যারা মুখে মুখে অনেককিছু করে ফেলে, তাদের অনেকেই কাজের কাজে কিছুই না। চাপাবাজি যাদের স্বভাব, তারাও ক্রেতা পায়। মুখরোচক গল্পবাজদের বিশ্বাস করার খোরাক তাদের জিহ্বাই বহন করে। কিন্তু যতক্ষণে বাছাধন ধরা খায়, ততক্ষণে সময় তো ফুরিয়েই যায়। বেশি কথা বলা লোকজনের ঝামেলা থাকেই।
যারা কাজ করে, যিনি কাজ জানে— তার অতিরিক্ত কথা বলার দরকার হয় না। কাজই তো কথা। আষাঢ়ে গল্প তারাই ফাঁদে যাদের তলা ফুটো। যেহেতু জিহ্বা দিয়ে চাটা যায়, একদল চাটামিকেই পুঁজি করে কেউ কেউ আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়। কেউ কেউ সরল, কেউ কেউ বলদ— সেধে সেধে ভাঁওতাবাজদের কাছে গিয়ে ধরা পড়ে।
চারপাশে বিশ্বাস বিপন্ন করা মানুষের সংখ্যাই বেশি। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কলিজা ভিজিয়ে রুহ বের করে নিয়ে যায়। মতলব হাসিল হয়ে গেলে হাত দুটিকেই পা বানিয়ে চার পায়ে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত মিষ্টি কথা মানেই ভেজালে টইটম্বুর। খাঁটি মানুষ অনেক সময় রূঢ় হয়।
সৎ মানুষের অনেককিছুই পছন্দ হয় না। কিন্তু যারা ধোঁকাবাজ, তারা কথা দিয়ে ফাঁদ পাতবে। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে উদাও হয়ে যাবে। ফাঁপড়বাজদের বুক-পিঠ থাকে না। স্বার্থের জন্য জুতার নিচে জিহ্বা দিতেও কার্পণ্য করে না। কাজ আদায় হয়ে গেলে চিনবেও না। ভাঁওতাবাজ ও ভণ্ডদের থেকে অখণ্ড অবসরে থাকা দরকার।
যারা মিষ্টিতে চুবিয়ে ড্রেনে নিক্ষেপ করার পাঁয়তারা করছে, তাদের এড়িয়ে চলতে হবে। অনেকেই মাথায় তোলে—যাতে আছাড়টা শক্তভাবেই দিতে পারে। কোনটা সমালোচনা, কোনটা প্রশংসা আর কোনটা তেলবাজি— এটা ধরতে না পারলে জীবনে দুঃখ আছে।
মতলববাজরা যদি জীবনকে ঘেরাও করে ফেলে, তবে সত্য দেখার চোখ অন্ধ হয়ে যায়। বিবেককে সক্রিয় রাখতে হবে। আপন ও পরের পার্থক্য ধরতে হবে। যে আপন স্বার্থপর, সে আপনা পরের চেয়েও ক্ষতিকর। অনেক আপনজনই থাকে, যারা আপনাকে বিক্রি করে তাদের স্বার্থ হাসিল করে।
বেশি কথা বলা মানুষ থেকে দূরে থাকাই ভালো। যারা বেশি কথা বলে, তারা কিছু ভালো কথাও বলে—কিন্তু এত ফাউল কথা বলে যে তার আড়ালে ভালো হারিয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে কিছু মানুষ থাকবে যারা ফাঁপড়ে চলে। কাঁপিয়ে দেওয়ার ভান করে। অথচ কাজের সময় নিজেরাও কাঁপে না, অন্যকেও কাঁপায় না।
ব্যানারের সামনের সারিতে, ক্যামেরার মুখোমুখি থাকতে যারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে ক্রেডিট কামায়— তাদের আসলে কোনো ক্রেডিবিলিটিই নেই। এরা সুদিনে থাকে, দুর্দিনে লাপাত্তা। অথচ কম কথা বলে যারা বেশি কাজ করে, তারাই সঙ্গী, সমাজ ও জীবনের জন্য উপকারী।
জীবনের জন্য উপকারী হওয়া এবং উপকারী থাকা খুব প্রয়োজন। অল্প কথায় যে গল্প সাজে, সে গল্পে খাদ কম থাকে। স্বভাবতই সে সম্পর্ক হয় খাঁটি। মতলববাজ, ভাঁওতাবাজসহ যত ‘বাজ’-যুক্ত উপমা আছে, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা দরকার। অনেক কথা বলে, প্রলোভনের সারি সাজিয়ে যারা মুগ্ধ করতে চায়—তাদের ফাঁদে পড়লে বুক চাপড়ানোর সময় আসবেই।
অধিক কথার মাঝে আরও অধিক মিথ্যা থাকে। সত্য কথা সংখ্যায় কম। মিথ্যার লম্বা বহরে একবার আচ্ছন্ন হলে মুক্তি অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। আমাদের জীবন প্রলোভনের বেড়াজাল থেকে নিরাপদ থাকুক। কোনো কিছুতেই যেন অতিরিক্ত আশা আর সামান্য লোভও না রাখি। তাহলে দুঃখ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুখ কম থাকলেও যেন দুঃখ না বাড়ে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com
