প্রথম পাতা » গল্প » অন্তর্গত বেদনার গল্প

অন্তর্গত বেদনার গল্প

Lover boy

প্রায় প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আছে কিছু অ-উন্মোচিত কষ্ট। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষাদের রঙ; ব্যস্ততার পোশাকে আবৃত হয়ে থাকে একাকিত্ব। পোশাক-আভরণে চাপা পড়ে থাকে নীল বেদনা। কিছু কথা মনের গভীরে আজন্মকাল দাফন হয়ে থাকে। অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে করুণ বাস্তবতা— যা মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করে, বেদনায় ভাসায়-ডুবায়। ঘুম কেড়ে নেয় চোখের, আর দুশ্চিন্তা জাগিয়ে রাখে হৃদয়ের ক্ষত। কত চোখের পানি ঝরে নিভৃতে, তা কেউ দেখে না; কিন্তু বেদনার বালুচরে সাদা-কালো দাগ লেগেই যায়।

একেক মানুষের একেক রকম দুঃখ। একসাথে হাঁটে, কথা বলে, হাসে— অথচ মনের ভেতর বয়ে চলা নদীর ঢেউ কেউ টের পায় না। যে নিজেকে প্রকাশ করে না, তার অন্তরালের ঘটনার খোঁজ মেলা কঠিন। দুঃখ আসলে বলে বেড়ানোও ঠিক না; কারণ দুঃখ ভাগ করলে তা কমে না, বরং বাড়ে। অনেক সময় নিজের কথা বলা মানেই দুঃখের নতুন বৃষ্টি ডেকে আনা। দুর্বলতায় আঘাত করতে যারা আনন্দ পায়, একাকিত্বে সুযোগ খোঁজে কিংবা খোঁচানোই যাদের স্বভাব— তারা আসলে মানুষ ভালো নয়। এদের কাছ থেকে প্রাপ্ত দুঃখ এড়িয়ে চলাই শ্রেয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা বিপুল।

নিজের গোপনীয়তা যারা অন্যের হাতে তুলে দেয়, তারা শেষমেশ বেদনার মিছিলে আটকে যায়। তাই হতাশায় ধৈর্য ধরতে হয়, দুর্যোগে নিজেকেই নিজের সামলাতে হয়। নিজের নামে যত অনুযোগ জমে, দুঃখের পরিধিও তত বাড়ে। সামনের দিনকে সুন্দর করতে চাইলে লড়াইটা একাই লড়তে হয়। সুখ প্রচার করলে বদনজর লাগে, দুঃখ দেখালে তা আরও ঘনীভূত হয়। জীবনের গল্প সহজ রাখতে নিজের দুঃখের দাফন-কাফন নিজেকেই করতে হয়। উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষ কিংবা মিষ্টি কথার আশায় বসে থাকা কাউকে বিশ্বাস করলে, একদিন সবকিছু হারানোর ভয় থেকেই যায়— আমও যায়, ছালাও যায়।

অভাব যাবে, দুর্দিনে কাটবে— তাতে লজ্জা নেই; কিন্তু এসব নিয়ে ব্যবসা করা যাবে না। কারও সহানুভূতি চাওয়ার অর্থ সারাজীবন তার সামনে পণ্য হয়ে জিম্মি থাকা। বিশ্বাসযোগ্য মানুষ এই অবিশ্বাসের দুনিয়ায় হাতে গোনা। ভরসা করেও দেখা যায়, প্রয়োজনের সময় সেই ছায়া মিলিয়ে যায়। স্বার্থ পূরণে সক্ষম হলে আত্মীয়তা থাকে, একবার ‘না’ বললেই সম্পর্কের মুখোশ খুলে যায়। তাই সামনের সুদিনের আশায় আজকের দুর্দিন একাই মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কাউকে ভাগ দিতে যেও না; ভাগ দিলে দিক হারাবে।

হতাশা, বিষণ্নতা, মন খারাপ কিংবা সময় খারাপ— সবই জীবনের অংশ। শক্ত হয়ে দাঁড়াও; সময় একদিন সুদিন নিয়েই ফিরবে। অশুভ চিন্তা বা মানুষ একবার আঁকড়ে ধরলে পুরো সপ্তাহের আলো ম্লান হয়ে যায়। আয়নায় তাকালে মুখোশের আড়ালের মুখটি স্পষ্ট দেখা দেয়। দুঃখ নিয়ে বিলাস করো, তবে একলা। নোংরামির ঠাঁই যেন ইট-পাথরের চার দেয়ালে না হয়। সংগ্রামী জীবনের জোয়াল একা একাই বইতে হয়; শান্ত হয়ে অহংকারকে মিশিয়ে দিতে হয় মাটির সঙ্গে। আর খাঁটি মানুষের পাঁচ মিনিটের সাহচর্যেই নিজের ও পৃথিবীর মধ্যে এক অনন্য যোগসূত্র তৈরি হয়— যা নতুন স্বপ্ন দেখায়, বাঁচার অনুপ্রেরণা জাগায়।

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

রাজু আহমেদ
প্রাবন্ধিক।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *