প্রথম পাতা » জীবনযাপন » উপকারের নীরব মহিমা

উপকারের নীরব মহিমা

helping

কাউকে কিছু দিয়ে বা কোনো উপকার করে তা নিয়ে খোঁটা দেওয়া ছোটলোকি আচরণ। যে অন্যের মঙ্গল করে, সাহায্যের হাত বাড়ায়—সে-ই প্রকৃত বড়লোক। ধনের বড়লোকির চেয়ে মনের বড়লোক হতে পারা সত্যিই সৌভাগ্যের। স্বেচ্ছায় কিংবা সমাজের নিয়মে কাউকে কিছু দান করে তা কখনোই মনে করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

অন্যের উপকারের মাধ্যমে যে বড়ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই উপকার নিয়েই খোঁচা দিলে সবই হারিয়ে যায়। উপকার গোপন রাখলে, দানের কথা আড়াল করলেই বরং মানসিকতার ঔদার্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কারো পাশে দাঁড়িয়ে পরবর্তীতে তা মনে করিয়ে দিয়ে বিনিময়ের প্রত্যাশা করা অতীতের অর্জনকে ম্লান করে দেয়।

মন বড় না হলে কেউ অন্যের উপকার করতে পারে না—হোক তা অর্থ দিয়ে কিংবা সময় দিয়ে। সৎ পরামর্শ দিয়েও কাউকে এগিয়ে দেওয়া কম সৌভাগ্যের কথা নয়। তবে দুর্ভাগ্য এই যে, অনেকেই উপকারের ঋণ স্মরণ করিয়ে উপকারভোগীকে দাস হিসেবে পেতে চায়। এটা মোটেও ঠিক নয়। যাকে যতটুকু উপকার করা হয়, তা নিঃস্বার্থভাবেই করা উচিত।

ব্যক্তিগত বিনিময়ের আশায় যে উপকার করা হয়, তার ওজন হালকা হয়ে যায়। তবুও যেকোনো সামান্য উপকারও প্রশংসনীয়। সমাজে উপকারের জাল বিস্তৃত হলে একটি কল্যাণময় সৌন্দর্য বিরাজ করবে। তাছাড়া উপকারের একটি ঐশ্বরিক দায়ও আছে—কোনো উপকারই বিনিময়হীন যায় না।

কারো কোনো উপকার করে তা যত দ্রুত সম্ভব ভুলে যেতে হবে। কাউকে করা উপকার মনে রাখলে প্রতিদান পাওয়ার ইচ্ছা জন্মায়। তখন পারস্পরিক সম্পর্ক আর সৌহার্দপূর্ণ থাকে না।উপকারভোগীকে আজ্ঞাবহ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। যারা অন্যের উপকার করে সুযোগ পেলেই তা স্মরণ করিয়ে দেয়, তারা আসলে ঋণী হতে শুরু করে।

যারা কারো বিপদে এগিয়ে আসে, পাশে দাঁড়ায় এবং কথা ও কাজে ভরসার কাঁধ হয়ে ওঠে—তারা নিঃশর্তভাবেই মহৎ। এই মহত্ত্ব তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একটি পয়সার দানও শর্তহীন হয়। শর্তাধীন উপকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ লেনদেনে পরিণত হয়। দান করে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইচ্ছা করলেও কেউ শতবর্ষ বাঁচে না। তবে কর্ম ও কথার মাধ্যমে মানুষ হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারে। যারা সমাজকে ঋণী করে যায়, তাদের ছায়া ও ছাপ কখনো হারিয়ে যায় না। দানের প্রতিটি পদাঙ্ক পৃথিবীর বুকে জ্বলজ্বল করে চিহ্নিত থাকে।

একটি ভালো কথাও পারস্পরিক ঋণ তৈরি করে। যে ভালো পরামর্শ পায়, সে আসলে জীবনের দিশা পায়। অর্থ ছাড়াও নানান পথে ও পদ্ধতিতে ঋণের হিসাব গড়ে ওঠে। দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়ে সুদিনে যদি কেউ খোঁটা দেয়, তবে সে নিজের প্রাপ্তি থেকেই বঞ্চিত হয়। জীবন সামনে যেভাবে উপস্থাপিত হয়, তার আড়ালেও বহু বাস্তবতা রয়ে যায়।

জীবনে উপকারের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। এক সেকেন্ডের জন্যও যদি কারো কল্যাণে আসা যায়, তবে সে সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক নয়। মহান হওয়ার সুযোগ মানুষকে বারবার হাতছানি দেয়—বলে, ক্ষুদ্র থেকো না, বড় হও। কেউ কেউ বড় হয়েও তা ধরে রাখতে পারে না। জিহ্বার উলটাপালটায় জীবনের মানচিত্র ওলটপালট হয়ে যায়।

সব অঙ্কের সমাধান এক অঙ্কে আসে না। কল্পনার সমাধান সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। মানুষ মানুষকে ঋণী করুক, মানুষ মানুষের উপকারভোগী হোক—তবু কখনোই যেন কাউকে কথার কষ্ট দেওয়া না হয়। জীবন আসলে অসুন্দর নয়; লোভ ও মোহে আমরা একে ক্রমশ জটিল করে তুলছি। জীবনের সরলতাই সবচেয়ে উপভোগ্য—সেটাই ফিরিয়ে আনা দরকার।

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

রাজু আহমেদ
প্রাবন্ধিক।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *