গ্রাম ছেড়ে দূরে থাকা মানুষগুলোর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যে সম্পর্কটি থেকে যায়, তা অনেক সময়ই চাঁদার সম্পর্ক। যারা কখনো খোঁজখবর রাখে না, তারা মাহফিল, খেলাধুলার আয়োজন কিংবা অন্য কোনো উপলক্ষ এলেই ফোনবুকের তালিকা ধরে রীতিমতো অভিযান চালায়। কে হাসপাতালে, কে জেলে কিংবা কবরে— সে খবর রাখার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করে না; বরং নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেয়—চাঁদা এত। আয় কত করে, খরচ কীভাবে চালায়- এইসব খোঁজ-খবরের ধার ধারে না। কাকুতি-মিনতির কোনো সুযোগ নেই। একবার ‘না’ বললে বা ফোন না ধরলে, যে যাকে চেনে না তার নামেও দুর্নামের মহাকাব্য রচিত হয়।
রাজনীতির চাঁদাবাজি নিয়ে বহু কথা হয়। কিন্তু মসজিদ-মন্দিরের নামে, ওয়াজ-পূজার কালে, শীত-গ্রীষ্মের হালে, গরিবের পিকনিকের নামে যে চাঁদাবাজি চলছে— তা যে বন্ধ হওয়া দরকার, সে কথা সরকার বলবে না। এখানে সচেতন সমাজকেই জাগতে হবে। চাঁদা চাওয়ার এই প্রথা প্রকৃত প্রয়োজনের সুযোগকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। একজন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার জন্য সাহায্য পাওয়া যায় না; কারণ লাখ লাখ টাকা উঠে যায় জিয়াফতের নামে। ওরসের নামে হট্টগোলের আয়োজন চলে, সেখানে দিতে হয় পয়সা। না দিলে শুরু হয় মান-অভিমান।
নামসর্বস্ব সংগঠনের বাৎসরিক পুনর্মিলনে ‘ক্রেস্ট প্রদান’ প্রথার আড়ালে চাঁদাবাজি চলে অঞ্চলজুড়ে। কণ্ঠসর্বস্ব সুরেলা বক্তার আজগুবি কিচ্চা শোনানোর জন্য মাইক-প্যান্ডেলের খরচ বহন করতে হয় তাকেও—যার এসব মোটেই পছন্দ নয়। কেবল সামাজিকতার দায়ে ধার করেও চাঁদা দিতে হয়, যেখানে মনের কোনো সায় থাকে না। অথচ দরিদ্র পরিবারের একটি সন্তানকে পড়াশোনা করানোর খরচ জোগাতে মানুষ পাওয়া যায় না। দায়গ্রস্ত পিতার কন্যার বিয়েতে সহায়তা জোটে না। নাচানাচির আয়োজনে যে উৎসাহ, গীবতের আসর বসাতে যে আমেজ— তা ভালো কাজে দেখা যায় না।
সমাজে কত সংঘ, আর কত রেওয়াজ! সামাজিকতার নামে সবগুলোতে যদি আর্থিকভাবে অংশগ্রহণ করতেই হয়, তবে ডাকাতি না করে উপায় থাকে না। চাঁদার চিঠি বা অঙ্ক লিখে মেসেজ পাঠালে যে অসামর্থ্যবান মানুষ বিব্রত হয়, লজ্জায় পড়ে— এই বোধ যাদের নেই, তারাই সমাজের অনেক আয়োজনের নেপথ্য কারিগর। অবশ্য এতে আয়োজকদের নানারকম ফায়দাও থাকে। পাঁচ কড়ি আদায় করে দেড় কড়ি খরচ করে বাকিটা পকেটে গুঁজে নেওয়া যায়। স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করতে চায় না। অনেক সংসার তো সামাজিক চাঁদাবাজির পয়সায় চলছে। শুনেছি, কারো কারো এসব দিয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স হচ্ছে। ভিক্ষার নবতর সংযোজনে কেউ কেউ মোটাতাজা হচ্ছে।
সমাজে চাঁদাবাজির নতুন নতুন তরিকা আবিষ্কৃত হচ্ছে। কোনো সম্পৃক্ততা নেই—এমন সংঘেও অর্থ দিতে বাধ্য হতে হয়। তাও যদি দানের তকমায় ফেলা যেত, তবে কিছুটা স্বস্তি থাকত। কিন্তু স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়েই অনেক জায়গায় টাকা দিতে হয়। তাও যদি হাতে হাতে লেনদেন হতো অর্থ্যাৎ এসে নিত! এখন কেউ কেউ বিকাশে বা ব্যাংকে চাঁদা পাঠাতে বাধ্য করে। চাঁদাবাজির দুর্নামে একপেশেভাবে রাজনীতিবিদদের জড়িয়ে আমরা আসলে তাদেরই অপমান করি; অথচ বাংলার প্রতিটি গ্রামে বহুমাত্রিক চাঁদাবাজি নীরবে, নিভৃতে চলছে।
‘আছে’, ‘দিব না’, কিংবা ‘নাই, দিতে পারছি না’—এই মনোভাব সহ্য করার মানসিকতা হাত বাড়িয়ে রাখা মানুষগুলোর নেই। এসব বিষয় এমনভাবে সেনসিটিভ করে রাখা হয়েছে যে, ধর্মদ্রোহিতার অপবাদ দিতেও দুষ্টদের বুক কাঁপে না। উপরন্তু এমন দুর্নাম ছড়ানো হয় যে, শুনে শয়তানও ভাবে—বাপরে বাপ! আমি আর কী শয়তান, ওরা তো শয়তানের বাপ-ঠাকুরদা! কোথায় ওয়াজ, কোন দেশে যাত্রা, কোথায় শীত—সবখানেই মুক্তহস্তে সাহায্য চাই। অথচ পাশের প্রতিবেশী যে দুই বেলা অভুক্ত, তার খোঁজ রাখার প্রয়োজন একবারও মনে করা হয়নি। জীবনাচারে লোকদেখানো স্বভাব প্রতিদিনের রুটিনে ক্রমেই বেড়েই চলছে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com
