নব্বই দশক আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়ে আমার বাবা পরিবারসহ ঢাকায় চলে যান ভাগ্যোন্বেষণে। এ দশকটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। শিল্প-সাহিত্যের একটা উৎকর্ষের কাল এই দশক। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও ঘটনাবহুল দশক এটি। এ সময়ে বেঁচে ছিলেন বাংলার প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী সম্প্রদায়। বহু গুণী মানুষকে এ সময়ে আমরা বিচরণ করতে দেখেছি। পাড়া মহল্লায় রকস্টার বাচ্চু-জেমস-হাসান-বিপ্লবরা কেবলই উঁকি দিচ্ছেন এ দশকের গোড়ার দিকে। এ দশকেই তাঁদের পরিপূর্ণতা এবং এর শেষ প্রান্তে একটি সামূহিক পতন লক্ষ করা গিয়েছে শিল্প ও সংস্কৃতিতে। রাজনীতিতেও ব্যাপক নৈরাজ্যের সৃষ্টি নব্বইয়ের শেষ ধাপে এসে। নব্বই দশকেই প্রিয় মানুষ সালমান শাহর উৎকর্ষ এবং চলে যাওয়া। ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬ এর সেই শুক্রবারের বিবর্ণ বিকেল আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। সাড়ে তিনটার দিকে হঠাৎ ঘোষণা এলো প্রিয় নায়ক সালমান আর নেই। পুরো দেশ যেন থমকে গিয়েছিল সেই ক্ষণে! আমরা বহুদিন সেই কষ্টে নীরবে কেঁদেছি। নায়ক সালমানের মতো দর্শকের ভালোবাসা এদেশে আর কোনো নায়কের কপালে জোটেনি।
আমাদের প্রেমের পাঠ শুরু হয়েছিল বিটিভিতে। সবেধন নীলমণি বিটিভির শুক্রবারের সিনেমার জন্য সারাদেশ অপেক্ষায় থাকতো। শুক্রবার ছিল আমাদের অফুরন্ত আনন্দের ঊর্মিমালা। সকালে নতুন কুঁড়ি, বিকেলে সিনেমা আর রাতে আলিফ লায়লা। একেকটা শুক্রবার আসতো অনাবিল আনন্দ নিয়ে। মাসের শেষ শুক্রবারে হতো জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। শনিবার থেকেই অপেক্ষার উত্তেজনা!
আমরা ছোট বড় সকলে মিলেই সিনেমা দেখতাম। তখনকার সিনেমায় ‘পারবা কি পারবা না’র মতো জটিল জিজ্ঞাসা ছিল না। পারিবারিক কাহিনিতে অসাধারণ অভিনয় করতেন আলমগীর-শাবানা- রাজ্জাক-ফারুক-ববিতা-কবরী-জাফর ইকবাল-চম্পা-ইলিয়াস কাঞ্চন- বাপ্পারাজ-নাঈম-শাবনাজরা। সালমান-শাবনূরের ছবি টিভিতে দেখা যেতো কম। ওদের ছবি দেখতে যেতে হতো প্রেক্ষাগৃহে। সেখানেও পরিবার পরিজন মিলে নির্মল আনন্দ পাওয়া যেতো। তখনকার দিনে ঈদের সপ্তাহে বা কোনো নতুন সিনেমা এলে হলে একটা সিট পাওয়া ঢাবির সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে সিট পাওয়ার চেয়ে কঠিন ছিল। আজ প্রেক্ষাগৃহগুলোর যেগুলো অবশিষ্ট আছে সেগুলো ছারপোকা-মাকড়সা-টিকটিকির দখলে। মানুষ আর সেখানে যেতে চায় না। মোবাইল টিপলে যখন সব পাওয়া যায় তখন পাঠা আর পাটের গন্ধময় হলে গিয়ে কী করবে? কেন যাবে? কী দেখতে যাবে?
তো বলছিলাম প্রেমের কথা। বাঙালি আদিগন্ত প্রেমে নিমজ্জিত এক জাতি। বাঙালির হৃদয় স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো। এদের হার্টে থাকে প্রচুর জায়গা। সেখানে বহুবিচিত্র প্রেমের বাস। ন্যাংটাকালের প্রেম, ছোটবেলার প্রেম, স্কুলের প্রেম, কলেজের প্রেম, ভার্সিটির প্রেম, বিয়েবাড়ির প্রেম, কাজিনের প্রেম, বিয়াইনের প্রেম, ভাবির প্রেম, বিদেশির বৌয়ের প্রেম, হঠাৎ প্রেম, আচমকা প্রেম, আচানক প্রেম, ধনি গরিবের প্রেম এমন সহস্ররূপ প্রেমে বাঙালি নিমজ্জিত। বাঙালি পুরুষ শুধু নিজের বৌ ছাড়া আর সবার প্রেমেই পড়ে। বাঙালি নারীর হৃদয়েমন্দিরের খবর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দরাই পাননি আর আমি পাব সেই আশা দুরাশা। নব্বই দশকের উচ্চ মধ্যবিত্তের রোমান্টিকতার মূলসূত্র আসতো শাহরুখ-কাজলদের কাছ থেকে। এরপরের ক্লাসে আসতো সালমান-শাবনূরের কাছ থেকে। যারা আউট বইটই পড়তো তাদের ভাবসাবের জন্য দায়ী হুমায়ূন আহমেদ আর ইমদাদুল হক মিলন। হুমায়ূন পড়ে পুরুষরা বেশি সুবিধা করতে পারেনি। পকেটছাড়া পুরুষ কোনো নারীই কোনোকালে পছন্দ করে না। হিমুর সন্ন্যাসজীবনের মূল কারণ সম্ভবত তার শূন্য পকেট। নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি নারীদের প্রেমের দীক্ষা দিয়েছে মীরা-নবনী-রূপারা। কান্নাই এদের আমৃত্যু সঞ্চয় হয়েছে।
গার্লস স্কুলগুলোর সামনে সকাল সকাল দেখা মিলতো প্রেমিক পুরুষদের। জেমসের গান শুনে শুনে কেবলই দুষ্টুছেলের দল সিঁটি বাজানো শিখেছে। দলের সবচেয়ে হাবলার কাছে একটি ছোট্ট চিরকুট। সুযোগের অপেক্ষা। আশেপাশে কেউ না থাকলেই দিয়ে দেবে হাতে অথবা ফেলে দেবে নিচে। নায়িকা সেটা কুঁড়িয়ে নেবে। সিনেমার শুরু।
চিঠি দেওয়ার জন্য কিছু পোলাপান ছিল এক্সপার্ট। কীভাবে যেন আমিও সেই হরকরার দলে চলে গেলাম। কয়েকজনের গোপন চিঠি আমি হস্তান্তর করেছি। লুকিয়ে পড়েছি। পড়ার পর কসম কেটে বলেছি : সত্যি পড়ি নাই। একবার একজনের চিঠি দিতে গিয়ে বিপদে পড়লাম।
সকালবেলা। এক বন্ধু আমাদের এক সহপাঠীকে পছন্দ করতো ক্লাস থ্রি থেকে। সিক্সে ওঠার পর স্কুল চেঞ্জ হলো। সেদিন সকালে আমাকে ডেকে নিয়ে সে খুব অনুরোধ করলো চিঠিটি তার হাতে পৌঁছে দিতে। দুজনেই গেলাম। রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বললাম : তোমার জন্য একটি চিঠি আছে। মেয়েটি ভাবলো আমি তাকে চিঠি দিচ্ছি আমার জন্য। একসাথে পড়েছি। সহপাঠা হিসেবে বিন্দুমাত্র খাতির করলো না। কী সব গালাগালি করলো। বাপেরে ডাকতে লাগলো। আমি দৌঁড় দিলাম। হারামজাদা নায়ক পিছে পিছে হাঁটছে। হাঁকডাকে মেয়েটির চাচা চলে এলো। নায়ক বন্দী। আমি পগারপাড়! পরে আমার বন্ধু বলেছে তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু লোকমুখে শুনেছি হালকা জুতাপেটা করেছে। প্রেমের কারণে জুতাপেটা অতি নিম্নমানের একটা শাস্তি বলে মনে করি। মেয়েটির চাচা একটা হৃদয়হীন দুরাত্মা!
অনেক প্রেমের চিঠি আমি পড়েছি। হালকা চুমাচুমির কিছু বিষয় ছিল। বেশির ভাগ চিঠিতেই থাকতো গানের লাইন। ঐ সময়ে জনপ্রিয় গানের দু চার লাইন থাকতো। দরকারি কথা একালের মতো সেকালেও তেমন ছিল না। ঝগড়াঝাটির কিছু বিষয় থাকতো। কবে ঘুরতে যাবে, কোথায় যাবে এসব ছিল। বাঙালির প্রেমে চৈতন্যের মুক্তি কোনোকালেই ঘটেনি। কবির কল্পনার মতো সুন্দর প্রেমে বাঙালি নরনারী কস্মিনকালেও নিজেদের ব্যাপ্ত করতে পারেনি। প্রেম যেভাবে আর যেখান থেকেই শুরু হোক ফ্রয়েডেই এর সমাপ্তি।
চিঠি নিয়ে দু একবার ধরাও খেয়েছি। নানা কৌশলে ছাড়ও পেয়েছি। তবে আমার ভুলে ধরা খাইনি। নায়িকার ভুলে ধরা পড়েছি।
আগ্রহী পাঠক জানতে চাইতে পারেন সারাকৈশোর কি শুধু অন্যের চিঠিই চালাচালি করেছি? নিজে দু একটা পেয়েছি কি না? আপনাদের হতাশ করবো না। ভুলেভালে দু চারটা চিঠি আমিও পেয়েছিলাম। চিঠি পেলে উত্তর দেওয়া ভদ্রতা। আমি বেশ ভদ্র ছিলাম। আমার প্রেমে তেমন বিশ্বাস ছিল না। তাই ক্লাস থ্রিতে থাকতেই এক বাঘিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রচুর মার খেয়েছিলাম। সেই ঘটনা আগে বলেছি। এরপর চিঠিপত্র খুব হিসেব করে দেওয়া-নেওয়া করেছি।
“একটা বিশেষ ধরনের কাগজে আমার চিঠি আসতো। কয়েক রঙের কাগজ ছিল তার। কাগজগুলো বেশ মোটা এবং মিহি। আমি সেইসব ছিন্নপত্রে তার ঘ্রাণ পেতাম। কী মায়াময় লেখনীর সারাটা কাগজ জুড়ে থাকতো শুধুই ভালোবাসার ছোঁয়া! পৃথিবীর কেউ একজন যে আমাকে একসময় এতো ভালোবাসতো সেই আনন্দ নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। কোনো এক ধূসর আলোর নিচে, এক বিষণ্ন বিকেলে তার সমস্ত চিঠিগুলি আমি জ্বালিয়ে দিয়েছি। সেই সাথে নিভে গেছে আরক্ত হৃদয়ের অনুভূতি- আমার প্রেম। নব্বই দশকের বহু স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। তবে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মিহি ও মোটা কাগজে ভাসমান মসৃণ কিছু অক্ষরমালা যার পুরো জমিনজুড়ে অব্যক্ত ভালোবাসার ঢেউ অবিরত আছড়ে পড়তো!”
