প্রথম পাতা » মতামত » আসাদুজ্জামান নূর : আমাদের বাকের ভাই

আসাদুজ্জামান নূর : আমাদের বাকের ভাই

Asaduzzaman Noor

বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, আবৃত্তিশিল্পী, অভিনেতা, নির্দেশক আসাদুজ্জামান নূর স্বাংধীন বাংলাদেশের একজন সূর্যসন্তান। তিনি ২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নীলফামারি থেকে নির্বাচিত সাংসদ, সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। তিনি জীবনের সাথে লড়াই করে গড়ে ওঠা এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। এই কাজটি তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। তাঁর বাচনশিল্প, দুর্দান্ত অভিনয় সত্তা, ব্যক্তিত্বের মাধুর্য দিয়ে নূর জয় করেছিলেন গণমানুষের হৃদয়। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি অভিনেতা থেকে চলে গিয়েছিলেন সংসদে। এরপর বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। মানুষের ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছেন। রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক জগতকে আলোকিত করেছেন। কিছু ভুল তাঁরও ছিল। বাংলাদেশের সকল রাজনীতিকেরাই এই ভুলের জগতে বাস করেন। কেউ এখানে শতভাগ শুদ্ধ নন। সময় হয়তো অনেক কিছুরই হিসেব নেবে।

নূর জমিদারপুত্র নন। তিনি আর দশটা সাধারণ ছেলেদের মতোই নীলফামারি থেকে ঢাকায় পাড়ি জমান। পড়ালেখা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নাগরিক নাট্যদলে যোগ দেন। আশির দশক ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যুগ। সদ্য স্বাধীন দেশে ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র গ্রহণ করে নানামুখী উদ্যোগ। এ সময় জনমনে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তীব্র অনুরাগ সৃষ্টি, মধ্যবিত্তের মন ও মননকে গড়তে ঢাকায় এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন একদল গেরিলা যোদ্ধা। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, আবদুল্লাহ আল মামুনরা এই কাজে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। আসাদুজ্জামান নূরও তাঁদেরই একজন। তিনি আবৃত্তি ও অভিনয় দিয়ে জনগণের হৃদয়কে স্পর্শ করেন। ‘দেওয়ান গাজীর কিচ্ছা’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ প্রভৃতি মঞ্চনাটক ছিল মুক্তিকামী বাঙালির স্বাধীনতার ডিসকোর্স। ‘দেওয়ান গাজীর কিচ্ছা’ নাটকটি নির্দেশনা দেন আসাদুজ্জামান নূর। এই নাটকটি সারাদেশে শত শত বার মঞ্চস্থ হয়। তাঁর অভিনীত ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে দরাজ কণ্ঠে তিনি যখন বলে উঠেন : ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়?’ তখন বাঙালির রক্তে আগুন লেগে যায়, শোণিতে জ্বলে তীব্র বারুদ। জাতি জেগে ওঠে আরেকবার। প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধের বিচার। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরু হয় গণরায়। প্রস্তুত হয় ফাঁসির মঞ্চ। রাজাকারদের প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসে তখনই। সময় ও সুযোগ পেলে এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হবে। গোপনে এবং গভীরে আয়োজনটি চলতে থাকে নীরবে, নিভৃতে। আসাদুজ্জামান নূররা সেই কল্পিত ভয়াবহ সময়ের দণ্ডিত বিপ্লবী। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত আসামী যখন সংসদে যায় মুক্তিযোদ্ধারা তখন থাকে নন্দিত নরকে। এটাই নতুন বাংলাদেশ।

মঞ্চ নাটক থেকে নূর চলে আসেন টিভির পর্দায়। অভিনয় করেন কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, আজ রবিবারসহ অসংখ্য নাটকে। বাকের ভাই চরিত্র চিত্রণে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের বাকের ভাই। মিথ্যা মামলায় তাঁর ফাঁসির রায় হলে সারাদেশের মানুষ কল্পিত এই চরিত্রটির মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিল করে। যেদিন নাটকের পর্বে সত্যই তাঁর ফাঁসি হয় পুরো দেশ থমকে যায়। চারিদিকে সুনশান নীরবতা নেমে আসে। দেশের মানুষ এই চরিত্রটির জন্য কেঁদেছে নিভৃতে। ১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমণি’ সিমেমায় মুক্তিযোদ্ধা বদির চরিত্রে অভিনয় করে আবারো জয় করেন মানুষের হৃদয়। এছাড়া ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমায় অভিনয় করেন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার চরিত্রে। নিষ্ঠুরতা, আভিজাত্য আর সাহসী মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের দুর্দান্ত প্রকাশ ঘটান এই চরিত্রে। ‘সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড’ এ ম্যানেজার, ‘মাটির পিঞ্জিরায় বন্দী হইয়ারে’ নাটকে নান্দাইলের ইউনুস নামের সিরিয়াল কিলার, ‘নিমফুল’ এ কুখ্যাত ডাকাতসহ বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। অভিনয়ে দুর্দান্ত সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ লাভ করেন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’।

কালচারাল ফ্যাসিস্ট নামের একটি নতুন শব্দ যোগ করা হয়েছে বাংলাদেশের মব ডিকশনারিতে। এদেশে রবীন্দ্র-চর্চা, মুক্তিযুদ্ধের গান-সিনেমা-নাটক যারা করে তারা এখন ওই অভিধায় সিক্ত! আর যারা নতুন বাংলাদেশে জিন্নাহর জন্মদিন পালন করে, ইসলামাবাদে ছুটে যায় পুরনো বাপ দাদাদের সাক্ষাতের জন্য, উর্দু জবানে কাওয়ালি গায় ভাষার মাসে, মুক্তিযুদ্ধের সকল ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পুড়িয়ে দেয়, শেখ মুজিবের মাথায় প্রশ্রাব করে, মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরায় তারা বেশ কালচারাল আর্টিস্ট!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভালো মানুষদের স্থান নেই। নূরের সবচেয়ে বড় ভুল এ দেশের রাজনীতিতে আসা। এদেশের রাজনীতি করবে তৈলসিক্ত চ্যালা-চামুণ্ডা-চামার শ্রেণির লোকজন। শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল মানুষরা এ জগতে কেন আসবে? আমরা শোষিত হবো মূর্খ একদল ছাগলদের দিয়ে। এটাই আমাদের নিয়তি। এখন কতো সুন্দর দেখেন না? শিল্পে, সাহিত্যে, ক্রীড়ায় কোনো গুণীজন নেই। সাকিবের মতো বিশ্ব অলরাউন্ডার, মাশরাফির মতো নিবেদিত ক্রিকেটাররা এদেশে ঘৃণিত। মবরাজ্য এখন ফুরফুরা। সকলেই এখন আদিম খেলায় নিয়োজিত। ক্রিকেট, ফুটবল তো হারামই! এই জাতির কোনো অর্জন নেই। গৌরব নেই। স্বকীয়তা নেই। সব জায়গায় শুধু নেই আর নেই। থাকার মধ্যেও আছে নেই।

২০০১, ২০০৯ এর নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এরপরের তিনটি নির্বাচনের অন্তত একটি নিয়ে (২০১৮) ভয়াবহ আপত্তি আছে। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২৯ ডিসেম্বরের ওই রাতে আমি নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার জীবনে একটি দুর্বিসহ রাত ২০১৮ এর নির্বাচন। নূরদের মতো সংগ্রামী মানুষদের উচিত ছিল এই নিবাচনটি বয়কট করা। তিনি করেননি। এটি তাঁর রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত। বড় বড় মানুষদের ভুলও বড় হয়।

২০২৪ এর আন্দোলনটি প্রথমে কোটাবিরোধী হলেও ক্রমেই তার রূপ বদলেছে। পরে এটি ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হয়ে ওঠে। এটি যারা করেছে তারাই স্বীকৃতি দিয়েছে। এই রকম প্রতারণা যারা করেছে সময় হয়তো তাদেরও বিচার করবে। তবে আওয়ামি সরকারের পতন হয়তো প্রকৃতির নিয়মেই অনিবার্য ছিল। বিশেষত এই পতনের মধ্য দিয়ে জাতির প্রকৃত রূপটিও দেখা গেলো।

গত দুই বছরে দেশের কী কী উন্নতি হয়েছে কোন কোন সেক্টরে অবনতি হয়েছে সেটি গবেষণার বিষয়। আমি এ বিষয়ে বলব না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কুখ্যাত ক্রিমিনালরাও পুনর্বাসিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। নূর সেই তুলনায় নস্যি।

২০২৪ এর আন্দোলনে নূর যদি ঘাতক হন তাহলে তাঁরও বিচার হবে। তবে অবস্থা দেখে মনে হয় তিনি সুবিচার পাচ্ছেন না। রাষ্ট্র যেন এই গুণী মানুষটির পাশে দাঁড়ায়। তিনি যেন আইনি সহায়তা পান সেই প্রত্যাশা করছি। অপরাধী হলে দ্রুত বিচার করে শাস্তি দিন, নিরপরাধ হলে বিচারের নামে প্রহসন বন্ধ করুন, তাঁকে মুক্তি দিন।

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *