প্রথম পাতা » মতামত » বিশ্বাসের বাজারে মন্দা

বিশ্বাসের বাজারে মন্দা

Trust

জীবনে কার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কার জন্য লড়ছেন— তা ভেবে-মেপে নেবেন। যাকে বাঁচাতে সাঁতরাতে নামলেন, সে যদি আপনার ডুবে যাওয়া উপভোগ করে— এমনই তো হয় আজকাল। নিজের ভালোর জন্য কিছুটা স্বার্থপর হোন। কখনোই নিজেকে একেবারে সস্তা করবেন না।

যাদের জন্য সবার শত্রু হলেন, তাদেরও মন পেলেন না— তখন বাঁচবেন কী করে? স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে নেতা কর্মীকে মনে রাখে না, প্রয়োজন শেষ হতেই প্রিয়জনও হারিয়ে যায়। কাজেই সবার আগে, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’। এখানে মুখে মুখে সবাই সবার, বাস্তবে কেউ কারো নয়।

কে কাকে লুট করবে, সেই ধান্দায় বিশ্বাসের বাজারে মন্দা চলছে। সরল বিশ্বাস মানেই কলিজায় আরেকটি পেরেক। সবার অসুস্থতায় যে দৌড়ায়, তার অসুস্থতায় শিয়রের পাশে সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ থাকে না।

অনেকের উপকার করা মানে নিজের ক্ষতির পথ প্রশস্ত করা। কেউ কেউ তো মুখের ওপরই বলে, ‘আমার উপকার করতে বলেছিল কে?’— এ এক নির্মম প্রশ্ন, যা সরল হৃদয়ে গভীর আঘাত দেয়। উপকার করা নিশ্চয়ই উত্তম, কিন্তু এমন কারো উপকার করা ঠিক নয়, যার কারণে উপকার করার বিশ্বাসই মরে যায়।

যাদের পক্ষে সারাজীবন দৌড়ালেন, মৃত্যুর পর তাঁদেরই মধ্যে কয়জনকে আপনার জানাজায় দেখা যাবে? এজন্য মরার আগে মরতে হবে, শিখতে হবে। যাদের জন্য সুখ ত্যাগ করছেন, তারা যদি আপনার অসুখের মাত্রা বাড়ায়— তাহলে বেঁচে থাকার অর্থই ফুরিয়ে যায়।

মানুষকে সহায়তা করুন সাধ্য ও সামর্থ্যমতো, তবে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। মানসিক প্রস্তুতি রাখুন— উপকারের বিনিময়ে অপমানও আসতে পারে। আশা করবেন কেবল তাঁর কাছে, যিনি বেহিসাব দেন। মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশা মানে হতাশা।

মানুষ জন্মগতভাবেই মুখোশধারী, কপটচারী, স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ। কেউ কেউ তো উপকারীর উপকার ভুলে গিয়ে তার অপকার করতে তৎপর হয়। কথা, আচরণ ও ব্যবহারে প্রকাশ পেয়ে যায় লুকোনো স্বার্থের মুখোশ। মুখোশ যতই নিখুঁত হোক, একদিন খুলেই পড়ে।

তবে নিজেকে নিয়ে একেবারে ব্যস্ত থাকাও আত্মঘাতী। সমাজ, আত্মীয়স্বজন ও চারপাশের মানুষের স্বার্থপর মুখ দেখে একাকিত্ব দীর্ঘ হয়, হতাশা বাড়ে। যেখানে স্বার্থবাদ জিন্দাবাদ— সেখানে সুস্থ মস্তিষ্কও সংক্রমিত হয়ে পড়ে।

আজ মানুষকে বিপদে টেনে তুললে সে আপনার হাতই কামড়ে ধরে। ধারের টাকা চাইতে চাইতে দাতার মুখের পানি শুকিয়ে যায়, শরীরের তেল শেষ হয়, তবু পাওনা ফেরত মেলে না। এই এক নিষ্ঠুর সময়— যেখানে উপকার করতে ভয় লাগে, বিশ্বাস করতে লজ্জা লাগে।

সামাজিকতার সেই সোনালি সময় কতিপয় বজ্জাতের কারণে হারিয়ে গেছে। এখন আর সরলবিশ্বাসে পাশে দাঁড়ানো যায় না। ভিক্ষা ও সাহায্যের নামেও বাটপারি চলে। কাউকে আপন ভাবা মানে নিজের পায়ে কুঠার মারা। মুখে সবাই সবার হলেও বাস্তবে সবাই কেবল নিজের স্বার্থে ব্যস্ত। এভাবে চললে সুহৃৎ সম্পর্ক, সৌহার্দ্য, দয়ামায়া কিংবা কাঙ্ক্ষিত সামাজিকতা একদিন পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। বিশ্বাস, ভালোবাসা ও ভরসা হারালে মানুষ কেবল মানুষই থাকে না— সে হয়ে যায় সমাজের মুখোশধারী প্রাণী।

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

রাজু আহমেদ
প্রাবন্ধিক।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *