বৃষ্টির সময় বজ্রপাত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে বৃষ্টি ছাড়াও বজ্রপাত হচ্ছে- এটা ভয়ের ব্যাপার। তোমরা জেনে রাখো- বজ্রপাত একটি আকস্মিক ঘটনা- যার প্রতিরোধ ব্যবস্থা নাই। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসে সর্বোচ্চ হলে জুন মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। তাহলে বর্তমান সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতেই পারে। দুশ্চিন্তা ও সতর্কতার কারণ হলো- প্রতি বছরই দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাত। বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর আশঙ্কা দুইটিই বেড়ে চলছে। দেশের যেসব অঞ্চলে আগে খুব একটা বজ্রপাত হতো না, এখন সেসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেড়ে গেছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা বিচার করে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের সরকার।
অপরদিকে জাতিসংঘ বলছে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। সেখনে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মারা যায় বছরে গড়ে ২০ জনেরও কম। বাংলাদেশে গাছপালা কেটে ফেলা বিশেষ করে খোলা মাঠে উঁচু গাছ ধবংস করে ফেলা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে।
ফিনল্যান্ডের বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০ ভাগই কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। দেমে প্রতি বছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়। গত দশ বছরে দেশে ৩ হাজার ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসের ঘটনা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে দেড়’শোর মত মানুষ মারা যান। বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে হাওর অঞ্চলে। মানুষ ছাড়াও বজ্রপাতে প্রচুর গবাদি পশুও মারা যায়।
তোমরা কি জানো- শব্দ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪০ মিটার ভ্রমণ করে। উদাহরণ স্বরূপ, বিদ্যুৎ চমকানো এবং গর্জে উঠা বজ্রের মধ্যে ১০ সেকেন্ডের ব্যবধান থাকার অর্থ হল বাজ ৩.৪ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তবে, বলা হয়ে থাকে বজ্রমেঘ বেশ কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ হয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, তুমি বিদ্যুতের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন, সুতরাং তুমি হয়তো ইতোমধ্যেই বজ্রমেঘের তলায় রয়েছো! বাজ এতটাই কাছে যে তোমাকে যে কোন মুহুর্তে আঘাত করতে পারে।
বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করবো কিভাবে?
- বজ্রঝড় সাধারণত ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করতে হবে। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাবে, এটি বজ্রঝড় বা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেবে।
- বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলামাঠে যদি থাকো তাহলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। যতটা সম্ভব মাটির সাথে ছুঁয়ে থাকা অংশের পরিমাণ সবচেয়ে কম করার জন্য তোমার অবস্থানকে নিচু রাখার সময় পায়ের আঙুলের ডগার উপরে থাক। কানের পর্দা যেন ছিড়ে না যায় তাই উভয় হাত দিয়ে কানগুলোও ঢেকে রাখ।
- বজ্রপাতের আশংকা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ভবনের ছাদে বা উঁচু ভূমিতে যাওয়া উচিত হবে না।
- বজ্রপাতের সময় যে কোন ধরণের খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতে হবে, ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে হবে।
- খালি জায়গায় যদি উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থাকে, তার কাছাকাছি থাকবে না। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে থাকা বিপজ্জনক ।
- বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়াই উচিৎ হবে। সমুদ্রে বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
- যদি কেউ গাড়ির ভেতর অবস্থান করে, তাহলে গাড়ির ধাতব অংশের সাথে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না।
কাজ আবার কখন শুরু করতে হবে
বজ্রপাতের মেঘ সরে যাওয়ার পর কাজ আবার কখন শুরু করা যাবে। কাজ আবার শুরু করার একটি শর্ত হচ্ছে, একটানা তিরিশ মিনিট ধরে বজ্রপাতের গর্জন শুনতে না পাওয়া। এছাড়াও বজ্রপাতের মেঘ জমা হয়ে আছে কিনা, সেই বিষয়ে আবহাওয়া এজেন্সির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আশপাশের মেঘ বৃষ্টির রাডার উপাত্ত যাচাই করে নেয়া।
বজ্রপাতে আঘাত পাওয়া মানুষের জীবন বাঁচাতে কি করবে
দ্রুত জ্ঞান ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা বজ্রপাতে আঘাত পাওয়া মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। হৃৎপিন্ডের মাসাজ দেয়ার চেষ্টা করা এবং জরুরি সেবায় টেলিফোন করা।
ঘরের ভিতরে থাকাকালীন সতর্কতা
ঘরে থাকার অর্থ এটা নয় যে তুমি বজ্রপাত থেকে ১০০ ভাগ নিরাপদ আছেন। গাড়ি বা বাড়ির ভিতর বৈদ্যুতিক শক লাগার কারণে অনেকেই আহত হয়েছে।
তুমি যদি সিমেন্টের তৈরি বাড়ির মত শক্তপোক্ত কোন কাঠামোর ভিতরে থাকো তবে সেই ভবনে বজ্রপাত হলেও তুমি মোটামুটি নিরাপদে থাকবে। কেননা বিদ্যুতের কারেন্ট দেয়ালের মধ্যে দিয়ে সঞ্চালিত হওয়ার পর মাটি সেটা শোষণ করে নেবে। সাধারণতভাবে কাঠের তৈরি জিনিসগুলো নিরাপদ তবে টেলিফোন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং পানির কলের মত ধাতব বস্তুগুলোতে হাত দিলে কারেন্ট শক লাগার ঝুঁকি থাকে। সিমেন্ট বা কাঠের যে কোন ধরনের বাড়ির ভিতর থাকার সময় সব ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং একই সাথে দেয়াল বা ছাদের সিলিং থেকে এক মিটারের বেশি দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নিতে হবে। কম্পিউটার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতিগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে সবকটি সকেট থেকে বৈদ্যুতিক তার এবং ল্যানের তারগুলো সরিয়ে রাখ।
ঘন কালাে মেঘ দেখা দিলে ঘরের বাহির হবে না; অতি জরুরি প্রয়োজনে রবারের জুতা পড়ে বাইরে বের হতে পারো।
বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, খােলা মাঠ অথবা উঁচু স্থানে থাকবে না।
যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নাও। টিনের চালা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
উঁচু গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার বা ধাতব খুটি, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে।
কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা বা জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে।
বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি ও বারান্দায় থাকবে না। জানালা বন্ধ রাখতে হবে এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে হবে। বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবে না।
বজ্রপাতের সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ল্যান্ডফোন, টিভি, ফ্রিজসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এসব বন্ধ রাখতে হবে।
বজ্রপাতের সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা যাবে না। কাঠের বা প্লাস্টিকের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করতে পারবে।
