প্রথম পাতা > গল্প > অপেক্ষা

অপেক্ষা

waiting

– সাপমরার গন্ধ আহে কোনহান থে?

পুবের বন্দে ট্রাক্টরের শব্দে মাথা ঝিম ধরে যায়। পোড়া মবিলের গন্ধে নেশার মতো লাগে। মাথার ওপরে আমগাছের ছায়া। পেয়ারা গাছের একটা ডাল মিশে গেছে আমের ডালের সাথে। আষাঢ়ের ঝকঝকে রোদের দিকে তাকালে চোখে ধাঁধা লাগে। তবু চোখ তুলে পিটপিট করে একবার দেখে নিতে বেশ লাগে। কাউকে দেখা যায় না। কলপাড়ে একটা শব্দ হয়। কে ওখানে? দেখতে চাইলে মাথা তুলতে হবে। রোদের একটা হল্কা নাক বরাবর। মাথা তুলতে ইচ্ছে করে না। ক্ষেতগুলোয় জাবর দেওয়া হয়েছে। প্যাঁকের একটা গন্ধ আসছে। ক্ষেতে যারা কাজ করে তারা এই গন্ধের স্বাদ বুঝে। কেমন একটা মাদকতায় আচ্ছন্ন হয় মন। তবে বুড়ো হাসমতের কাছে পোড়া মবিল কিংবা প্যাঁকের মাদকতার চেয়ে তীব্র মনে হয় ‘সাপমরার’ গন্ধটা। সাপ মারলো কে? আবার সে চেঁচিয়ে ওঠে-

– সাপমরার গন্ধ আহে কোনহান থে?

এইবার নিয়ে পাঁচবার এই প্রশ্ন করলো বুড়ো হাসমত। কেউ উত্তর দেয়নি। হয়তো কেউ শোনেও নি। জোয়ানরা জানে বুড়ো মানুষের সব কথার উত্তর দেওয়া লাগে না। এরা সব কথার উত্তর আশাও করে না। সংসারের ভাঙা কুলা হলো বুড়োরা। এদের খুব একটা প্রয়োজনীয়তা নেই। চুলার পাড়ে পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে ছাই ফেলতে দরকার পড়ে। জোয়ানরা বিশ্বাস করে – সংসারে বুড়া মানুষ থাকার চেয়ে লাখ টাকা ঋণ থাকাও ভালো। বাড়িতে আত্মীয় – স্বজন এলে মুরুব্বিদের কথা জিজ্ঞেস করে। বুড়োরা হয় তখন বাড়ির শোভা। কেউ কেউ আবার বুড়োদের আয়োজন করে দেখতে আসে। সারাদিন এদিক – সেদিক ঘোরে। বুড়ো ছাড়া সকলের সাথে গল্পসল্প করে, খাওয়া – দাওয়া করে। এসেই একবার আর যাওয়ার সময় আরেকবার মাত্র দেখে দোয়া নিয়ে ‘বুড়োদেখন’ সমাপ্ত করে চলে যায় অতিথিরা। বুড়ো শুয়েই থাকে মাচাঙের ওপর। পোড়া মবিল আর প্যাঁকের মাদকতায় নেশা ধরাতে চায়। কিন্তু বিভ্রাট করে সাপমরার গন্ধ। বুড়ো হাসমত এবার জোরে হাঁক দেয়-

– ফকিরের মা, সাপ মরছে কই?

বুড়ো হাসমতের ছেলের বৌ ফকিরের মা। ফকির হলো হাসমতের নাতি। বয়স হবে নয় কি দশ। সে কলপাড়ে খেলছে একা একা। এই ছেলেটির জন্মের আগে আরো দুটি ছেলেসন্তান হয়ে মারা যায় ফকিরের মায়ের। দুটি মৃত সন্তানের পর এই ছেলে বেঁচে আছে ‘ফকির’ নাম নিয়ে। একটি পান ছেঁচে নিয়ে আসে ফকিরের মা। ট্রাক্টরের শব্দে কথা হারিয়ে যায়। তাই সে জোরেই বলে-

– পান নেন। ভাত খাবেন না?

– সাপমরার গন্ধ আহে কোনহান থে?

– কী কন? সাপ? কেডায় মারছে?

দুজনেরই ঠোঁট নড়ে শুধু। কয়েকটা ট্রাক্টর যেন যুদ্ধে নেমেছে। শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। ট্রাক্টর দুটি একসাথেই এবার বন্ধ হয়। হয়তো তেল শেষ কিংবা ড্রাইভারদের সকালের খাওয়ার বিরতি। কয়টা বাজে এখন? চারদিক কেমন নীরব হয়ে গেলো। এবার কথাটা বলা যায়। কিন্তু হাসমত আর বলতে চাইলো না। তবে গন্ধটা কেমন বোঁটকামার্কা। নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসে। হাসমত মাথাটা তুলে পানগুঁড়া হাতে নিয়ে মুখে দেয়। এবার সে মাথাটা আলগোছে বালিশে ছেড়ে দেয়। জর্দার গন্ধে সাপমরা গন্ধটা আপাতত তলে পড়ে গেছে। যাক বাঁচা গেলো।

– তালই, আছেন ভালোই?

– কেডা? রোইদের ঝিলা লাগে। চোহে বেশি দেহি না বাপু?

– আমি হারু। ভালো আছেন?

– হ আছি ভালা আছি।

এই বলে হাসমত হারুর একটি হাত ধরে চোখের জল ছেড়ে দেয়। লোকটার কী হয় কে জানে? কথা বলতে গিয়েই কেঁদে ফেলে সে। ঠোঁটদুটি কেঁপে কেঁপে ওঠে। কাঁদে কেন? তার ছেলে কি যত্ন কম করে? ছেলের বৌ? সে কি নিজের বাপের মতো দেখে না তাকে? তবু কান্নাকাটি কেন? এতো সোহাগের বায়না লোকটার! আবার কি নিকা করবে? শরীর চলে না। তবু মস্করা সম্পর্কের লোকেরা নিকার কথা বললে মাথা দুলিয়ে না করে। মৃত বিবির কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলে। কতো গুণ ছিল গুনাইয়ের! এমন মেয়ে কি এখন আছে? না থাক। তবু তার খেদমতটুকু করলেই চলে। জমিজমা এখনো তো তারই। সে কি লিখে দিয়েছে ফকিরের বাপকে? বজ্জাত পোলা! বাপের সুখ – অসুখ বুঝে না! বিলপাড়ের পাঁচকাঠা জমি দিলে কি কইন্যা রাজি হবে? কইন্যার মা সহ রাজি! বলে কী ! মস্করার লোকেরা মস্করা করে চলে যায়। হাসমত গালাগাল দেয় ছেলেকে। হারামির পোলার জন্যই নিকাটা হয় না তার। এক ছটাক জমিও সে হারামির পোলাকে দিবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে।

– তালই, শরীর এহন কেমুন?

– ভালা না। সময় শেষ। মাফ কইরা দিও। কোন ডনডে চইলা যাই!

আবার কান্না শুরু করে হাসমত। ফরিজল এসে ধমক দেয় বাবাকে। এতো কীসের কান্নাকাটি তার? খানাখাদ্যের অভাব নাই, যত্নআত্তির অভাব নাই। তবু বুড়া নাটক করে কেন? আজাইরা প্যাঁচাল! নিকা করবো?

– মান্জায় নাই জোর নিকা করার তোড়! চুপ মাইরা শুইয়া থাহো।

ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে হাসমত মনে মনে হাসে। “এক ছটাক জমিও তুই পাবি না ফরিজল হারামি। বাপ মরলে বুঝবি কার জমি কেডা খায়।” মরার পর জমির বন্দোবস্ত দেখে ফরিজলের মাথাখারাপ দৃশ্যটা চোখের সামনে যেন দেখতে পায় হাসমত। সে ফিক করে হেসে ওঠে।

– দাদা, হাসো কেন? তোমার কী হইছে?

ফকির এবার আস্তে আস্তে মাচাঙে চড়ে। দাদার সাথে সে খেলবে কিছুক্ষণ। মাচাঙের খুব কাছেই পুকুর। হাসমতের মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে নাতিকে পুকুরে ফেলে দেয়। ফরিজল হারামি থাকুক নিঃসন্তান। একটা চরম শিক্ষা ওর প্রাপ্য। বাপের লগে জেঠামি! হাসমতের কাছে এই কাজটা ওয়ান টু ব্যাপার। বড়বিলের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সে কি খুন করে নাই একটা? আইন তারে ছুঁইতেও পারে নাই। অবশ্য বিশকাঠা জমির পুরাটাই গেছে মামলাখেলায়। তাতে কী? হাসমত তো জেদ করেছিল পরাণকে শেষ করার। পরাণের রক্তে ভেজা জমির পুরোটাই গেছে শেয়াল – কুকুরের পেটে। তা যাক। সে শকুন বিনাশ করেছে, শেয়াল কুকুর চিনেছে কতোগুলা! গ্রামের সালিশ মামলায় পড়লে বুঝা যায় কার জামাত কোনটা? একদিন সুযোগ বুঝে কাজটা করে ফেলবে। ফকিরকে পুকুরে ফেলতে হবে। বৌ শোয়ামিরে উচিত শিক্ষা দিবে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে হাসমত। শুভদিনে কাজটা সেরে ফেলতে হবে। আজও হতে পারে শুভদিন।

– ফকির, ভাত খাইছস?

– না, ভাত হয় নাই।

– দাদা, একটা আম পাইড়া দেও।

– বলদা ছেমড়া কয় কী! আমি কি গাছে উঠতে পারি?

– তুমি কোটা দিয়ে পাইড়া দেও

– কোমড়ে বেদনা, আমি কি উঠতে পারি? তুই পাইড়া খা।

ফকির মাচাঙে ওঠে প্রথমে আম ছেঁড়ার চেষ্টা করে। পারেনা। দূরে দুই তিনটা আম দেখা যায়।সে নাগাল পায় না। এরপর ছোট ছোট পেয়ারা ছিঁড়ে পুকুরে ঢিল দেয় সে। পানিতে ঝুপ করে শব্দ হয়। খুব মজা লাগে তার।

– পেয়ারা ছিঁড়স কেন ছেমড়া? কাঁচা পেয়ারা। বড় হইলে খাবি। আহারে! খড়ি চোখে পড়ে! এই তুই নাম তো, নাইমা যা। বান্দর।

– তুমি বুইড়া বান্দর। আব্বায় কয়।

– তোর বাপে আর কী কী কয়?

– জানি না

কিন্তু হাসমত সব জানে। ফরিজল তাকে দেখতে পারে না। আড়ালে গালাগাল দেয়। বাপের জমিতে বাস করে বাপেরেই গালি? টের পাবে হাসমত মরলে। চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না ফরিজলের। কথাটা মনে মনে আওড়ায় সে। আর হাসে। তিন চারটা দাঁত ছাড়া সব গেছে হাসমতের। কতো দিন হলো? হবেইতো দশ বারো বছর প্রায়। তখন বুড়ি বেঁচে ছিল। ধান ভাঙানোর মেশিন ছিল তাদের। এক সকালে মেশিন স্টার্ট দিতে গিয়ে হেন্ডেলটা ছুটে এসে মুখে লাগে। সাথে সাথে আটটা দাঁত পড়ে গেলো। রক্তের ফোয়ারা দেখে বুড়ি হলো অজ্ঞান। এরপর থেকে বাকিগুলোও পড়ে গেলো। বয়স আর কতোই হাসমতের? পয়ষট্টি? এমনই তো হবে। তবু সবাই তাকে বুড়া ডাকে। দাঁতপড়ার কারণে বুড়া। শরীরে তাকত আছে। কিন্তু কোমড়টাই সমস্যা করছে। কোমড় নিয়ে দাঁড়াতেই পারে না। একজন লাগে ধরে তুলতে। তারপর লাঠি দিয়ে চলতে পারে। সদরে একবার যেতে পারলে ভালো হতো। হারামিপোলাতো নিবে না। কোমড়ের ফাঁড়াটা কাটলেই নিকাটা সহজ হয়। তার বৌ দরকার। খেদমত দরকার। তোলা দুধে পোলা বাঁচে না। ফরিজল গেলো কই? দরকার পড়লে বাড়ির সামনের তিনকাঠা জমি বিক্রি করে তার চিকিৎসা করাক।

– ফরিজল – এই তোর বাপেরে ডাক দে

– আব্বা দোকানে গেছে

– ডাক দে। কথা আছে

– পারমু না

বাপের মতো বদমাশ। কোনো কথা শুনে না। শুভদিন আসুক। তারপর গোয়া থাপড়াইবা সবাই।

– উঠেন, কাঁঠাল আর মুড়ি খান

ফকিরের মা ধরে তুলে দেয় তাকে। হাত ধুয়ে কাঁঠাল মুখে দেয় হাসমত। বিচিগুলো আলগোছে পাশে রাখে। মুড়ির বাটিতে কাঁঠালের কোষগুলো বিচি থেকে মুক্ত করে রাখতে রাখতে বলে –

– ফরিজলরে কও কাস্টোমার দেখতে। জমি বেচমু

– কোন জমি বেচবেন? আপনের কয়শ বিঘা জমি?

– তিন কাঠা বেচমু। বাড়ির সামনেরটা

– বেচেন। তিনকাঠা বেইচা নিকাহ করেন। বিলপাড়ের পাঁচকাঠা বৌরে দেন। তারপর খাবেন কী? গাছের পাতা? বাড়ি ভিটাসহ জমি মোটে দশ কাঠা। দিনের মইধ্যে ছত্রিশ বার বেচে!

– বাপের বাড়িত থেইকা নিয়া আইছো দুই চার কাঠা?

– না, আনি নাই। জমি নিয়া আপনেগো মতো ফেদাচাটাগো বাড়িত আসব কেডা? নুন আনতে পানতা ফুরায়! খাইয়া চুপ কইরা শুইয়া থাকেন। গাছের পাতা গুইনা বাকি দিন কয়টা পার করেন। এই ফকির আয়। ভাত খাবি।

ছেলেকে নিয়ে ফকিরের মা চলে যায়। অর্ধেক খাওয়া কাঁঠাল মুড়ির বাটিতেই হাত ধোয় হাসমত। পোলা যেমন তেমন বৌটা আরো বজ্জাত। আগে ভালোই মনে করেছিল হাসমত। কে জানে এমন শয়তানি মহিলা এটা!

– হাত ধুইলা ক্যা?

– মজা লাগে না। টেস পাই না

– সত্তর বছরের জিব্বা আর কতো টেস দিবো? ফকিরের মায়েরে কী কইলা?

– কিছু না। কী কমু?

– কিছু না- ই যেন থাহে। দুনিয়ার মানুষ আছে মহা ক্যাঁচালে। মাইনষের মনে নাই ফুর্তি। কাজকাম নাই। সংসার কেমনে চলে সেই খিয়াল আছে? তোমার উঠছে নিহার বিগার? খাইবা আর আল্লাবিল্লা করবা। ফাউলটক বন্দ। টুপি আর তসবি আইনা দিছি। জিকির ফিকির করো। মুইতা নেওনা পানি। মুখে আল্লানবির নাম নাই। চারাল কোনহানকার!

ফরিজল বকতে বকতে চলে যায়। হাসমত একবার ভাবে মুখের ওপর বলে দিক কড়াকথা গুলা। আবার একাই হাসে মনে মনে। বৌ শোয়ামির মাতমের কথা মনে করে সে আফসোস করে। মানুষ চিনলি না তোরা!

পানগুড়া মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ে আবার। দখিনা বাতাস আসছে। শরীরটা হিম হয়ে যায়। ট্রাক্টরগুলো আবার চলছে। ঢড় ঢড় ঢড়ঢড়…। বাতাসে ভেসে আসে পোড়ামবিলের গন্ধ। মাদকতা মেশানো প্যাঁকের গন্ধ। আর আসে সাপমরার গন্ধ। চোখ বন্ধ করে হাসমত ভাবতে থাকে। একটু চোখ তুলে দেখে। ধান বের করা হচ্ছে। মেশিনে নিবে নাকি? নিক। ফকিরকে রেখে যাবে বাড়িতে একা। মনটা তার মোচড় দিয়ে ওঠে। আজই কি কাম সারবে সে? নিঃশ্বাস দ্রত হয় তার। উত্তেজনায় আধাশোয়া হয় একবার। ফরিজল চেয়ে আছে কেন এদিকে? সে কি আঁচ করতে পারছে কিছু?

– ফকির বাড়িত থাকবো। খিয়াল রাইখেন। পানগুড়া দিয়া গেলাম। পানি দিলাম। দরকার হইলে খাবেন। ফকির কিন্তুক পুকুরে ঢিল্লাঢিল্লি করে। পইড়া যাইবো আবার। দেইখেন। মেশিনপাড়ে নিমু না ওরে। অত্যাচার করে। শুনছেন?

ট্রাক্টরের শব্দে কথাগুলো কেটে কেটে যায়। তবু হাসমত বুঝতে পারে। উত্তেজনায় সে শুধু ঠোঁট নাড়ে। হ হ। দেখবে ফকিরকে। ওরা যাক। কোনো অসুবিধা নাই।

মাচাঙে উঠে ফকির খেলতে থাকে। গাড়ি গাড়ি খেলা। পাতা ছিঁড়ে গাড়ি বানায় সে। হাসমত আধাশোয়া হয়। চেষ্টা করে উঠবার। পেরেছে কিছুটা। বাকিটা ফকিরকে ধরে উঠবে। তারপর পেয়ারা বা আম পাড়ার কথা বলে দাঁড়াতে বলবে ফকিরকে। পেছন থেকে ধাক্কা দিলেই কামসারা। বৌ শোয়ামির মাতমে ভারী হবে বাউলা বাতাস। সাপমরার গন্ধটা তীব্র হয়ে আসছে। পঁচে গেছে মনে হয়। আবার শুয়ে পড়ে হাসমত। এভাবেই কাজ হবে। এতো তাড়াহুড়া নাই। ওরা ফিরবে দুপুরে। কাজটা সারতে সময় লাগবে এক মিনিট। তারপর সারাজীবনের কান্না। মজা বুঝো! বাপেরে বিগার দেহাও। হারামির পোলা!

প্রচণ্ড বাতাস দিচ্ছে। পোড়া মবিলের গন্ধটায় আচ্ছন্ন হয়ে চোখ বুজে আসে। কিন্তু এখন কি ঘুমানোর সময়? ঘুমালে সব ভেস্তে যাবে। এমন সুযোগ প্রতিদিন আসবে না। সাধু সাবধান। ফকিরের জন্ম হলো কোন মাসে? হাসমত মনে করার চেষ্টা করে। সেদিন বৃষ্টি ছিল। বুড়ি তখন জীবিত। ফকির হওয়ার মাসখানেক পরে চলে গেলো বুড়ি। শ্রাবণের বৃষ্টি ছিল। মনে পড়েছে তার। রক্তমাখা ফকিরকে কুলায় নিয়ে বাড়িটা চক্কর দিয়েছিল বুড়ি। কী তার আনন্দ! বুড়ি একমাস আঁতুরঘরেই ছিল। হঠাৎ জ্বরে এমন কাবু হলো! আর সেরে উঠেনি। বুড়ি মরার সাথে সাথে এ বাড়ির সুখ চলে গেছে। হাসমতের জীবন হয়েছে অতিষ্ঠ। তার একজন খেদমতের মানুষ দরকার। এটা ওরা বুঝে না। কেন বুঝেনা সে জানে না। পোলার বৌ কে দিয়ে সব ফরমায়েশ করানো যায় না। এটা হারামিপোলা ফরিজল বুঝে না।

লাল হাফপ্যান্ট পড়া, খালিগায়ে বসে ফকির নৌকা বানাচ্ছে কাগজ দিয়ে। বানাক। আরো খেলুক কিছুক্ষণ। অনেক সময় আছে। ট্রাক্টরের শব্দ আরো প্রকট হলো। একটা দুইটা তিনটা। সবগুলো যেন যুদ্ধে নেমেছে। সবাই ব্যস্ত। ক্ষেতে ক্ষেতে পানি জমে গেছে। এখনই সময় চাষ করার। রোদটা বাড়ছে। পেয়ারা গাছে একটা কাক বিকট শব্দে ডেকে গেলো। কাক ডাকলে নাকি অমঙ্গল হয়! হবেইতো আজ অমঙ্গল। কিন্তু কাক কাকে জানান দেয়? ওরাতো নাই। আর নাই বলেইতো সুযোগ। হঠাৎ আকাশটা একখণ্ড সাদা মেঘে ঢেকে গেলো। বাতাসের তীব্রতা বাড়ছে। পোড়া মবিলের গন্ধটাও তীব্র হলো। ট্রাক্টরগুলো আরো কাছে চলে এসেছে। চোখে ঘুমের মাদকতা। বুড়ো হাসমতের মনে পড়ে সেসব সময়ের কথা। যখন সে-ও চাষ করতো জমি। কতোদিন হলো ক্ষেতে নামে না? পনের বছরতো হবেই। জমিগুলো ধীরে ধীরে শেষ হয়েছে তার। আজ দুই কাঠা, কাল তিন কাঠা। ফরিজল হলো অলস ধরনের। জুয়াও খেলে নিয়মিত। বদের আঠারো কিস্তি! কোনো উন্নতি নাই। জুয়াখেলা রক্তে মিশে গেছে ফরিজলের। বাপের কিসমত কপালে। বুড়া হাসমত তো তবু খেয়েপড়ে বেঁচে গেলো। ফরিজলের কপালে আছে লাথ্থি উষ্ঠা! আর কয়দিন! শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উঠতে হবে। নতুন বুড়ি কি ছাড় দিবে? একরত্তিও না। একজন মানুষ লাগে। পুরুষের একজন মানুষ লাগে। খেদমত লাগে। কে আসবে ঘরে? ফরিজলের মা ছিল অমায়িক এক মহিলা। তার মতো কে আছে ভুবনে? যেদিন বৌ হয়ে এলো…! বাতাস বাড়ছে। শীতলতায় শরীর এলিয়ে পড়ে। চোখে তন্দ্রা লাগে। ট্রাক্টরের শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। নাকে লাগে পোড়ামবিলের গন্ধ…!

প্রচণ্ড মাতমের শব্দে ঘুম ভাঙে হাসমতের। বাড়িভর্তি এতো মানুষ কেন? বৌ টা আঙিনায় বুক চাপড়াচ্ছে কেন? ফরিজল পড়ে আছে নাকি? পুকুরের চারপাশে লোকজন জড়ো হয়েছে। সে কতোক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল? পুকুরের দিকে তাকিয়ে হাসমতের বুকটা ধ্বক করে উঠে! লাল প্যান্টটা দেখা যায়। পাশেই নৌকাটা ভাসছে। ফকির মাচাঙে বসে বানিয়েছিল যেটা!

সাপমরার গন্ধটা আর নাকে লাগছে না তার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সুজন হামিদ
সুজন হামিদ
আমার কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না। কবিতা না লিখলেও আমার দুটি মহাকাব্য আছে।আরিয়ান হামিদ বর্ণ আর আদনান হামিদ বর্ষ - আমার দুই পুত্রের মাঝে জীবনের সকল প্রশান্তি খুঁজে পাই।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?    আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *