স্বামী–স্ত্রীর দায়িত্ব বিষয়ে কতক কথিত সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারের মিঠা মিঠা বাণী শুনে কিংবা কাজকামহীন লেখকের তৈলাক্ত উপদেশ পড়ে অনেকেই মন খারাপের ঝাঁপি খোলে। তখন মনে হয়—আমার জীবন এমন মরুময় কেন? কী পাপ বা দোষ ছিল আমার? অথচ ইন্টারনেটের মিষ্টি কথা সম্পর্ককে যে কত বিশ্রীভাবে নষ্ট করে- তা একবারও ভাবি না।
সুরেলা বক্তা, ফেসবুক সর্বস্ব লেখক বা ব্লগারের কথায় রস মিশে থাকে—আহা! সে কী মধুময় দাম্পত্য! এসব ক্লিপ দেখে–শুনে বা কারো চিপকা–চিপকির ছবি দেখে মনে হতে থাকে, নিজের সঙ্গীই বুঝি দুর্ভাগ্যের মূল মূল! তখন মুক্তি পেতে কত যুক্তি খুঁজি!
কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। এইসব ইনফ্লুয়েন্সার, ভণ্ড বক্তা কিংবা সাধু–সন্ন্যাসীর লেবাসধারী শয়তানদের জীবনের পেছনের গল্প সাধারণত বিষণ্নতায় পরিপূর্ণ। যাদের কথায় ইনবক্স ভরে যায়, যাদের দৃষ্টান্তে মানুষ সম্পর্কের পাঠ নেয়, তাদের মুখোশ খুললে বাস্তব চিত্র ভয়ানক হয়েই আবিস্কৃত হয়। ধরা না পড়া পর্যন্ত আমরা সবাই কিছুটা সাধু সেজে থাকি! তাই কাকে দেখে মোটিভেট হচ্ছি, কার কথা শুনে সম্পর্ক সম্মন্ধে হতাশ হচ্ছি—এটা ভাবা দরকার।
অমুকের তমুকের জীবন দেখে নিজের ভাগ্য মাপা ভুল। অন্যের কথায় মন খারাপ করা, সঙ্গীর ওপর অভিমান জমানো কিংবা নিজের জীবনকে অন্যের আয়নায় দেখা—সবই আত্মপ্রবঞ্চনা। এইসব ক্লিপ, ওয়াজ, ব্লগ—সবই একেকটা রঙিন প্রলোভন। এর পেছনে আছে ব্যবসা, ক্লিক আর ফলোয়ারের লড়াই। সম্পর্কের বাজার এখন মন্দায়, তাই যারা এসব বিক্রি করে তারা আবেগকেই পুঁজি বানিয়েছে।
আপনি যদি দায়িত্ব পালনের মানদণ্ডে নিজেকে মাপেন তবে তৃপ্তি মিলবে। কিন্তু যত বেশি প্রত্যাশা করবেন, তত বেশি আশাভঙ্গের সাক্ষী হবেন। এটা শুধু আপনার নয়, পৃথিবীর সবার সত্য। জীবনকে যেমনভাবে পেয়েছেন, সেভাবেই আলিঙ্গন করতে পারলে মন ভারী হয় না। কিন্তু কেউ যদি সিনেমার নায়ক–নায়িকা ভেবে বাস্তবতা থেকে পালাতে চায়, তবে ক্ষতি তারই।
অন্যের কান পড়া নিলে নিজের সঙ্গীকে আর আপন মনে হয় না। সন্দেহ জন্মায়, ভালোবাসা দূরে সরে যায়। এই সন্দেহই সম্পর্কের বন্ধনকে ধীরে ধীরে ছিঁড়ে ফেলে। অথচ ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে ধার করা দরদের দরকার নেই—একটু ইগো ভুলে এগিয়ে গেলেই হয়। কিন্তু এখন মানুষ পাশাপাশি বসে থেকেও রাতভর স্বামী–স্ত্রীর দায়িত্ববিষয়ক ক্লিপ দেখে! একজন আরেকজনকে সেসব সেন্ট করে প্রতি উত্তরের অপেক্ষায় থাকে। এখন ক্লিপে ক্লিপে কথা; মানুষে মানুষে কথা হয় সামান্যই।
এই ফাঁকেই ঢুকে পড়ে তৃতীয় পক্ষ। তারা একা অশান্তিতে থাকে না বরং অন্যদেরকেও অশান্তিতে ফেলাকে দায়িত্ব মনে করে! কেউ বলে—“আপা, এমনটা মেনে নেবেন?” কেউ বলে—“ভাই, এই নারী আর আপনার নয়!”—এই কথাগুলোই বিষ হয়ে সম্পর্ক ভেঙে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া এমন অনেক ধান্ধাবাজে ভরপুর, যারা অন্যের দুঃখে ফায়দা তোলে। সংসারে সামান্য অশান্তি হলেই কেউ কেউ নতুন নাটক সাজায়, এমনভাবে সহানুভূতির ফাঁদ পাতে যে প্রতারণা মনে হয় পরামর্শ।
বাস্তবতা হলো—মিষ্টি বক্তৃতা, আবেগী শব্দ বা ভিডিওতে সাজানো রোম্যান্সে জীবন বদলায় না। বরং এসবের ফাঁদে পড়ে মানুষ নিজের বাস্তবতাকে হারিয়ে ফেলে। তাই বুঝে নিতে হবে, কোনটি আসল ভালোবাসা আর কোনটি দর্শক বানানোর খেলা।
নিজের পরিধিতে দায়িত্ববান থাকুন, অন্যের কাছ থেকে সামান্যই প্রত্যাশা রাখুন। কামনার খুব অল্পই এই জীবনে পূর্ণ হয়। আপনার সঙ্গী যেমন, তাকে সেভাবেই গ্রহণ করুন। কোন আরজে কী বলল, কোন হুজুর কানে কী রস ঢালল—সব উপেক্ষা করুন।
জীবন নাটক নয়, উপন্যাস নয়—এটা আপনার নিজের লেখা গল্প। চেষ্টা করুন সেই গল্পে নিজের অংশটা যেন সৎ, স্বচ্ছ ও স্বস্তির থাকে। যত কম প্রত্যাশা করবেন, তত বেশি শান্তি পাবেন। অল্পে তুষ্ট থাকুন—তবেই জীবনের গল্পের প্লট একদিন সত্যিই বদলে যাবে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
Raju69alive@gmail.com
