প্রথম পাতা » মতামত » যে কারণে বই পড়া খুব জরুরি

যে কারণে বই পড়া খুব জরুরি

Reading book

মানুষের ধন-রত্ন, অঢেল সম্পদ একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি ভালো বইয়ের শিক্ষা কখনো নিঃশেষিত হয় না। বই মানুষের মধ্যে দয়া, বিনয় ও সৃজনশীলতার বিকাশে সাহায্য করে। কিন্তু তবু আমরা বই পড়া থেকে অনেকদূরে সরে যাচ্ছি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখ গেছে, বইয়ের সংস্পর্শে এবং বই পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে বড় করে তোলা শিশুদের সহজে ভাষা শেখা ও স্কুলে সাফল্যের সংযোগ রয়েছে। মানসিক প্রশান্তির জন্য বই সর্বোত্তম বন্ধু। শব্দহীন নির্মল বিনোদনে বই-ই হতে পারে একমাত্র সহচর। এসব কারণে বই পড়া খুব জরুরি।

সন্তানেরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়লে আমাদের সমাজে অনেক অভিভাবক রাগ করেন। তাদের ধারণা, পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়লে লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। এ ধারণা মোটেও ঠিক নয়। বইয়ের বিকল্প শুধু বই-ই হতে পারে। এক সময়ে মানুষ অবসর কাটাতো বই পড়ে। গল্প-গুজবে, আড্ডায় ছিল কবিতা আর গল্পের চরিত্র নিয়ে মুখরতা। কোথায় যেন হারিয়ে গেল সব। প্রযুক্তির অবগাহনে বই পড়ার জায়গাটি টেলিভিশন, কম্পিউটার আর স্মার্ট ফোন কেড়ে নিয়েছে। তাই বলে কী বইয়ের চাহিদা কম্পিউটার, মোবাইল বা টেলিভিশন দ্বারা পূরণ করা সম্ভব?

আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃৃতি চর্চার সর্বোত্তম জায়গা হচ্ছে পরিবার। সেখান থেকেই তৈরি হওয়ার কথা বইপড়ুয়া প্রজন্ম। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে আমরা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আর এ সুযোগে অপসংস্কৃতি ভর করে আমাদের মননে ভাঙন শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে সমাজে ফুলেফেঁপে উঠছে অস্থিরতা। শূন্যতা, হাহাকার ধ্বংস করতে বসেছে আমাদের সৃজনী-ক্ষমতা আর মানবিক মূল্যবোধকে।

ফেসবুক, মোবাইল, ইন্টারনেট, ইউটিউবসহ অন্য সব সামাজিক মাধ্যম বরং প্রজন্মকে আরো অসহনশীল, অশালীন, অমার্জিত এমনকি অসামাজিক করে তুলছে। আচারে অনুষ্ঠানে, সামাজিকতায়, ঘরে-বাইরে সবখানে এখনকার বইপ্রীতিহীন ডিজিটাল প্রজন্মের মাঝে সুশিলীতা লক্ষ করা যায় না। এসব সামাজিক মাধ্যমের অনেক ভালো দিক থাকলেও অনেক খারাপ বা নেতিবাচক দিকগুলোই বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে; যা বই পড়ুয়া প্রজন্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রজন্মের মেধাবী সন্তানরা যেভাবে সামাজিক ডিজিটাল মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অকাতরে সময় নষ্ট করছে, যদি তারা বই পড়ার পেছনে এর অর্ধেক সময় ব্যয় করত তা হলে মেধায়, মননে, সৃজনে একটি রুচিশীল, মানবীয় বোধসম্পন্ন প্রজন্ম দেশকে আলোকোজ্জ্বল করে দিতে পারত। বই পড়ে জ্ঞানের ভুবনে মানুষ আপন মনে বিচরণ করতে পারে। মানুষকে পরিশীলিত ও বিশুদ্ধ জ্ঞান ও আনন্দ দিতে পারে বই। কেননা পুস্তক হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ; যার সঙ্গে পার্থিব কোনো ধন-সম্পদের তুলনা হয় না।

বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণে আপনিও ভুমিকা রাখুন। কয়েক বছর ধরে আমি ইমেল, ফেসবুক আর লিঙ্কডইনে বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণে প্রচারাভিযান চালাচ্ছি। খুব সুফল বা সাড়া পেয়েছি একথা বলা যাবেনা। কারণ আমাদের মন, চোখ, হাত ব্যস্ত মুঠোফোনের নেট দুনিয়ায়! অনলাইন আসক্তিতে কমবেশি সবাই নিমগ্ন! কি বিয়ে বাড়ি, কি মউত বাড়ি (মৃতের বাড়ি), জন্মদিনের অনুষ্ঠান, বিয়েবার্ষিকী অথবা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে আগের সেই সরব অংশগ্রহণ এখন আর নেই। সামাজিক অনুষ্ঠান হোক বা পারিবারিক অনুষ্ঠান সবখানে সবাই ফেসবুকে/অনলাইনে বুঁদ হয়ে থাকার ফাঁকে ফাঁকে পারস্পরিক কথা বলছেন। মউত বাড়িতে যান কিংবা অসুস্থ রোগি দেখতে যান সবখানে মানুষের মাঝে যেন মানুষ নেই!

book is dead

সমাজের এমন অবস্থা যে আমাদের যেন কোনো দায় নেই! দায়িত্ব নেই! বোধ নেই! চেতনা নেই! করণীয় কি কিছুই নেই? অথচ আমরা মানবীয় সমাজ চাই, মেধাবি ও মননশীল প্রজন্ম চাই। কিন্তু সেজন্য সবার আগে দরকার মানবিক শিক্ষা। মানবিক শিক্ষা শিক্ষালয়ে পাওয়া যায়না, সমাজ থেকে- পরিবার থেকে দিতে হয়। আর সেজন্য প্রয়োজন বই। বই পড়া আন্দালন। পাঠাগার আন্দোলন এবং দরকার বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণ।

বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণ আসলে কী। বই ভিত্তিক সামাজিক সর্ম্পক স্থাপন করাই বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার মূল থিম। সেটা কিভাবে-

  1. শিশু-কিশোরদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে।
  2. বিয়ে-বিয়েবার্ষিকী, জন্মদিন, সন্তান ও পারিবারি সদস্যদের সাফল্য অর্জন, বিদেশযাত্রা, বিশেষ দিবসে অন্য গিফটের পরিবর্তে বই কিনে দিতে পারি।
  3. আমাদের দেশে ঈদ সালামির প্রচলন আছে। আমরা চাইলে ১০০ বা ২০০ টাকা না দিয়ে প্রজন্মকে বই উপহার দিতে পারি।
  4. সন্তানদেরকে স্থানীয় পাঠাগারে পাঠাতে পারি। নিজেরা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি।
  5. আপনার পড়া পুরণো বইটি কেজির দরে বিক্রি না করে অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। অথবা কোনো পাঠাগারে দিতে পারেন।
  6. যাদের পাঠাগার আছে তারা এই পেইজে নান ঠিকানা ফোন নম্বর প্রচার করতে পারেন। যাতে আগ্রহীরা আপনাদের পাঠাগারে বই দিতে পারে।
  7. যাদের সংগ্রহে অনেক বই বছরের পর বছর স্তুপাকারে পড়ে আছে তারা বই দান করার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন।

তাই আসুন সবাই মিলে পাঠাগার আন্দোলনকে জোড়দার করি। বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণে ভুমিকা রাখি। পাঠাগার আন্দোলনের জয় হোক

লেখক: আহবায়ক ও সঞ্চালক, বইকেন্দ্রিক সামাজিকতার জাগরণে প্রচারাভিযান (বইসাজ)
মোবাইল- ০১৭১২৩৪২৮৯৪, ইমেল : bookreadersociety@gmail.com

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

S M Mukul
এস এম মুকুল
লেখক-কলামিস্ট, হাওর ও কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষক

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *