প্রথম পাতা » গল্প » বাবা

বাবা

Father

দিনগুলো কেমন খটখটে যাচ্ছে শফিকের। সময় মানুষকে কেমন বদলে দেয়। চিরপরিচিত মানুষগুলোও সময়ে সময়ে এমন অচেনা হয়ে যায় যে ভাবলে বিষম লাগে। অসুস্থ সময় মানুষকে করে তোলে বিকারগ্রস্ত। চারদিকে কেবলই নাই নাই ধ্বনি। তবু মানুষ আঁকড়ে থাকে জীবনকেই। এতো অতৃপ্তির মধ্যেও বেঁচে থাকতে কেউই মৃত্যুর আয়োজন করতে চায় না। না, বাবাকে আর গ্রামে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। যত কষ্টই হোক শহরেই রাখতে হবে তাঁকে। হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসাও হয়তো পাবে না।

শানুকে আজই কথাটা বলতে হবে। সে কি অমত করবে? করতেও পারে। এখানে ছোট্ট দুটি রুম। আট হাজার টাকায় এরচেয়ে ভালো বাসা আর কোথায় পাওয়া যাবে? এখন সময় খারাপ। কোম্পানি কখন বন্ধ হয় তার নাই ঠিক। বড় বাসা নেওয়াও ঠিক হবে না। বাবাকে আর কতো ভাইজানদের কাছে রাখবো। ওরইতো প্রায় নুন আনতে পান্তা ফুরায়। না,বাবাকে একা আর রাখবোই না। আগামি সপ্তাহেই তাঁকে ঢাকা আনবো। ছুটি কি দিবে? রিক্সাওয়ালা ভাই রাখো এখানেই। এই নাও ভাড়া। মিয়াবাই,এহন ইনকাম তেমন নাই,কয়টা টেকা বাড়ায়া দেন। শোন,এখন সবারই একই অবস্থা। আচ্ছা এই নাও পাঁচটাকা। থাইক,লাগবো না। আপনের বাজারের বেগটা নেন। শফিক পাঁচটাকার নোটটা পকেটে রেখে সিঁড়ি ধরলো।

হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নাও। হ্যান্ডওয়াশ নিয়া আসছো? হুম। নিয়া আসছি। কাপড়গুলো ছেড়ে বাথরুমে রেখে দাও। না,না,আমি ধুয়ে দিই। রাখোতো এতো কাজ দেখানো লাগবে না। খেয়ে নাও। আমি সকালে ধুয়ে দিব। তুমি খাবা না? আমি খেয়ে নিছি। ক্ষুধা লাগছিল খুব। তুমিতো সর্বনাশ করছো শানু! কী সর্বনাশ? স্বামীর আগে খাইলে আয়ু কমে। কার আয়ু কমে? স্বামীর না স্ত্রীর? তাতো ভুলে গেছি। শোন,যদি আমার কমে তবে তোমার পৌষমাস। আবার বিয়া করবা। নয়া জিনিস,নয়া ফিলিংস! ধুর,তুমি না!! বাবু কি খাইছে? হুম। যাও তাড়াতাড়ি আসো তো! ঘুম পাচ্ছে খুব। ঘুমতো বিছানায় যাওয়া পর্যন্তই। তারপর গলা জড়িয়ে তাইরে নাইরে! এই খবরদার,ফাজলামি করবা না,যাও।

ফ্রেশ হয়ে এসেই আড়াই বছরের শিশুপুত্রকে চুমু খায় শফিক। এই শোন,আয়ানের শরীরটা কেমন গরম। বল কি? দেখি দেখি। তোমাকে না বারবার বলছি ছেলের কোনো সমস্যা হলেই আমাকে জানাবে। আমি ওষুধ নিয়া আসতাম। হঠাৎ জ্বর উঠলে কেমন হবে? তোমার মনে নাই ওর জ্বর হলে কী হয়! না,শানু তোমাকে নিয়ে আর পারি না। ধুর!! এখন খাও তো। এতো আদর সারাদিন কই থাকে? আজব তো! চাকরি বাদ দিয়া কি পোলা কোলে নিয়া বইসা থাকা যায়? এখন খেয়ে নাও। রাত অনেক হইছে।

আয়ান কি মাঝে থাকবে? জ্বি জনাব। মাঝেই থাকবে। কোনো অসুবিধা আছে আপনার? না,আমার নাই। তোমার আছে কি না তাই! এখন চুপ করে ঘুমান।নিজে ঘুমান,অপরকেও ঘুমের সুযোগ করে দিন। ওকে। শোন,বলছিলাম,আব্বাকে এখানে নিয়ে আসি। তুৃমি কী বল? আমি আবার কী বলবো। নিয়া আসো। আয়ানের একজন খেলার মানুষ হবে। বাবাও হয়তো সময়টা ভালো কাটাবেন। তবে উনি কি আসবেন? সেটা একটা সমস্যা। দেখা যাক। আগামি শুক্রবারেই বাড়ি যাব। যেয়ো।

দুপুরের খাবার খেয়েই শফিক অফিস থেকে ফোন করলো – এই আয়ান কী করে? খেয়েছে? কী কী খাওয়াইছো? ব্যথা পাইছে? কীভাবে? তুমি কী করতেছিলা? দেখো,মেজাজ খারাপ করবা না। সারাদিন করো কী তুমি? আজব!!! আচ্ছা রাখো। শোন,বাবা কি ঘুমাইছে? ঠিক আছে রাখো। শফিক আজ অফিস ছুটির এক ঘন্টা আগেই লিভ নিলো। বাসে,রিক্সায় আসতে সময় লাগলো দেড়ঘন্টা। দ্রুত বাসায় ঢুকেই আয়ানকে খোঁজ করলো। আয়ান তার দাদুর সাথে খেলছে। দেখি বাবু কোথায় ব্যথা পেয়েছো? তুই কি এইজন্য দৌঁড়ায়া আইছস? গাধা!! খাট থেইকা পইড়া সামান্য ব্যথা পাইছে। ও কিচ্ছু না। তাই না দাদু। শোন,তুই একবার কী করলি – পেয়ারা গাছ থেইকা পইড়া হাত ভাইঙ্গা ফেললি। আহারে যন্ত্রণা! তিনরাইত তোরে কোলে নিয়া বইসা থাকলাম। ঘুম নাই। হা হা হা। হাসতে হাসতে কাঁশি উঠে গেলো শরাফত আলীর। কাঁশি আর থামে না। কাঁশতে কাঁশতেই না খেয়ে শুয়ে পড়তে হলো তাঁকে সেরাতে। শফিক ভাবলো বাবাকে একটা ভালো ডাক্তার না দেখালেই হবে না। শানু,বাবুর পা মচকেনি তো? কী বল, এক্সরে কী করাবো একটা ? আরে লাগবে না। তেমন কিছুই হয়নি।

বাবা,আমি অফিসে গেলাম। তুমি ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো। আমারে কয়টা টেকা দিয়া যা। দোকানে গিয়া চা খামু। বাবা,এখন সময় খারাপ। দোকানে যাওয়া মানা। শানু তোমারে চা বানায়ে দিবে। বাইরে যাবে না। ধুর,আমার দম বন্দ লাগে। কাঁশিটা কি কমছে? ও সাইরা যাবে চিন্তা করিস না। তুই সাবধানে যাইস। ফি আমানিল্লাহ। দেখি ছুটি পাইলে তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাব আজ। ও লাগবে নারে বাবা,এমনি ভালো হইয়া যাইব।

শফিক আয়ানের গালে চুমু খেয়ে বের হলো। আজ শরাফত আলীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। শানু একবার এসে ডেকে গেলো – বাবা, নাস্তা করে যান। শরাফত আলীর আজ খেতেও ভালো লাগছে না। পেট ফুলে আছে। চার দেয়ালে বন্দি জীবন অতিষ্ঠ লাগে। গ্রামে বন্দিদশা নাই তবে কোনো কোনো দিন তিনবেলা খাবারও জোটে না। বড়পোলার বড় সংসার। তারই অনেক কষ্ট। তারমধ্যে তিনজন পোলার পড়ালেখার খরচ। শফিক একটু সাহায্য করে বলেইতো ওদের পড়ালেখাটা চলছে। কষ্ট হলেও এখানেই থাকা উচিত। শরাফত আলী ভাবে আর দমখিঁচে কাঁশে। কাঁশিটা সারে না কেন কে জানে! শফিকের মা মরলো যে বছর তার পরের বছর থেকেই এই কাঁশি শুরু। কতো ওষুধ খেলো কোনো কাজ হলো না। শফিকের মা নাই কতো বছর! আজ শফিককে জিজ্ঞেস করা লাগবে। ওর কাছে লেখা আছে।

সকাল দশটার দিকে আয়ানের পা ফুলে গেলো। ভীষণ কান্নাকাটি। শানু ফোন করলো শফিককে। শফিক চল্লিশ মিনিটের মধ্যে চলে এলো সিএনজি করে। সেই সিএনজি দিয়েই আয়ানকে নেওয়া হলো ডাক্তারের কাছে। এক্সরে করা হলো। পায়ের গোড়ালি একটু ফুলে গেছে। ভাঙেনি। গরম পানির শেক দিতে হবে কয়েকদিন। আর একটা ওষুধ দিলেন ডাক্তার। আর চিন্তা নেই। সেরে যাবে।

শফিক আবার চলে গেলো অফিসে। দুই ঘণ্টার ছুটি নিয়ে এসেছিল। বিকেলের মধ্যে আয়ান আরাম বোধ করলো। দাদুর সাথে খেললো কিছুক্ষণ । দাদু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প করছে – শোন দাদু,একবার তোর বাপের জ্বর হইল। ভীষণ জ্বর। কবিরাজ দেখাইলাম,ডাক্তার দেখাইলাম। তাও সারে না। পরে আল্লাহর দরবারে হাত পাইতা তোর বাপেরে ভিক্ষা চাইছি। আল্লাহ আমারে খালি হাতে ফিরায় নাইরে দাদু। তোর বাপ সাইরা উঠলো। একথা বলতে বলতেই শরাফত আলীর হেঁচকি দিয়ে কাঁশি শুরু হলো আবার। কিছুতেই থামে না। শানু কী করবে ভেবে পেলো না। এইদিকে আয়ান আবার কান্না শুরু করলো। শফিক আসা পর্যন্ত দাদু নাতির কাঁশি আর কান্না চলতে থাকলো অবিরাম। শানু অস্থির হয়ে উঠলো।

পরদিন শফিক ঠিক করলো বাবাকে গ্রামে রেখে আসাই ঠিক হবে। প্রয়োজনে কিছু বাড়তি টাকা প্রতি মাসে ভাইজানকে দিবে সে। বাবার অসুস্থতা আবার আয়ানের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। না ছেলেটার যত্ন হচ্ছে না বাবার! শানু বললো,এতো আশা করে নিয়ে এলে কিছুদিন রাখবে এখন আবার রেখে আসতে হচ্ছে! কী করার আছে বলো? বাবা ওখানেই ভালো থাকবে। আমরা দুজনেই আয়ানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি বাবাকে দেখবে কে? করো যা ভালো মনে করো।

সকালেই শরাফত আলী সব গুছিয়ে নিলেন। নিজে কখনো শহরে থাকেন নি তবু শহরের নানা নিয়ম কানুন ছেলেকে শেখাতে লাগলেন। আগবাড়ায়া কারো উপকার করছো কী মরছো। সময় নিয়া বাইর হইবা। তাড়াহুড়া নাই। এ জাতির খালি তাড়াহুড়া। চুইষা খাওয়ার লজেন্স খায় কামড়ায়া! শরীরের যত্ন নিবা। দাদুর যেন অযত্ন না হয়…

এ পর্যায়ে কাঁশতে থাকেন শরাফত আলী। আরো বলার আছে তাঁর। আদর্শ বাবা হওয়ার আরো মন্ত্র তিনি ছেলেকে বলতে লাগলেন…। শফিকের ছোটবেলার গল্প বললেন। ছেলেটাকে নিয়ে শরাফত আলীর কতো যন্ত্রণার সময় কাটছে। অসুখ সারতেই চায় নাই। কোনো একদিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। সেদিন পুকুরে পড়ে জীবন- মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ! আল্লাহ বাঁচাইছে। কতো রাইত পার করছে পোলা বুকর ওপর চিৎ হইয়া ঘুমাইয়া! শফিক চাকরি করে বলে আয়ানের তেমন যত্নই নিতে পারে না। আফসোস করতে করতেই শরাফত আলী রিক্সায় উঠলেন। কাঁশিটা আবার আসতে চাইছে। না, এখন যাত্রার সময়! কাঁশিটা শুরু হলে আর থামতে চাইবে না। শরাফত আলী আর কথা বলে না।

শফিক বাবার পাশে বসে ভাবতে থাকে। ছেলেকে সে সময় দিতেই পারে না। তাকে নিয়ে বাবার কতো স্মৃতি। কতো আদর করতো বাবা তাকে। তার বাবার চেয়ে ভালো বাবা কি সে হতে পারবে? আয়ানের প্রতি কি স্নেহের ঘাটতি হচ্ছে তার?

শফিক সেদিন তার ছেলের জন্য অনেক খেলনা, ভিটামিনের সিরাপ, কিছু জামাকাপড় কিনে বাসায় ফিরলো। ঘুমের শিশুকে কোলে তুলে আদর করলো। ছেলেটা তার কয়েকদিন হলো ‘বাবা’ ডাক শিখেছে! সেই মধুর ডাক সে শুনে সপ্তাহে একদিন কী দুইদিন, যেদিন ছুটি থাকে। ছুটির দিনটা সে আয়ানকে কোলছাড়া করে না। একজন আদর্শ বাবার সব দায়িত্ব শফিক পালন করছে মহানন্দে।

তাঁর সময় এখন আদর্শ পিতা হওয়ার!

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *