২০১৮-১৯ সালে বড় ভাই বোনেরা বিসিএস পরীক্ষা দেবার ক্ষেত্রে ‘পররাষ্ট্র সেবা ক্যাডার’-কে অগ্রাধিকার তালিকায় সবচেয়ে উপরে রাখতেন। সময় বদলেছে। আমার সহপাঠীদের ক্ষেত্রে দেখছি তারা শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারকে সবচেয়ে উপরে রাখছেন। তাদের দ্বিতীয় পছন্দ পুলিশ ক্যাডার। পররাষ্ট্র ক্যাডারের চাইতে শুল্ক ক্যাডার হলে অতিরিক্ত কী লাভটা হয় – সেটা আমরা জানি।
আগে লোকে দূর্নীতি করতে লজ্জা পেয়েছে। এখন পায় না। দূর্নীতিকে গত ৫০ বছরে নরমালাইজ করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে আপনি বৈষম্যের, দুঃশাসনের বড় বড় নজির পাবেন কিন্তু ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের সবচেয়ে বড় শত্রুও কখনো এই অভিযোগ করেনি – যে প্রশাসনে দূর্নীতির সংস্কৃতি ছিল। ব্রিটিশ আর পাকিস্তানিরা নিষ্পাপ ছিলেন না। আমি বলছি না তারা কস্মিনকালেও ঘুষ নেননি, নিয়োগ বাণিজ্য করেন নি। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে, বর্তমান পাকিস্তানে যে দূর্নীতির সংস্কৃতি চালু হয়েছে সেটা ছিল না।
১৯৭১ সালে এমন কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল যেটা রাতারাতি ফকিন্নিদেরকে শিল্পপতি এবং চাপরাসিদেরকে আমলা বানিয়ে দিয়েছে। আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই, কোন পরিসংখ্যান নেই কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি – ফকিন্নির বাচ্চা হঠাৎ বড়লোক হলে সে দূর্নীতি, নোংরামি, অহংকার করবেই। পৃথিবীর কোন শক্তি তাকে এই নিচু কাজ থেকে বাধা দিতে পারবে না।
১৯৭১ সালের পর ফকিন্নিদের শাসন ছিল নয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি। আমি পেয়েছি চোরের খনি।
১৯৪৯ সালের আগে চীনের চিত্রটা কিন্তু সম্পূর্ণ উলটো। জাতীয়তাবাদী চীনে রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে পেয়াদা পর্যন্ত সবাই ঘুষ, দূর্নীতি করতো। কিন্তু ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আসলো যে কেউ আর দূর্নীতি করে না।
নয়া চীনের এই নয়া বাস্তবতায় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতের জাতীয়করণ রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ নিয়ে এসেছিল। শিল্প কারখানার জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে চীন দ্রুত উন্নতি করেছে। আর সেই উন্নতি গুটিকয়েক মানুষের জন্য আসেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনের সকল মানুষ উন্নয়নের স্বাদ পেয়েছে।
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটা ঠিক উলটো দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ যখন শিল্পের জাতীয়করণের দিকে গেলো, সেটা উলটো ফলাফলই বয়ে আনে। ১৯৭২-৭৫ এর মধ্যে বাংলাদেশের বড় শিল্পগুলো জাতীয়করণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার দূর্নীতিতে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত সকল প্রতিষ্ঠান লোকসান করতে থাকে।
জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া যে খুব আইনসম্মত বা নৈতিকভাবে হয়েছে সেটা বলার সুযোগ নেই। জিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই শিল্পপতি হবার সু্যোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ফলাফলটা সার্বিকভাবে ইতিবাচক ছিল। অর্থনীতি ভালো হতে শুরু করলো, বাইরে থেকে বিনিয়োগ আসা শুরু হলো, জিডিপি বাড়লো। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়লো জিয়ার জনপ্রিয়তা।
দূর্নীতিতে জর্জরিত একটা দেশের জন্য, বিশেষ করে দূর্নীতি যেখানে জাতীয় সংস্কৃতি, সেখানে জাতীয়করণ ভালো কিছু বয়ে আনে না। আপনার নিশ্চয়ই বিদ্যুৎ অফিসে ঘুষ দেবার অভিজ্ঞতা আছে? ট্রেনে উঠে টিকেট কেটেও বসতে না পারার অভিজ্ঞতা আছে? গ্যাস অফিস, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে হয়রান হবার, অসহায় ফিল করার অভিজ্ঞতা আছে? আমারও আছে।
আমার বাবা-মা উনাদের বাসায় তিতাস গ্যাসের কর্মীদের নানা ছোট খাটো কাজে ঘুষ দেন। তিতাসের সেবার মান আমার সিজিপিএর চেয়ে খারাপ। কিন্তু এদিকে আমার বাসায় গ্যাসের লাইন আসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। আমি কখনোই তাদের ঘুষ দেই না। যে কোন অভিযোগে তাদের কাস্টমার কেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করে। আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও আপনি বিমান পছন্দ করেন না, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সে ওঠেন। আপনি বিটিসিএল এর সংযোগ নেন না, বাংলালিংক বা গ্রামীণ এর সেবা নেন। আপনি সরাসরি ট্রেড লাইসেন্স আবেদন/নবায়ন করার ঝামেলা পোহান না, এই রাষ্ট্রীয় সেবার কাজটাও বেসরকারি এজেন্সি দিয়ে করান। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে আপনি ঠিকই নিজের ভালোটা বুঝেন। কিন্তু রাষ্ট্রের বেলায় ভালোটা বুঝতে সমস্যা কোন জায়গায়?
রেল, বিমান, কেরু এন্ড কোং, বিআরটিসি, আদমজী বছর বছর হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েও সেবার মান ভালো করতে পারে না। কিন্তু তবু শুধু জনগণের সেন্টিমেন্টের দিকে তাকিয়ে সরকার এগুলোকে বেসরকারি খাতে দেয় না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেছিলেন, “এটা ভোটে নির্বাচিত সরকার না। কোন অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিলে এই ভয় নেই যে সামনের বার ইলেকশনে হেরে যাবো। এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শক্তি। তাই সময় থাকতেই রাষ্ট্রের জন্য জরুরি অজনপ্রিয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করে ফেলতে হবে। যেটা রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে সম্ভব না।”
এমন একটা অজনপ্রিয় পদক্ষেপ হলো বাসা বাড়িতে গ্যাসের লাইন বন্ধ করে দেওয়া। রাজনৈতিক সরকার এটা পারবে না। কিন্তু অন্তবর্তী সরকার এটা নিয়ে কাজ করছে। এমন আরেকটা অজনপ্রিয় পদক্ষেপ হলো – রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে দুই টুকরো করে দেওয়া। এই সরকার এটা করেছে। আইন বিভাগ আর শাসন বিভাগ যেভাবে এক থাকা উচিৎ না। তেমনি রাজস্ব বোর্ডের নীতি নির্ধারণী বিভাগ আর বাস্তবায়ন বিভাগ এক থাকা উচিৎ না।
বাংলাদেশের দূর্নীতি জগতের সবচেয়ে হাবিয়া দোযখ তিতাস বা ভূমি অফিস বা আদালত নয়। এটার নাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। প্রশাসনের সবচেয়ে বড় রাঘব বোয়ালেরা এখানে নিয়োগ পায়। রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে রাজস্ব বোর্ডের এস্টাব্লিশমেন্ট ভাঙা সম্ভব না। ভাঙলে নিজেদের পায়ের তলার মাটি সরে যাবে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সম্ভব। আর তারা সেটা করেছে। বাংলাদেশের মানুষের ফাইন্যান্স আর রাজস্ব নিয়ে আগ্রহ না থাকায়, মিডিয়া কভারেজ থাকা সত্ত্বেও এটা নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি।
বাংলাদেশের দূর্নীতি জগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দোযখের নাম চট্টগ্রাম বন্দর। আমদানি, রপ্তানি আর মাল ছাড়ানোতে দূর্নীতি, ঘুষ এখানে এতোটাই নরমালাইজ যে স্বয়ং শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠানও যদি কিছু আমদানি করতো তাকে অল্প হলেও ঘুষ দিয়ে মাল ছাড়াতে হতো। এর কোন ব্যত্যয় নেই। আমি নিশ্চিত যে গ্রামীণের প্রতিষ্ঠানগুলোও চট্টগ্রাম বন্দরে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। আমদানি ও রপ্তানী খাতে দূর্নীতি পবিত্র বাইবেলের চেয়েও সত্য, গীতার চাইতেও বাস্তব। বাংলাদেশে এমন একজন সিঙ্গেল কর কমিশনার খুঁজে পাওয়া যাবে না যার উপার্জনটা শতভাগ হালাল।
চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার অপারেশন শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর। কিন্তু কন্টেইনার হ্যান্ডেলের রেকর্ড সৃষ্টি হয় এই বছর জুলাই মাসে। চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেডকে দায়িত্ব দেবার পর কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং বেড়েছে ৩০%। জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় কমেছে গড়ে ১৩%। এই অগ্রগতির জন্য বেসরকারিকরণ আর দায়িত্বে নয়া এই পরিবর্তন দায়ী।
আমার যেসব সহপাঠীরা বিসিএস দিয়ে শুল্ক ও আবগারি ক্যাডার হবার জন্য দিনরাত এক করে পড়াশুনা করছেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ হলো – সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের ম্যানেজমেন্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে যাচ্ছে।
তবে মিডিয়া এমন ভাষায় এর নিউজ করছে যেন সরকার মার্কিন কোন সংস্থাকে চট্টগ্রাম বন্দর লিখে দিয়ে দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মূলধারার আওয়ামী মালিকানাধীন মিডিয়া এবং ঢালাওভাবে পশ্চিম-ফোবিক ডান ও বাম বুদ্ধিজীবীগণ।
দুবাই ভিত্তিক বন্দর পরিচালনা সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৮৩টি দেশে বন্দর সামলায়। ভারতপন্থীদের জিজ্ঞেস করুন ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন ভারতের ৫টি বন্দর পরিচালনা করে। পাকিস্তানপন্থীদের জিজ্ঞেস করুন ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন করাচি বন্দরের ফ্রাইট করিডোর সামলায়, চীনপন্থীদের জিজ্ঞেস করুন ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন চীনের ৪টি বন্দর পরিচালনা করে।
বাম বন্ধুদের জন্য সুখবর যে ডিপি ওয়ার্ল্ডে আমেরিকান কোন শেয়ার নেই। এর সম্পূর্ণ মালিকানায় আছে আমিরাত সরকার। এটাও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। তবে এমন এক রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্রের জনগণ জাতিগতভাবে দূর্নীতিবাজ না।
