পুতুলের উৎপত্তি সেই প্রাচীন কাল থেকে। প্রাচীন মিশর, গ্রিস, রোম প্রভৃতি দেশে পুতুল বেশ পরিচিত ছিলো। প্রাচীন মিশরে খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০০-২৭০০ অব্দে ক্রিট দ্বীপে রাজা নাসোসের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে দোলনায় চড়া বালিকা- এমনই মাটির পুতুল পাওয়া গেছে। মিশরের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন পুতুল পাওয়া গেছে তাহলো কাঠের তৈরি, এতে সুতোয় বাঁধা পুতির মালা আঁকা থাকতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পুতুলগুলোর বয়স ৪ হাজার বছরের কম হবে না।
প্রাচীন গ্রিকদেরও ছিল মজার সব পুতুল। এগুলোর মাথার আকৃতি বেশ সুন্দর, আর এদের বাহু ও পা সুতোর সাহায্যে নাড়াচাড়া করানো যেত। এক্সিমো ছোট মেয়েদের জন্য পুতুল তৈরি করা হতো তিমির হাড় খোদাই করে। মেক্সিকোয় মেয়েদের পুতুল তৈরি হতো কাদামাটি পুড়িয়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন যুগে পুতুল নির্মাণের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। কাঁচা মাটির পুতুল রোদে শুকিয়ে পুড়িয়ে নেয়া হয়। পোড়ানোর আগে বা পরে পুতুলে রং লাগানো হয়। কাঁচা মাটি থেকে তিনভাবে পুতুল তৈরি হয়। সরাসরি হাতের সাহায্যে পোড়া মাটির ছাঁচে ফেলে এবং কুমোরের চাকের সাহায্যে। আমাদের দেশে আমরা যত মাটির পুতুল দেখে থাকি, তা তৈরি করে থাকেন পাল ও কুমোর বংশের লোকেরা।
মাটি ছাড়াও কাঠ, বাঁশ, কাপড় ও চিনেমাটি দিয়ে তৈরি হয় পুতুল। বর্তমানকালে পুতুল তৈরির কাজে যেসব উপকরণ বহুল ব্যবহৃত, সেগুলো হলো-প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা ধরনের সিনথেটিক দ্রব্য, বিভিন্ন ধাতু, প্লাস্টার অব প্যারিস, মোম, গালা প্রভৃতি। পুতুল তৈরির সময় প্রস্তুকারকরা যে বিষয়টি লক্ষ্য রাখেন তা হলো পুতুলটিকে বাস্তবধর্মী বা জীবন্ত করে তৈরি করা। আর তাইতো আমাদের এই অত্যাধুনিক যুগে পুতুলগুলো এত বেশি জীবন্ত যে জড় পদার্থ হয়েও ওদের অঙ্গ-ভঙ্গির মাধ্যমে সত্যিকারের মানুষের অস্তিত্ব বা কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে। আধুনিককালে এখন আর পুতুলের মাথা কাঠ দিয়ে তৈরি হয় না-চিনে মাটি বা মোম দিয়ে তৈরি হয়। এদের মাথায় রেশমি লোম এমনকি মানুষের আসল চুলও লাগানো হয়। এ পুতুলগুলো চোখ খুলতে ও বন্ধ করতে পারে, হাঁটতে ও কথা বলতে পারে। কিছু কিছু পুতুল রয়েছে যেগুলো নাচতে পারে আবার বোতল থেকে পানীয় পান করতে পারে।
ইরানের ছেলে-মেয়েরা যে সব পুতুল নিয়ে খেলা করতো সেগুলো সাধারণ কাপড়ে ভাঁজ করা। এই ভাঁজ করা কাপড়ে পুতুলের মুখশ্রী আঁকা হতো। ভারতের ছেলে-মেয়েরা কাঠের তৈরি দরজার বলের মতো হাতল পুতুলের মাথা হিসেবে ব্যবহার করতো। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ আমাদের বাংলাদেশে পুতুল তথা মাটির পুতুলের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
পৃথিবীর সব প্রান্তের আদিম মানুষের ছেলে-মেয়েদের কবরে পাওয়া গেছে মাটি ও হাড়ের তৈরি পুতুল। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রথম পুতুলের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। সে সময় ছেলে-মেয়েদের পুতুল কিংবা মূর্তি ধরতে দেয়া হতো কিন্তু খেলনা হিসেবে এটা নিয়ে খেলা করা নিষিদ্ধ ছিল। অন্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, প্রাচীনকালে ছেলে-মেয়েরা পুতুল নিয়ে খেলা করতো।
মধ্যযুগে (খ্রিঃ ১১০০-১৫০০) ইউরোপে সর্বপ্রথম পুুতুলের উদ্ভব ঘটেছিলো। সে সময় মেয়ে আকৃতির পুতুল তৈরি হতো কাদা দিয়ে। ১৭৫০ সালের পর শিশুদের জন্য ছেলে-মেয়ে আকৃতির বিভিন্ন গড়নের পুতুল তৈরি হয়েছিল। মধ্যযুগে ইউরোগে জার্মানির জানবার্গ শহরে পুতুল ও খেলনা নির্মাণ শিল্পের প্রথম প্রবর্তন ঘটে। অবশ্য এর আগে চীন দেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেলনা নির্মাণ হতো।
১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পর ব্যাপকহারে খেলনা উৎপাদন শুরু হয়। ইংল্যান্ডে ‘মনোটানারিস’ নামে এক পরিবার পুতুল তৈরিতে দক্ষ ছিলো। এ পরিবারটি ১৮৫১ সালে বিশাল এক প্রদর্শনীতে মোমের পুতুল বানিয়ে দেখিয়েছিলো। এই ‘মনোটানারি’ পুতুলগুলো সে সময় বেশ দামি ছিলো। এক একটি মডেলের পুতুলের দাম ছিলো ৫ পাউন্ডেরও বেশি। তা সত্ত্বেও এসব পুতুলের ক্রেতার কোন অভাব ছিলো না। ঠিক এসময়টাতে আরো একটি পরিবার পুতুল তৈরিতে বিখ্যাত ছিলো, এ পরিবারটির নাম ছিলো ‘পাইরোটি’ পরিবার। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিভিন্ন দোকানে এ পুতুল সরবরাহ করে খুব সুনাম অর্জন করে। ১৭৫০ সাল থেকে ‘পাইরোটি’ পরিবারটি পুতুল তৈরি করে আসছিল। ১৮২৫ সালের কথা। সে সময় জার্মানি যখন প্লাস্টিকের এক নতুন ধরনের পুতুল তৈরি করলো তখন ইংল্যান্ডের তৈরি এই বেবি পুতুলগুলোর চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। জার্মানির এই পুতুলগুলোর রঙ ছিলো মানুষের গায়ের রঙের মতো। এই রঙ ন্যাচারাল করবার জন্যে পুতুলগুলোকে মোমের দ্রবণে ডোবানো হতো। এই পুতুলগুলো অনেকদিন ধরে পুতুল বাজারে টিকে ছিলো। পরবর্তীতে আরো বাস্তব চিন্তার ফলস্বরূপ বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ধরনের পুতুল তৈরি হয়েছিলো। এমন করে বিভিন্ন ধরনের ছেলে বা মেয়ে পুতুল তৈরি হলো আর এদের চাহিদাও বেড়ে যেতে লাগলো প্রচুর পরিমাণে।
১৮৪০ সালে জার্মানিতে এক ধরনের কাঠের পুতুল তৈরি করা হতো। এই পুতুলকে বলা হতো ‘বাইডামেয়ির’ পুতুল। কাঠের ওপর রঙ-বেরঙের হাত, পা, চোখ, নাক, মুখ, চুল প্রভৃতি বসিয়ে এদের তৈরি করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে কাঠের বদলে পুতুলগুলোকে শুধুমাত্র মোম বা চীনামাটি দিয়েই তৈরি করা হতো না, এদেরকে জামা-কাপড় পড়িয়ে ফিতে, বেল্ট, দস্তানা ও ছাতা প্রভৃতি দিয়ে সাজিয়ে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডই বর্তমান পৃথিবীতে পুতুল তৈরিতে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত, কিন্তুজার্মানিও কম যায় না। পুতুলের দিক দিয়ে জার্মানিতে কৃতিত্ব হলো পুতুলের মাথার ভিতরের অংশ ফাঁপা থাকে; যার ফলে পুতুলটির ওজন অনেকখানি কমে যায় এবং দামটাও যায় বেশ কমে। আর পুতুলের মাথার ওপরের অংশটি সাধারণত ঢাকা হয় পরচুলা’র সাহায্যে।
