প্রথম পাতা » জীবনযাপন » ক্ষমা, আঘাত আর সম্পর্কের নীরব ক্ষয়

ক্ষমা, আঘাত আর সম্পর্কের নীরব ক্ষয়

Relation

কেউ কেউ বারবার ভুল করার পরও ক্ষমা পায়। সম্পর্কের সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়— বসা হয়, কথা হয়। কিন্তু ভুল করার আগের অবস্থানটা আর ফিরে পাওয়া যায় কি না- সেটাই প্রশ্ন। অনেকেই দেয়াল ভেঙে মন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

কেউ কেউ সম্পর্কের পূর্বতন স্বতঃস্ফূর্ততায় আর কখনোই ফিরতে পারে না। মন ভাঙার পরও আবার কাছাকাছি হতে হয়। হয়তো একটি জীবন একসঙ্গে পাড়ি দিতে হয়, কিন্তু গতিটা আর ঠিকঠাক থাকে না। কোথাও এক ছন্দপতনে সরল মনটা কঠিন হয়ে যায়। দায়িত্বের বাইরেও যে অনুভূতি থাকে, তা ভোঁতা হয়ে আসে। এরপর থাকে শরীরবৃত্তীয় আবেগ, সামাজিকতা আর অভিনয়। জীবন জীবনের প্রয়োজনে বয়ে চলে।

অনিচ্ছাকৃত ভুল একাধিকবার সহ্য করা যায়। কিন্তু যে ভুল কেউ ইচ্ছা করেই করে, সেই ভুল ক্ষমা করতে থাকলে ভুলকারীর সাহস বাড়ে। মুখে বলা ক্ষমার দ্বারাই সবকিছু মুছে যায় না। দাগের গভীরতা কমে আসতে সময় লাগে। যে বিশ্বাস ভাঙে, তাকে একবার–দু’বার ক্ষমা করে ফেরার সুযোগ দেওয়া যায়।

কিন্তু বারবার হলে বেড়া তুলে দিতে হয়। আঘাতের পর আঘাত খেতে খেতে অনন্যোপায় হয়ে মন শক্ত হয়ে যায়। প্রথমবার অভিমান ভাঙতে যতটা সময় লাগে, দ্বিতীয়বার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তার চেয়েও অনেক বেশি সময় লাগে। কেবল ভুল করা, ভুল পথে চলা এবং ভুল জমিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই সম্পর্ক পথ হারায়। যে আঘাত করে, সে হয়তো ক্ষতের গভীরতা বোঝে না; কিন্তু যে আঘাত পায়, তার কলিজাও ক্ষত-বিক্ষত হয়।

অন্যের উপেক্ষা ও অবজ্ঞায় মানসিক স্বাস্থ্যের সাংঘাতিক ক্ষতি হয়। যেহেতু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রায় সবাই উদাসীন, তাই এই সামগ্রিক ক্ষতি টের পেতে সময় লাগে। মেজাজ রুক্ষ হয়ে যাওয়া, কর্কশ আচরণ—এমন স্বভাব একদিনে তৈরি হয় না। আঘাত পেতে পেতে কেউ কেউ একসময় নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে।

ব্যথার তীব্রতা যখন জটিল হয়, তখন তার মধ্য দিয়েই অন্যরকম বাস্তবতা প্রকাশ পায়। কারও কারও ভিন্নধর্মী স্বভাব দেখে আমরা কটু মন্তব্য করে ফেলি। অথচ এই বাস্তবতার আড়ালে কত গল্প, কত দুঃসহ অভিজ্ঞতা লুকিয়ে থাকে, তা আমরা একবারও তলিয়ে দেখি না। কেউ একদিনে দুর্ভেদ্য হয়ে যায় না; নানা বাস্তবতা পাড়ি দিয়েই মানুষ এক তীরে এসে দাঁড়ায়।

যারা অকারণে কষ্ট দেয়, অসম্মান করে কথা বলে এবং অপমানের ভাষায় আঘাত করে, তারা আসলে কারও মনে বাস করতে পারে না। কাউকে খোঁটা দেওয়া বা খোঁচা দেওয়া পচা স্বভাব। তবু কেউ কেউ অন্যকে আঘাত করেই আনন্দ পায়। জেনে–শুনেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে মজা নেয়।

এই স্বভাবের মানুষগুলোর অভাব কেউ কোনোদিন অনুভব করে না; বরং জীবনের চারপাশে এরা না থাকলেই স্বস্তি আসে। যারা মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারে না, তারা নিজেদের ইজ্জতও ধরে রাখতে পারে না। কিছু কাছের মানুষও থাকে, যারা সুযোগ পেলেই হুল ফুটাবে। মুখোশে আপন হয়ে বসে থাকা মানুষগুলো সুযোগ পেলে আবার স্বরূপে ফিরে আসে।

ব্যথা পেয়ে অনেকেই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে হাসিমুখে এড়িয়ে যায়। কিন্তু তাদের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ যখন আউটব্লাস্ট হয়, তখন কেউ ছাড় পায় না। ভুল হতে পারে, কিন্তু একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে। কেউ যখন বিশ্বাস ভাঙে—ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়—সে আসল মনের আসন হারায়।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন, পরিবার ও সমাজের দায়বদ্ধতায় শরীর অনেক কিছু মেনে নিতে বাধ্য হয়; কিন্তু মন তো শেকলে আটকায় না। মন যদি কাউকে ঘৃণা করতে শুরু করে, তবে সে বুকের ওপর থাকলেও মনের নাগাল পায় না। সুতরাং কথা ও কাজে সাবধান হতে হবে। আঘাত লেগে গেলে তা ফিরিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

রাজু আহমেদ, কলাম লেখক।
raju69alive@gmail.com

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

রাজু আহমেদ
প্রাবন্ধিক।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *