প্রথম পাতা » মতামত » লালনের ফাঁসি (মরণোত্তর)

লালনের ফাঁসি (মরণোত্তর)

Lalon

বাংলাদেশে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। এদেশে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার মরণোত্তর দেওয়া হয়। অনেকটা এমন : ‘জীবিত থাকতে তোমাকে চিনি নাই প্রিয়, এখন চিনেছি। এই নাও পুরস্কার। আমাদের ক্ষমা করো হে, জ্ঞানী।’ মরণোত্তর পুরস্কারের বিধান যেহেতু আছে মরণোত্তর তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখলেও মন্দ হয় না। বরং অবস্থা বুঝে কোপ দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে আমরা ফাঁসি দিতেও কার্পণ্য করবো না। যেহেতু আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে না সেহেতু চাহিবামাত্র কার্য সম্পাদন করা যাবে। এই বিধান থাকলে আজ লালনকে আমরা গান লেখার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলাতে পারতাম! ‘মূর্খ’ এবং ‘বিভ্রান্ত’ লালনকে ফাঁসি দেওয়া এখন সময়ের দাবি!

লালনের জীবন সম্পর্কে যদি না জানেন তবে সময় করে ‘মনের মানুষ’ সিনেমা দেখে নিতে পারেন। তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই তাঁর সৃষ্টি মানবিক উদ্ভাসনের অনিন্দ্য অনুষঙ্গ। তাঁর গান, দর্শন, জীবনচর্চা থেকে জীবনের ইতিবাচকতাই পাবেন শুধু। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি নিতে পারেননি। তবে হালের সলিমদ্দি কলিমদ্দির চেয়ে ধর্মজ্ঞান তাঁর বেশি বৈ কম ছিল না। একজন মানুষ যদি আমার পছন্দসই না হয় তবেই তাঁকে পরিত্যাজ্য মনে করার সুযোগ নেই। আর এটা মনে করলে জগতবিখ্যাত সব দার্শনিক অস্পৃশ্য হয়ে যাবে। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, আইনস্টাইনরা পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন হাজার বছর। মায়ানমারের দশ লক্ষ রোহিঙ্গার চেয়ে একজন লালনের মূল্য অনেক বেশি। দুঃখ হয়, লালন তাঁর কালেও এসব বিভাজন অমাবিকতার বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ করেছেন। এখনো এদেশে তাঁদের বিরুদ্ধশক্তি স্বার্থের ও ঢালের মোহে সক্রিয়। ধর্মকে এরা ঢাল হিসেবে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটে। লালন রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এসব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র নতুন নয়।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে যারা ক্ষমতায় এসেছিল সংবিধানকে ধর্ষণ করে তাদের ধর্মবোধ ছিল প্রবল। এদেশে যে লোক ধর্ম নিয়ে বেশি সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়েছে তার বৌ এবং কবিতার সংখ্যা আজো অজানা। হালের ক্রেজ শাকিব খান দুটি সন্তানের গর্বিত পিতা! তবে তার কোনো স্ত্রী নেই! অপু ও বুবলি নামের দুজন নারী যারা দাবি করছেন শাকিব তাদের স্বামী তাদের সাফ জানানো হয়েছে শাকিবের বাড়ির দিকে নজর না দিতে। তার জন্য পরিবার মেয়ে দেখছে! একজন সুপাত্রী পেলে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেবে। বৌ হতে হবে ডাক্তার! যেহেতু দুই ছেলের পিতা সেহেতু তার সক্ষমতা নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। সে বরং বৈধভাবে চারটা পর্যন্ত যেতে পারে। চার আর দুই মাত্র ছয়! সুলতান সলেমনের সাড়ে তিনশ স্ত্রী ছিল! অথচ লোকজন খারাপ ভাবে শুধু হুমায়ুন আজাদকে! বাঙ্গু মুসলমানের ধর্মবোধ কী ভয়ানক রকমের জিঘাংসায় লিপ্ত! আরেক থার্ড গ্রেড নায়ক মেহেদি যার লদকালদকি ছাড়া সিনেমা চলতো না সে চিল্লা দিয়ে এসে ঘোষণা দিয়েছে আবার সিনেমা করতে চায়! চিল্লায়া কন- মাশাল্লাহ! এক নারী যার নিতম্ব পর্যন্ত অনেকের চোখে ভাসে আজো সে হজ করে এসে ধর্মকর্মে নাকি মন দিয়েছে! মৌসুমি একবার বলেছিল তার সব ছবি যেন সরিয়ে ফেলা হয়! আহারে! স্ববিরোধিতা! কী ভয়ানক হিপোক্রেসিময় জাতি! উদ্ভট! একে বলে আধা নটি, আধা গৃহস্থ!

বলছিলাম ২০০৭ সালের কথা। ঢাকা বিমানবন্দর চত্বরে বাউলের একটি ভাস্কর্য হচ্ছিল। দেশ বিদেশের মানুষ দেখবে এমন চমৎকার একটি ভাস্কর্য। উদ্বোধনের সময় একদল মাওলানা বাধা দিলো। তারা সেনাপ্রধানের সাথে দেখা করলো। লোকজন এদিক দিয়ে হজ করতে যাবে, আসবে। যাওয়া আসার পথে এসব মূর্তি দেখলে হজ হবে? অথচ আমার এলাকার এক লোক হজ করে এসেই কোদাল নিয়ে ছুটলো ক্ষেতে! এর ওর আইল কাটা শুরু করলো। লোকজন তার নাম দিলো ‘কোদাইল্লা হাজি!’ এমন বহু হাজিসাব পরে যে পাজি হয় তার নজির এদেশে কম নেই। ধরেন, একজন চাকরিজীবী হজে যাবে। তার ছুটিটা দ্রুত দরকার। সব প্রোসেসিং যেন তাড়াতাড়ি হয় তাই সে অফিসের প্রধানকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিলেন। আপনি পাসপোর্ট অফিসে কাজ বাগাতে দিলেন পাঁচ হাজার! হজ হবে? এদেশে হজ করতে গেলেও আকাম করেই সব মেনেজ করতে হয়। তখন অজু ছুটে না? লালনের ভাস্কর্য দেখলে অজু নষ্ট হয়ে যায়! সন্দেহবাদীদের অজু সারাদিনই ছুটে!

বাউল ভাস্কর্যের সব শুনে সেনাপ্রধান জিভে কামড় দিলেন! অনেকটা মরণকামড়! দ্রুত সরিয়ে ফেলা হলো বাউল ভাস্কর্য। দৃষ্টিনন্দন একটি কারুকাজ থেকে বঞ্চিত হলো দেশি ভিনদেশি মানুষ! সেখানে পরে একটি কী যেন স্থাপন করা হয়েছে। আমি সেটা দেখার আগ্রহ করিনি। আমার বিশ্বাস সেটি দেখলে আমি এর বুঝবো না কিছুই।

অথচ সেনা সমর্থিত সেই সরকার পাক্কা দুই বছর ক্ষমতায় ছিলেন বন্দুকের জোরে। তাদের আল্লাহ ক্ষমা করবেন কি না জানি না!

শওকত ওসমানের একটা গল্প আছে ‘দুই মুসাফির’ নামে। লালন এবং জনৈক জোয়ারদারকে নিয়ে লেখা এই গল্পটি লেখকের অনন্য সৃষ্টি। মৃত্যুর পর দুজনেই পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। দেখা গেলো বিত্তশালী জোয়ারদাররা মানুষের কাছে কবেই ভুত হয়ে গেছেন আর লালনরা বেঁচে আছেন মানুষের মনের মণিকোঠায়। লালনের গান, তাঁর দর্শন আরো হাজার বছর পৃথিবীর মানুষকে আশা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে। তিনি যতই অশিক্ষিত হন না কেন তাঁর স্বশিক্ষার সুশিক্ষা আমাদের পথ দেখাবে দীর্ঘকাল। আজো জাতীয় সংকটে রবীন্দ্রনাথ, লালন, নজরুলের গান-কবিতা বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে ভীষণভাবে।

এই কথাগুলো কেন বললাম? একটা ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে লিখলাম এগুলো। ফরিদপুরে কোনো এক ছেলে (সনাতন ধর্মের) লালনের একটি গান কে স্টোরি করায় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছেলেটির উদ্দেশ্য কী জানি না। সে যদি আর কিছু না লিখে থাকে স্রেফ একটি গান শেয়ার দেওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করাটা কতোটা যৌক্তিক? তাহলে এদেশ থেকে কি লালনকে মুছে ফেলা হবে? রবীন্দ্রনাথ কি নিশ্চিহ্ন হবেন? সেটা কি সম্ভব?

আগ্রহীদের জানার জন্য গানের লাইন দুটো দিচ্ছি :

“সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারী লোকের হয় কী বিধান
বামন চিনি পৈতার প্রমাণ
বামনি চিনি কী করে? “

এই গানের কোনো অংশের জন্য যদি কাউকে শাস্তির আওতায় আনা হয় তবে তো প্রথম শাস্তি পাবেন যিনি এ গান সৃষ্টি করেছেন।

তবে দুঃখের বিষয় হলো লালনের এই প্রশ্নের উত্তর জীবিতকালেও তিনি পাননি, আজো পাবেন না। কোনো মাওলানা মুফতি, পুরোহিত ঠাকুর কেউ উত্তর দেবেন না। কেবল যে প্রশ্ন তুলবে তার টুটি চেপে ধরা হবে!

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *