সন্তান বাবা–মাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করবে কি না— তা মূলত নির্ধারণ করে বাবা–মাই। স্বামী–স্ত্রী পরস্পরকে সম্মান না দিলে, মর্যাদায় না রাখলে এবং সুসম্পর্ক বজায় না থাকলে সন্তান বাবা–মা সম্পর্কে ভুল বার্তা পায়। সন্তানের কাছে বাবার মর্যাদা কতটা হবে, তা অনেকাংশে মা নির্ধারণ করে দেন। আবার সন্তান মাকে কতটা প্রাধান্য দেবে, তার নির্ধারক হন বাবা। স্বামী–স্ত্রীর সাময়িক বৈরিতাও সন্তানের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা–মায়ের সঙ্গে সন্তানের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়।
সন্তান বিগড়ে যাওয়া বা বিপথে যাওয়ার অন্তরালেও পারিবারিক কলহ-বিবাদ বহুলাংশে দায়ী। যে সংসারে স্বামী–স্ত্রী পরস্পরের প্রতিপক্ষ, সে সংসারের সন্তান পারিবারিক শিক্ষায় ভয়ংকরভাবে পিছিয়ে থাকে।
বাবা–মায়ের বার্ধক্যে সন্তান পিতামাতাকে ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখবে কি না— তা নির্ধারিত হয় সন্তানের শৈশবেই। অনেক পরিবারে দেখা যায়, সন্তান অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়ের ঘনিষ্ঠ এবং বাবার প্রতি আনুগত্যপূর্ণ। এমন পরিবেশ তখনই তৈরি হয়, যখন স্বামী তার স্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা দেন। পরস্পরের মতামতের প্রতি সম্মান থাকলেই পারিবারিক সংযুক্তি দৃঢ় হয়। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
যে সন্তান সংসারে বাবার দ্বারা মায়ের অবহেলা বা অমর্যাদা প্রত্যক্ষ করে, সে সন্তান সাধারণত মায়ের প্রতি গভীর টান অনুভব করে। তবে দুঃখজনকভাবে এমন ঘটনাও ঘটে— যেখানে কোনো ছেলে সন্তান বাবার দ্বারা মাকে নির্যাতিত হতে দেখে, কিন্তু পরবর্তীতে সে নিজেও মাকে অপমান-অপদস্থ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। পারিবারিক শিক্ষার অভাবে কেউ কেউ মনে করে, নারীকে কোণঠাসা করে রাখা পুরুষের পৌরুষের অধিকার।
সংসারে সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকা এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় থাকা মানেই সেখানে শান্তি বিরাজ করা। যে পরিবারে স্বামী–স্ত্রী পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখে, সে পরিবারের সন্তান সোনার মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠে। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া সমতা ও ন্যায্যতার এই দৃষ্টিভঙ্গি সে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট থাকে। বিপরীতে, যে পরিবারে দ্বন্দ্ব ও কলহ লেগেই থাকে, সে পরিবারে বেড়ে ওঠা সন্তান সেই অশান্তি সমাজেও ছড়িয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে গোটা সমাজে বিশৃঙ্খলা দানা বাঁধে, এমনকি ভালো মানুষরাও এর প্রভাবে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
যে সংসারে স্বামী–স্ত্রীর বোঝাপড়া যত ভালো, সে পরিবারের সন্তানের মানসিক বিকাশ তত উন্নত হয়। শিশুর কাছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। এখান থেকে সে শুধু শেখে না— বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের বীজ বপন করে। কাজেই অশান্তিতে জ্বলতে থাকা একটি পরিবার অজ্ঞাতসারেই শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি কোনো সাময়িক ক্ষতি নয়; বরং এমন এক ক্ষত, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়।
এই চক্র তখনই ভাঙবে, যখন একটি দম্পতি নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। দম্পতিকে যদি একটি কোম্পানি ধরা হয়, তবে সন্তান-সন্ততি সেই কোম্পানির উৎপাদন। কোম্পানির মানসিকতা যত উন্নত হবে, পণ্যও তত উৎকৃষ্ট হবে।
পরস্পরকে ভালোবাসা জরুরি। সম্মান, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছাড়া কোনো সংসার সোনার সংসার হয়ে ওঠে না। যে সন্তান বাবা–মাকে পরস্পরের প্রতি গভীর দরদ দেখাতে দেখে, তাদের খুনসুটিতে অভ্যস্ত হয় এবং আত্মমর্যাদার চর্চা প্রত্যক্ষ করে— সে সন্তান পারিবারিক নৈতিকতা, সদাচার ও সুশিক্ষা অন্যদের তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্জন করে।
অতএব, ভবিষ্যতে সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চান— তা নির্ধারণ করতে হলে সংসারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। পরস্পরের মধ্যে মিল-মহব্বত, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং পাড়া–প্রতিবেশীদের সঙ্গে শালীন আচরণের চর্চা থাকা প্রয়োজন। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়; বড়দের যা করতে দেখে, তা তারা অবিকল নিজের ভেতর ধারণ করে।
স্বামী হোক বা স্ত্রী— কারোরই হেলায়-ফেলায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নষ্ট করার মতো আত্মঘাতী আচরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সময় থাকতে শুধরে যাওয়াই মঙ্গল।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com
