ওষুধ এবং অসুখ—তা তো মানুষই! নিজের মতো অন্যকেও বিশ্বাস করলে পুঁজি নিয়ে ফেরাই মুশকিল। চারদিকে ঠকানোর প্রতিযোগিতাই চলছে। মাছের বাজার থেকে মানুষের দরবার—কাউকে অন্ধবিশ্বাসের আর সুযোগ নেই।
‘ভাই, আপনাকে খারাপটা কী করে দেই’ বলেই অচল মাল চালিয়ে দেয় সবচেয়ে পরিচিত বিক্রেতা! ‘তুমি আমাকে নিজের মতোই বিশ্বাস করতে পারো’ বলে বিশ্বাসভঙ্গের সুপারশপ খোলে মনের ক্রেতাই!
মন খারাপে, দুঃসময়ে কিংবা মুড সুইং-এ যে মানুষের ওষুধ হওয়ার কথা ছিল, সে অসুখ ছড়ানোর ইজারা নিয়েছে। বিশ্বাসকে পুঁজি করে সে অবিশ্বাসের ব্যবসা করে। অথচ যার বিশ্বাস ভাঙে তার দুনিয়াটাতেই তো অন্ধকার নেমে আসে। কেউ কি বোঝে এসব?
পরীক্ষাবিহীন, যাচাইহীন বিশ্বাস বোকামি এখন। অনেকেই স্বার্থপর, প্রায় সুযোগবাদী। কাছাকাছি থেকেও অনেকেই বন্ধু নয়। নিজের চেয়ে বেশি আর কাউকেই বিশ্বাস করলে ব্যথা পেতেই হবে।
অবাধ ও অগাধ স্বাধীনতা দিলে অনেকেই সেটার অমর্যাদা করতে উঠেপড়ে লাগে। কষ্ট দিতে, খোঁচা দিতে কারো কারো খুব ভালো লাগে। অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রীর ভূমিকায় প্রত্যেকেই থাকতে চায়, অথচ দর্শকের সারিতে কেউ নিজেকে কল্পনা করে না।
ভুক্তভোগীর কষ্টের ক্ষত কত গভীর হতে পারে তা কেউ ভাবে না। বিশ্বাস নষ্ট করার পরে অনেকেই রুষ্টভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অচেনা মানুষ, অচেনাই যেন সবকিছু। এখানে কোনোদিন বৃষ্টি ঝরেছিল, বয়েছিল শান্তির শীতল সুবাতাস—তা কে বলবে?
বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের মতোই মানুষের প্রয়োজন ভরসা। ফর্সা চেহারা, অর্থ ও বিত্তের ব্যাপকতা—এসব সাময়িক মোহ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু বুকের মধ্যের সুন্দর মন আর মাথার মধ্যের সুচিন্তা ছাড়া ভালো থাকা কল্পনাতীত।
বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে কল্পনাতেও শান্তিতে থাকা যায় না। বজ্রের মতো ধেয়ে আসে বাজে আচরণের তীর, মনে জাগে অভিনয়ের ফলক, আর চোখে ভাসে একটা সম্পর্কের দুঃসহ পরিণতি। স্বার্থের কারণে মানুষ যে কত দ্রুত পাল্টে যেতে পারে, তা যে কাছ থেকে সয়নি/দেখেনি, সে আসলে উপলব্ধি করতে পারবে না।
দূরের মানুষের দেওয়া কষ্ট-ব্যথায় কী আসে যায়! শরতের শিশিরের মতো ওসব উবে যাবে। কিন্তু কাছের মানুষ যত্ন করে আঘাত দিলে, কথা দিয়ে ভঙ্গ করলে এবং বিশ্বাসকে হত্যা করলে সে ক্ষত চিরকাল থেকে যায়। মানুষের যত দুঃখ-বেদনা, সেসবের অধিকাংশের কারণ কাছের মানুষই।
মানুষ, মানুষ হোক। ভাঙতে নয়—গড়তে শিখুক। যে মানুষ বিশ্বাসের অমর্যাদা করে, আমানতের খেয়ানতে মজে, সে আসলে নিজের থেকেই হারায়। যারা ভরসা করে বাঁচে তাদের আস্থা কখনোই অরক্ষিত না হোক। সুরক্ষিত থাকুক প্রত্যেকটি সুন্দর সম্পর্ক।
সৌহার্দ্য ও সৌন্দর্যে ভরে উঠুক সুসম্পর্কের অলিগলি। বিশ্বাসের কলিগুলো ফুলে ফুলে ফুললিত হোক। মানুষ বাঁচে কয়দিন? সুদিন থাকে ক’দিন? কাজেই মুহূর্তও যাতে অকারণে নষ্ট না হয়। কারো কষ্ট না বাড়ে আমার কথায় ও আচরণে। ভালো থাকতে অনেক কিছু লাগে না—মানুষের মতো একটা মানুষ পাশে থাকলে, গল্প বললে এবং বুক পাতলেই হয়। স্বপ্ন অল্প হোক, তবে তা বাস্তবায়নের প্রত্যয় থাকুক।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
Raju69alive@gmail.com
