আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ডাইনিং-এ খেতে খেতে শরীরে ভিটামিন, মিনারেলের ঘাটতিজনিত বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া শুরু করল। যেমন- প্রচন্ড অবসাদ, কানে শব্দ হওয়া, মাসল ক্রাম্পিং ইত্যাদি।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর উনি বললেন পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, আর কোন সমস্যা নেই। আর এই ওষুধটা লিখে দিচ্ছি, খান দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। উনি লিখেছিলেন মালটিভিট প্লাস। এটি স্কয়ারের সাপ্লিমেন্ট।
খাওয়ার পর খুবই উপকার পেলাম। দ্রুত শরীর স্বাভাবিক হতে লাগলো। আমার উপকার দেখে আমার বন্ধু অযথাই আমার কাছ থেকে ট্যাবলেট নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। ফলে ডাক্তারের কথামতো একমাস হওয়ার আগেই ঔষধ শেষ হয়ে গেল। তাই আবার ফার্মেসিতে গেলাম। দোকানদার আমাকে মালটিভিট প্লাস না দিয়ে অ্যারিস্টভিট এম দিল।
আমি বললাম এই ঔষধ না। দোকানদার বলল মালটিভিট প্লাস নেই। এটা একই ঔষধ এবং অনেক ভালো।
দেখলাম বেক্সিমকোর। তাই কিনে আনলাম। খাওয়ার পর এমন পেট ব্যথা শুরু হলো, বলে বোঝাতে পারবো না। আধা ঘন্টার মতো কষ্ট করার পর পেট ব্যথা চলে গেল। আবার নতুন করে মালটিভিট প্লাস কিনলাম। এবার মনে মনে বললাম, ডাক্তারের কথা না শুনলে এমনই হয়।
ডাইনিং এর খাবারের দাম কম, পকেটের অবস্থাও খারাপ। তাই বাধ্য হয়ে ডাইনিং-এ খেতে হয়। অনার্স শেষ করে চাকরির জন্য পড়ছি। মনে হলো সাপ্লিমেন্ট দরকার। আবার মালটিভিট প্লাস কিনতে গেলাম, এবার দেখি অন্যরকম লাগছে। চিন্তা করলাম, কয়েকবছর আগের সাথে এখন মিলবে না, এটাই স্বাভাবিক।
খাওয়ার পর একটা ট্যাবলেট খেয়ে দেখি আবার প্রচন্ড পেট ব্যথা। আমি অবাক হলাম।
তারপর ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম মালটিভিট প্লাস কেন অ্যারিস্টভিট এম এর মতো আচরণ করছে। পরে যা পেলাম তা হলো-
সুগার কোটেড ট্যাবলেট বা চিনির প্রলেপযুক্ত ঔষধ
সুগার কোটিং বলতে বোঝায় সুক্রোজ-ভিত্তিক সিরাপের একাধিক স্তর প্রয়োগ করার একটি পদ্ধতি, যার সাথে প্রায়শই রঙ এবং পলিশিং মোম যোগ করা হয়, যা ট্যাবলেটের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং তিক্ত স্বাদ ঢেকে দেয়। এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির ফলে তৈরি হওয়া সুগার কোটিং ট্যাবলেটগুলো মসৃণ ও চকচকে হয়। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও, ট্যাবলেটের এই সুগার কোটিং প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং এটি ট্যাবলেটের ওজন ও আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
চিনির প্রলেপ পুরু হয় এবং স্তরে স্তরে ধীরে ধীরে গলে যায়। অর্থাৎ সুগার কোটিং ব্যবহারের ফলে ঔষধ ধীরে ধীরে শোষিত হয়। ফলে শক্তিশালী ভিটামিন ও খনিজ পদার্থগুলো আপনার পাকস্থলীতে ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করে।
ফিল্ম কোটেড ট্যাবলেট
ট্যাবলেটের ফিল্ম কোটিং-এ পলিমারিক ফিল্মের একটি পাতলা স্তর ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত ট্যাবলেট কোটিং মেশিন বা স্বয়ংক্রিয় ট্যাবলেট কোটিং মেশিনের সাহায্যে প্রয়োগ করা হয়। এটি ট্যাবলেটকে আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে, গিলে ফেলার সুবিধা বাড়ায় এবং রঙিন ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ করে দেয়। ফিল্ম কোটিং দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং উচ্চ-গতির উৎপাদনের জন্য আদর্শ।
ফিল্ম কোটিং ব্যবহার করাই হলো আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত উৎপাদন করা যায় এবং ঔষধ পাকস্থলীতে দ্রুত শোষিত হয়।
এন্টারিক-কোটেড ট্যাবলেট
Enteric Coating বলে আরেকটা জিনিস আছে। এন্টারিক-কোটেড ট্যাবলেটগুলো বিশেষ pH-সংবেদনশীল পলিমার দিয়ে তৈরি করা হয়, যা ওষুধকে পাকস্থলীর অম্লীয় পরিবেশে দ্রবীভূত হতে বাধা দেয়। এর পরিবর্তে, এগুলো অন্ত্রের উচ্চতর pH-এ দ্রবীভূত হয়। এটি এমন সব ওষুধকে সুরক্ষা দেয় যা পাকস্থলীর অ্যাসিডে নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা পাকস্থলীর আস্তরণে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
মূলত ওমেপ্রাজল, ইসোমেপ্রাজল বা প্যান্টোপ্রাজলের মতো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং অ্যাসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক ওষুধগুলোকে পাকস্থলীর তীব্র এসিড থেকে রক্ষা করতে এবং সরাসরি অন্ত্রে (Intestine) গিয়ে দ্রবীভূত হওয়ার সুবিধার্থে এই বিশেষ আবরণ দেওয়া হয়। এটি একদিকে ওষুধের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে এবং অন্যদিকে পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়া বা আলসারের ঝুঁকি কমায়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ও আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ধরণের এন্টারিক কোটেড ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করছে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
কোনটার কারণে আমরা পেট ব্যাথা হয়েছিল?
ফিল্ম কোটেড মাল্টিভিটামিনের কারণে আমার পেটে ব্যাথা হয়।
ফিল্ম কোটেড মাল্টিভিটামিনে থাকা আয়রন (Iron) বা জিংক (Zinc)-এর মতো ভারী মিনারেলগুলো সরাসরি পাকস্থলীতে মুক্ত হয়ে পেট ব্যথা বা বমি ভাবের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সুগার কোটেড (চিনির আবরণ যুক্ত) ট্যাবলেটগুলো পাকস্থলীতে অনেক ধীরে ধীরে গলে, যা পাকস্থলীর ভেতরের সংবেদনশীল স্তরকে তীব্র অস্বস্তি থেকে রক্ষা করে।
মালটিভিট প্লাস সুগার কোটেড ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন আবার কিনেছিলাম, ততদিনে ফিল্ম কোটেড হয়ে গেছে।

কেন মাল্টিভিটামিনগুলো ফিল্ম কোটেড হয়ে গেছে?
ঔষধ কোম্পানিগুলো সুগার কোটিং (চিনির প্রলেপ) বাদ দিয়ে ফিল্ম কোটিং (পাতলা পলিমারের প্রলেপ) ব্যবহার করার পেছনে মূলত ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত কিছু বড় কারণ রয়েছে। কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. উৎপাদন খরচ ও সময় অনেক কম
- সুগার কোটিং: এই প্রক্রিয়ায় ঔষধের ওপর চিনির অনেকগুলো স্তর দিতে হয়। এতে ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
- ফিল্ম কোটিং: এটি একটি আধুনিক ও দ্রুত পদ্ধতি, যা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা যায়। সময় কম লাগায় কোম্পানির উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়।
২. ঔষধের আকার ও ওজন ছোট রাখা
- সুগার কোটিং: চিনির ভারী প্রলেপের কারণে ট্যাবলেটের ওজন মূল ওজনের চেয়ে প্রায় ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং ট্যাবলেটটি অনেক বড় ও মোটা হয়ে যায়। ফলে এটি গিলতে কষ্ট হয়।
- ফিল্ম কোটিং: এই প্রলেপটি অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় ট্যাবলেটের আকার বা ওজনে কোনো পরিবর্তন আসে না।
৩. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ
- সুগার কোটেড ট্যাবলেটে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফিল্ম কোটেড ট্যাবলেটে চিনি থাকে না বললেই চলে, তাই এটি সবার জন্য নিরাপদ।
৪. আধুনিক অটোমেটিক মেশিনের ব্যবহার
- বর্তমান যুগের অত্যাধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল মেশিনগুলো ফিল্ম কোটিংয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। সুগার কোটিংয়ের জন্য অনেক বেশি ম্যানুয়াল বা মানুষের হাতের কাজের প্রয়োজন হতো, যা কোম্পানিগুলো এখন কমিয়ে আনছে।
৫. প্যাকেজিং ও পরিবহনে সুবিধা
- ফিল্ম কোটেড ট্যাবলেটগুলো অনেক শক্ত হয় এবং সহজে ভাঙে বা ক্ষয়ে যায় না। ফলে ব্লিস্টার প্যাকেটে (Blister Pack) এগুলো সহজে প্যাক করা যায় এবং পরিবহনের সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কম খরচে, দ্রুত সময়ে এবং বেশি পরিমাণে ঔষধ উৎপাদন করার জন্যই কোম্পানিগুলো সুগার কোটিং ছেড়ে ফিল্ম কোটিং বেছে নিচ্ছে—যদিও আমার মতো সংবেদনশীল পাকস্থলীর মানুষের জন্য এটি কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটা বিষয় আছে। গ্যাসট্রিকের ঔষধ বিক্রি। ডাক্তার ফিল্ম কোটেড মাল্টিভিটামিন গ্রহণের ক্ষেত্রে খাওয়ার আগে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেতে বলবেন। এক কাজে দুই কাজ। গ্যাসট্রিকের ঔষধের রমরমা ব্যবসা।
বিলুপ্তপ্রায় সুগার কোটেড মাল্টিভিটামিন

এখনও হাতে গোনা দু্ই একটি মাল্টিভিটামিন সুগার কোটেড রয়েছে। যেমন- Solvit-M
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ডাক্তাররা এই ঔষধ এখন আর লেখেন না। তাই, বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। অচিরেই হয়তো এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।
পাঠকদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, সুগার কোটেড মাল্টিভিটামিন ঔষধ ব্যবহার করুন, তাহলে পেটের ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবেন।
