একজন হাজি নাকি মক্কায় হজ করতে গিয়ে ভিক্ষা করে কোটিপতি হয়েছেন! সঙ্গত কারণেই হাজি সাবের দেশের নাম আমি জানতে চাইনি। এমন চিকন বুদ্ধির মুসলমান বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথায় মিলবে?
বাংলার মুসলমানরা হজ করতে যায়। বাহাদুরি আর অহমিকা নিয়ে ফিরে আসে তারা। নিজেকে আল্লাহর ঘরে কিংবা নবির রওজায় নিবেদিত করতে পারে না। ফিরে আসার পর হালখাতার দাওয়াত কার্ডে নামের আগে ‘আলহাজ’ না লেখায় ঘুসি দিয়ে দোকানদারের দাঁত ভেঙে ফেলে! হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত আলী বা হযরত ওসমানের মতো সাহাবিরা মনে হয় একবারও হজ করতে পারেন নি? তাঁদের নামের আগে তো ‘আলহাজ’ নাই!
গুজব রটনায় বাংলার মুসলমান দশে দশ পাবে। কোনো প্রমাণপত্র নাই, প্রজ্ঞাপন নাই কোত্থেকে পেলো শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলাম শিক্ষা আর থাকছে না! শুরু হলো নসিহত। পরে জানা গেলো বিষয়টি স্রেফ গুজব ছাড়া কিছু নয়। আমাদের টাকা পয়সা কম থাকতে পারে কিন্তু আল্লায় দিলে প্রত্যেকের একটি করে একাউন্ট আছে! যা মন চায় লেখা যায় এতে! কলম আর কালি কিছুই লাগে না! সব বলার পর যখন কোনো কথা আর বাকি থাকে না তখন বলে : ‘এদেশে আমাগো বাক স্বাধীনতা নাই!’ আপনারা তবে কিম উনের দ্যাশে যান না ক্যান! ওখানে প্রচ্চুর বাক স্বাধীনতা! পুরাই বাক বাকুম অবস্থা!
আজকে হঠাৎ শুনলাম মসজিদে এসি চালানো নিষিদ্ধ করছে সরকার! একাউন্ট কিন্তু আগের গুলোই! মানুষও তারাই! শুরু হলো বয়ান! ‘মূল টার্গেট মসজিদ’, ‘দেশটা মসজিদ শূন্য করতে চায়’, ‘ইসলাম বিরোধী’ এবং আরো কত কী!
২০০১ সালের নির্বাচনের সময় একদল লোক আমাদের বুঝালো আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এলে দেশ বিক্রি করে দেওয়া হবে, মসজিদে খুতবা হবে বঙ্গবন্ধুর নামে! আমরা তখন নাইনে পড়ি। ভয় পেলাম! বলে কী? আওয়ামীলীগ ফেল করলো। গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে স্মৃতিসৌধ দাঁপিয়ে বেড়ালো একাত্তরের দালালরা। জাতির পতাকা খামচে ধরলো সেই পুরনো শকুন। এরপর আওয়ামীলীগ আবার সরকারে এলো। একটানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে তারা! বাংলাদেশের কোন কোন মসজিদে বঙ্গবন্ধুর নামে খুতবা হয়েছে? দেশের কোন অংশ বিক্রি করা হয়েছে? জানেন কিছু? বঙ্গবন্ধু এ দেশে ইসলাম প্রচারে ও প্রসারের জন্য অনেক কিছু করেছেন। বাংলাদেশে যতজন ক্ষমতায় এসেছেন তাঁদের প্রত্যেকের পিতার চেয়ে শেখ লুৎফর রহমানের লেবাস ছিল বেশি সুন্নতি, তিনি একজন পরহেজগার মানুষ ছিলেন। অথচ তাঁরই সন্তান বঙ্গবন্ধুর দলটিকে এদেশে ইসলাম বিরোধী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় বারবার! অন্য সব সময়ের চেয়ে বাংলার মুসলমানরা এখন ভালো আছে, পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশের চেয়ে বাংলার মুসলমানরা নিরাপদে আছে। যদি এ কথা স্বীকার না করেন তবে আপনি নিশ্চিত আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া করতে জানেন না।
একটা জিনিস তবু ভালো লেগেছে। কোনো এক সময় বাংলায় মসজিদে মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল! আজান দেওয়া যেতো না মাইকে! সেটা ছিল বেদাত। অথচ আজ এসির জন্য লোকজন সোচ্চার। বাংলার মুসলমান কোনটা বেদাত, কোনটা যৌক্তিক তা অন্তত বুঝতে পেরেছে। এটাও কম না!
আমার প্রথম শুনেই মনে হয়েছিল এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। কারণ মসজিদে সারাদিন এসি চলে না। এক দুই ঘণ্টা চলে। তবু বাংলাদেশের কত শতাংশ মসজিদেই আর এসি আছে! এটাও সত্য যে, এসি-টাইলস-মার্বেল-কার্পেটে মোড়ানো মসজিদগুলো এখন আর সাধারণের ইবাদতের সার্বজনীন বায়তুল্লাহর শাখা হতে পারেনি। অনেক প্রান্তিক লোকই ভয়ে এসব চাকচিক্যময় মসজিদে যায় না। আমাদের গ্রামের মসজিদগুলোও প্রায়ই তালা দিতে হয়। নজরুল এ বিষয়ে বলেছিলেন : ‘খোদার ঘরে কে কপাট দেয়, কে দেয় সেখানে তালা/ সব দ্বার এর খোলা রবে চালা হাতুড়ি শাবল চালা!’
কোনো কারণে যদি আমাদের কৃচ্ছ্রতা সাধন করতেই হয় তবে আমি মুসলমান হিসেবে মনে করি, আমার মসজিদের যদি করার কিছু থাকে তবে সে সহযোগিতা সর্বপ্রথম শুরু হবে সেখান থেকেই। আর এটিই রাসুল (স) এর ইসলাম, শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্মার্থ। ইসলাম কখনো ভোগ করতে শেখায় না। মুসলমান যদি ত্যাগের মানসিকতায় ঋদ্ধ হতে না পারে তবে আর কারা এর উদাহরণ হবে এ পৃথিবীতে?
পুরো পৃথিবী জুড়েই এখন জ্বালানি সংকট চলছে। বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতির গতিকে সমুন্নত রাখাই বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ ছাড়া সেটি সম্ভব নয়। পোল্ট্রি ফার্ম, পশুর খামার, কৃষিকাজ এখন সবই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলার অর্থনীতি না বাঁচলে দেবালয়গুলোও সতেজ থাকবে না। ‘খোদার এলেমে বুক ভরে না তলায় পেট শূন্য হলে।’ কোনোদিন এদেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে যে এসির জন্য আজ দুঃখ করলেন তা আর লাগিয়ে রেখে কী করবেন? ‘নগর পুড়িলে দেবালয় এড়ায় না!’- একথা মনে রাখতে হবে।
একসময় পুরো পৃথিবীর সমস্যার সমাধান হতো মসজিদে বসে। আজ বাংলার মসজিদগুলো স্রেফ ইবাদতখানা! প্রতিটা মহল্লায়, প্রতিটা গ্রামে একটি উগ্র প্রজন্ম নেশা, মোবাইল, পাবজিতে আসক্ত। মসজিদগুলো কী করেছে? আমরা আজান দিলে মসজিদে যাই, এসির নিচে বসে থেকে আরামসে দুই/চার রাকাত নামাজ পড়ে চলে আসি। পনের মিনিট পরে দেখবেন একজন রিক্সাওয়ালা নামাজ পড়ছে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে! আফসোস!!
যদি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এসি বন্ধ করতে হয় তবে প্রথমে প্রতীকী হলেও মসজিদগুলোর এসি বন্ধ হোক। তারপর জাতি বুঝুক যুগ যুগ ধরে জাতির দুর্দিনে ইসলামই সর্বপ্রথম ত্যাগী মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এরপর লজ্জায় যদি বড় সাহেবের এসি, শপিংমলের এসি, অফিসের এসি বন্ধ না হয় তবে বুঝবেন বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ঐ কোটিপতি হাজির মতো চিকন বুদ্ধির নির্লজ্জ মুসলমান!
ইহকালে যা-ই হোক, পরকালে এদের মুক্তি নেই।
জয় বাংলা।
