পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে
স্যাটেলাইট আর ক্যাবলের হাতে
ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী
আ হা হা হা আ হা।।
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
ঘুঁচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডী
আ হা হা হা আ হা
ভেবে দেখেছো কি
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।।
সারি সারি মুখ আসে আর যায়
নেশাতুর চোখ টিভি পর্দায়
পোকামাকড়ের আগুনের সাথে সন্ধি
আ হা হা হা আ হা।।
পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা
একসাথে নয় আসলে যে একা
তোমার আমার ফারাকের নয়া ফন্দী
আ হা হা হা আ হা
ভেবে দেখেছ কি
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।।
স্বপ্ন বেচার চোরা কারবার
জায়গা তো নেই তোমার আমার
চোখ ধাঁধানোর এই খেলা শুধু ভঙ্গী,
আ হা হা হা আ হা।।
তার চেয়ে এসো খোলা জানালায়
পথ ভুল করে কোন রাস্তায়
হয়ত পেলেও পেতে পারি আরো সঙ্গী
আ হা হা হা আ হা।।
ভেবে দেখেছ কি
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।।
শিল্পীঃ ক্রস উইন্ডস/গৌতম/পল্লব
গীতিকারঃ গৌতম চট্টোপাধ্যায়, পল্লব রয়
সুরকারঃ গৌতম চট্টোপাধ্যায়, পল্লব রয়
ব্যান্ডঃ মহীনের ঘোড়াগুলি
অ্যালবামঃ আবার বছর কুড়ি পরে
বছরঃ ১৯৯৫
গানের মূল বিষয়
মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ গানটি কেবল একটি বিরহের গান নয়, এর লিরিকের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নাগরিক জীবন, প্রযুক্তির প্রভাব এবং একাকিত্বের গভীর দর্শন। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই গানের মূল বিষয়বস্তুকে কয়েকটা পয়েন্টে এভাবে দেখা যেতে পারে:
১. প্রযুক্তির আগ্রাসনে দূরত্বের বিলোপ
গানের শুরুতেই বলা হয়েছে—“পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে/সেলাই করা এক টুকরো কাপড়ের মতো”। এখানে বিশ্বায়নের (Globalization) ফলে পৃথিবীটা যে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে। টেলিভিশন বা প্রযুক্তির পর্দায় আমরা পুরো বিশ্বকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তাতে কি মানুষের দূরত্ব কমছে? গানটি এই প্রশ্নই তোলে।
২. ভার্চুয়াল বনাম বাস্তব অনুভূতি
গানটিতে বলা হয়েছে আমরা ড্রয়িংরুমে বসে টিভির পর্দায় ‘পপকর্ন’ হাতে অন্য কারো কান্না বা দুঃখ দেখি। অর্থাৎ, অন্যের আবেগ আমাদের কাছে এখন কেবলই ‘বিনোদন’ বা ‘বিলাসিতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তব অনুভূতিগুলো ক্রমে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে।
৩. আধুনিক নাগরিক একাকিত্ব
গানটির মূল আবেদন হলো—সব কিছু কাছে আসার পরেও মানুষ বড্ড একা। “তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে/তুমি আর আমি যাই দূরে সরে সরে”—এই লাইনটি মানুষের সম্পর্কের মাঝখানে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তাকেই নির্দেশ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও মনের দূরত্ব কমেনি, বরং বেড়েছে।
৪. অস্তিত্বের সংকট ও স্মৃতি
গানের শেষ দিকে গায়ক যখন জিজ্ঞেস করেন—“ভেবে দেখেছ কি?”—তখন তিনি আসলে আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেন। আমাদের জীবন কি কেবলই যান্ত্রিক চাকা? আমরা কি আমাদের সোনালী স্মৃতি বা মৌলিক মানবিক সম্পর্কগুলো হারিয়ে ফেলছি?
সারসংক্ষেপ: গানটির মূল কথা হলো—প্রযুক্তি আর আধুনিকতা আমাদের পৃথিবীটাকে ছোট করে দিলেও, আমাদের হৃদয়ের প্রসারতা কমিয়ে দিয়েছে। আমরা একে অপরের অনেক কাছে থাকার নাটক করলেও আসলে যোজন যোজন দূরে বাস করছি।
শুধু টেলিভিশনের প্রভাব নিয়েই এত মর্মস্পর্শী গান লিখে ফেলেছেন গৌতম চট্টোপাধ্যায় আর পল্লব রয়। ভেবে দেখুন, এই যে আজকে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, সব নষ্টের মূল – এটার প্রভাব দেখলে তারা কী করতেন!
