আমি নিজেকে নিজেই বুঝ দেই, আশ্বস্ত করি।। আমি যে দ্বৈত আমি— তার একজন ভোগ করেন, ভাঙেন, কষ্ট পান; আরেকজন পর্যবেক্ষক, পরামর্শদাতা, নিয়ন্ত্রক ও সারিয়ে তোলেন। সবচেয়ে জটিল সময়ে, দুর্দিনে নিজেই নিজেকে পরামর্শ দিই। নিজেকে দেওয়া সান্ত্বনা পেয়েই তো বেঁচে থাকি। এই যে চলতে পারি, বলতে পারি— এসবে আমার অবদান কম নয়।
এমনটা কেবল আমি নই, আপনিও। দ্বন্দ্বে পড়লে পথটা আবিষ্কার করতে ভেতর থেকে কেউ এগিয়ে আসে। আমার মধ্যে আরেকটা আমি আছে। সেই আমিটার সঙ্গে আমাদের কথা হয়।
অন্যকে একাকীত্বের কথা বলি, কিন্তু একা কী? ঘোর দুর্দিনে ভেতরের কেউ যদি মেরামত করে না দিত, তবে টিকতে পারতাম? আত্মহত্যার কথা ভেবে ফিরে এসেছি। পালিয়ে যাওয়ার কথা ভেবে পথ বন্ধ করেছি। যে নিজের মধ্যে কোনো সঙ্গী পায়নি, সে জীবনকে মৃত্যুর কাছে সঁপে দিয়েছে। কী মনে হয়—একটু সাপোর্ট যদি পেত, তবে সুন্দর জীবন কেউ অকালে নষ্ট করত? কে না জানে, এই জীবনটা দু’বার পাওয়া যাবে না।
নিজের সঙ্গে নিজের কখনো কথা হয়েছে? নিজেকে প্রশ্ন করেছেন? উত্তর পেয়েছেন? দু’জনই কি আপনি—একই সঙ্গে প্রশ্ন আর উত্তর? আশ্চর্য মনে হয় না? একজনের মন খারাপ হয়, আরেকজন সান্ত্বনা দেয়—আপনার ভেতরেই তো। বিষিয়ে ওঠা মনটা একলা একলা ঠিক হয়ে যায়। চোখের পানি ঝরে, আবার চোখেই শুকায়।
উচিত–অনুচিতের দ্বন্দ্বে জড়ায় কে? আমি। একটা বেছে নেয় কে? আমি। তবে প্রশ্ন ওঠে। নিজেকে কখনো দায়ী করিনি? শাস্তি দিইনি? বিচার করিনি? আমার মধ্যে যে আমিটা—তার সঙ্গে নীরবে কথা হয়, নিভৃতে হাঁটা হয়, অন্তরালে বসা হয়। তার সঙ্গে যতক্ষণ বোঝাপড়া ঠিক থাকে, ততক্ষণ মনে অসুখ ধরে না। শরীরের অসুখও তো তখনই সারে। যখন ভেতরের আমিটা নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তখন ডাক্তার–বৈদ্যের হস্তক্ষেপ লাগে।
বাইরের কেউ আঘাত দিলে সবসময় কি অন্য কারও কাছে বিচার চাই? নিজের কাছে নালিশ করি না? দীর্ঘশ্বাস ফেলি না? নিজেকে বলি না—এভাবে চলবে, এভাবে বলবে; এটা করবে না, ওটা করবে না?
আমিই তো এসব আমাকে বলি। আমাকে আমি ঘুম থেকে ডেকে তুলি, আবার ঘুমাতে যেতে বলি। ভালোবাসি নিজেকে। রাগ করি, ধমক দিই। অভিমানে নিজেকে শাস্তি দিই, ক্ষতি করি। আবার সারিয়ে তোলে কে? নিজেই নিজেকে। প্রবোধ শোনাই, আশান্বিত করি। না-পাওয়ার বেদনাকে ভুলিয়ে দিতে চাই। পাওয়ার পদ্ধতিকে প্রশ্ন করি। প্রস্তাবনা দিই, আবার উপসংহার টানি।
শুধু আমি না—আমার আমিসহ আমি শক্তিশালী। কারও সাহায্য ছাড়াও দুরূহ সমস্যার সমাধান বের করতে পারি। আমার সঙ্গে আমার যে পরামর্শ, তা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রেসক্রিপশন। আমি রোগী, আবার আমিই চিকিৎসক। আমার মনের যত ব্যাধি, তার প্রায় সবগুলো সারিয়ে তোলার সাইকোলজিস্ট তো আমি-ই।
কার সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত, কাকে কী বলা উচিত—আমার ভেতর থেকে কেউ আমাকে বলে দেয়। ভুল পথে চলতে দেখলে কেউ ডিরেকশন দেয়। ভুল করতে করতে বুঝি ভুল করছি। আবার ভুল করার পরেও অনুধাবন করি—ভুল করেছি।
ক্ষতিপূরণ হবে জেনেও ক্ষমা চাই। ভেতরে যে একজন আছে, সে বলে—দুর্বলের কাছেও নত হতে হবে। অন্য কারও সামনে হয়তো দুর্বলতা উন্মুক্ত করি না, কিন্তু নিজেই নিজেকে দেখাই আমার ক্ষতি আর ক্ষতগুলো।
আমার মধ্যে আরেকটা আমি বাস না করলে আমি থাকতাম না। কোথায় ভেসে যেতাম, তা আন্দাজও করতে পারি না এখন। প্রচণ্ড রাগ বা ক্রোধের সময় কেউ একজন আমাকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে। বোঝায়—এসব ঠিক না।
আয়নার সামনে আমি দাঁড়াই বটে। তবে আমাকে যে দেখে, সেটাও কি আমি? আয়নার ভেতরে কে? গভীর রাতে হতাশার শীর্ষে বসে কেউ তো আশার বাণী শোনায়—সুবহে সাদিকের আর বেশি বাকি নেই। এই তো আলো ফুটল।
ব্যর্থতায় যখন নিজেকে ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছা হয়, কবর খুঁজে ফিরতে ফিরতে কেউ একজন ডাক দিয়ে ওঠে। বলে—ধৈর্য ধরো। তোমার জন্য যা উত্তম, তা আসবে। কেউ কিংবা আমাকে ছেড়ে যায়নি; বরং যা ক্ষতিকর, তা থেকে কেউ আমাকে সরিয়ে এনেছেন।
মনের মধ্য থেকে যে আমাকে সহজ করে বোঝায়, সে মোটেও সামান্য নয়। সে এই আমিটার আপন আরেকটা আমি। সেটা কারও রূপ কিংবা কারও ছায়া। কে সে?
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
