান। তার খ্যাতি দুর-দুরান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। জ্ঞান চর্চাই ছিল তার মূখ্য কাজ। জীবনের নানা উত্থান পতনের মধ্যেও তিনি কখনো জ্ঞানচর্চা করা ছাড়েননি। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু এবং ধীসম্পন্ন ব্যক্তি।

তিনি হলিস্টিক মেডিসিনের প্রনেতা – যেখানে একই সংগে শারীরীক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক যোগসূত্রকে বিবেচনায় রেখে রুগীর চিকিৎসা করা হয়। তিনিই প্রথম মানব চক্ষুর সঠিক এনাটমি করেন। যক্ষা রোগ নিয়ে তিনি অভিমত দেন যে যক্ষা একটি ছোয়াচে রোগ। যা তার পরের পশ্চিমা চিকিৎসকবৃন্দ প্রত্যাখ্যান করেন এবং যা আরো পরে সঠিক বলে প্রমানিত হয়। তিনিই প্রথম মেনিনজাইটিসকে ব্যাখা করেন। প্রকৃত পক্ষে তিনিই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক। বলা হয় থাকে, তার মাইল স্টোন পুস্তক “কানুন” লিওনার্ডো দ্য ভিঞ্চিকেও প্রভাবিত করেছিল। কানুন বারশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রায় সতেরশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে চিকিৎসা শাস্ত্রের টেক্স্ট বুক হিসেবে গণ্য হত। একজন প্রথিতযশা পশ্চিমা ডক্টর “কানুন”কে “মেডিকেল বাইবেল” বলে ঘোষনা করেন। বুখারায় তার জন্ম স্থানে যে মিউজিয়াম রয়েছে তাতে তার নিবন্ধ, সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং রুগীদের চিকিৎসারত অবস্থায় ছবি – এসবই স্থান পেয়েছে।

The Canon of Medicine
কানুন (The Canon of Medicine) ১৭ শতক পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে

৯৮০ সালে তুর্কিস্তানের বিখ্যাত শহর বুখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসামান্য মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করে ফেলেন। দার্শনিক আল-ফারাবি ছিলেন তাঁর গুরু।

তোমরা জেনে অবাক হবে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইবনে সিনা বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। তার গ্রন্থ ‘আল কানুন ফিল থিব’ (কানুন অব মেডিসিন) চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠ্য পুস্তক হিসেবে গন্য হত প্রায় পাচ শতক ধরে। তিনি কিন্তু ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের প্রভূত উন্নয়ন করেন। তবে তার মূল অবদান ছিল মেডিসিন শাস্ত্রে। তিনি অ্যানাটমিতে বিশ্বাস করতেন না এবং অস্ত্রোপচার সম্পর্কে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিল না। তিনি রোগ নিরাময়ে ওষুধের ওপর গুরুত্ব দিতেন বেশি।

তিনি যে শুধু চিকিৎসা শাস্ত্রেই অবদান রেখেছেন তা নয়, বরং এস্ট্রোনমি সহ আরো অনেক শাখায় তার গুরুত্ব বহ অবদান রয়েছে। তিনি মোমেন্টামকে ওজন ও বেগের গুনফলের সমানুপাতিক বলে অভিমত দেন। তিনি আরো অভিমত দেন যে, হাজারো চেষ্টা করলেও সীসা বা তামা থেকে সোনা বানানো যাবে না, যা তার সময়ের অনেক বিজ্ঞানী নিরন্তর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শুক্র গ্রহকে পৃথিবীর চেয়ে সূর্যের অধিকতর নিকটে অবস্থিত বলে নির্নয় করেন। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ চাদের একটি ফাটলের নাম তার নামে করা হয়েছে।

ইবনে সিনা যৌবনে খাওয়ারিজমের তাবারিস্তানের মামুনীয় আমির শামসুল মোয়ালি আবুল হাসান ইবনে ওয়াশমাগিরের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন।

৯৯৭ সালে তিনি ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করে তাঁকে সুস্থ করে তোলেন। আমির কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর জন্য রাজদরবারের লাইব্রেরি উন্মুক্ত করে দেন। মাত্র অল্প কয়েক দিনে তিনি অসীম ধৈর্য ও অগাধ একাগ্রতার সঙ্গে লাইব্রেরির সব বই মুখস্থ করে ফেলেন। জীবদ্দশাতেই একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইবনে সিনা জার্জানের রাজপুত্রের চিকিৎসা করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এই জার্জানেই তিনি তার বিখ্যাত বই “কানুন” রচনা করেন। জার্জানের রাজপুত্র অনেক দিন ধরে অসুস্থতায় ছিলেন শয্যাশায়ী। স্থানীয় চিকিৎসকরা কিছুতেই তার অসুস্থতা ধরতে পারছিলেন না, তারা রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। অবশেষে ইবনে সিনার সাহায্য নেন। ইবনে সিনা খেয়াল করলেন রাজপুত্রের সামনে তার প্রেমিকার নাম উচ্চারন করতে পালসের গতি বেড়ে যায়। ইবনে সিনা সহজ ছোট্ট সমাধান দিলেন, “যুগলদের মিলিয়ে দাও।”

জ্ঞানের গভীরতা চিন্তায় এবং সার্বজনীন উদার মনোভাবের জন্য বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছেন। অ্যারিস্টোটলের দর্শনের তিনি একজন খ্যাতনামা ভাষ্যকার। ইসলামী শিক্ষার সাথে অ্যারিস্টোটলের দর্শনের সমন্বয় সাধনের যে প্রয়াস আল কিন্দি ও আল-ফারাবি কর্তৃক রচিত হয়েছিল, ইবনে সিনা তাকে পূর্ণতা দান করেন । ইবনে সিনার কাজ বা লেখালেখির বেশির ভাগই চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর। এ বিষয়ে তিনি প্রায় ৪৩টি বই লিখেছেন। এ ছাড়া দর্শনশাস্ত্রের ওপর ২৪টি, পদার্থবিদ্যার ওপর ২৬টি, ধর্মতত্ত্বের ওপর ৩১টি, মনোবিজ্ঞানের ওপর ২৩টি, গণিতের ওপর ১৫টি, যুক্তিবিদ্যার ওপর ২২টি এবং পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যাবিষয়ক পাঁচটি বই লিখেছেন। শুধু এগুলোই নয়, তিনি সন্ন্যাস, প্রেম ও সংগীতের ওপরও বই রচনা করেছেন।

এক যুদ্ধ শিবিরে অবস্থান কালে তিনি তলপেটের ব্যাথায় কাবু হয়ে পড়েন। এই রোগেই ইবনে সিনা ১০৩৭ খৃস্টাব্দে, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

সেরা থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

S M Mukul
এস এম মুকুল
লেখক-কলামিস্ট, হাওর ও কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষক

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *