প্রথম পাতা » গল্প » বড় অফিসার

বড় অফিসার

officer

সময়মতো বাস ছেড়ে দিল। একজন লোক দৌঁড়ে আসছে। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে বাসে ওঠার জন্য। বাসের সব সিট ফিলাপ! কিন্তু লোকটা দৌঁড়াচ্ছে কেন? আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। লোকটা একটা আহাম্মক। আরেকটু হলেই সে চাকার নিচে চলে যেতো। জীবনের মায়া ত্যাগ করে কেউ এভাবে বাসে ওঠে? পরে তো আরো বাস আছে। একটু পরে গেলে কী ক্ষতি!

– ভাই, আপনি কি পাগল নাকি? এখনই তো চাকার নিচে যোগান হইছিলেন! আপনার তো এই বাসে সিট থাকার কথা না!

হেলপারও চিল্লাফাল্লা শুরু করল। সাথে ড্রাইভারও। বাসের সবাই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। আরে নামেন তো! আজাইরা! সিট নাই তবু লোক উঠায়! মাম্মা, একটা লোক দাঁড়ায়ে গেলে সিটিং ভাড়া তোমার …. দিয়া দিমু! অবস্থা বেগতিক দেখে আমি কথা বলা শুরু করলাম-

ভাই, ঘটনা কী? মরমর হয়ে এভাবে বাসে উঠলেন কেন? সবাই তো বিরক্ত হচ্ছে। সামনে নেমে যাবেন, প্লিজ। লোকটি একটু দম নিয়ে কথা বলা শুরু করল:

“ভাই, আমি দুই বছর পর দেশে আসছি। আমার বৌয়ের গত সপ্তাহে একটা পোলা হইছে। খবর পাইয়া ছুইটা আসছি। যত তাড়াতাড়ি যাব ততই মঙ্গল। বিদেশে সুবিধা করতে পারি নাই। আপনারা একটু ধৈর্য ধরেন। পোলার মুখটা দেখনের জন্য মনটা আনচান করতেছে।” লোকটি এ পর্যায়ে কেঁদেই দিল। আমি তাকে কী সান্ত্বনা দিব বুঝলাম না। বাসের সামনের দিকে এক তেঁদরমার্কা চেহারার লোক বসা ছিল। সে হঠাৎ গোয়েন্দামার্কা প্রশ্ন শুরু করল :

– কী বললেন? কত বছর পর আসলেন?
– দুই বছর
-আপনের বৌয়ের কী হইছে?
-পোলা বিয়াইছে
-কবে?
-গত সপ্তায়
– দুই বছরে একবারও বাড়ি আসেন নাই?
– না
-ধূর মিয়া, এই পোলাতো আপনের না!

বাসের সবাই বিড়বিড় শুরু করল। লোকটি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল! এখন উপায়?

আমি এক বিশেষ কাজে এক বড় সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। এক ঘণ্টা বসে থাকার পর বড় সাহেবকে তার চেয়ারে পেলাম। তাকে পরিচয় দিলাম। তিনি মাথা তুললেন না। নিচের দিকে তাকায়ে বললেন: সমস্যা কী?

আমি সমস্যা বললাম। তিনি জানালেন কোথায় যেতে হবে। আসার সময় তার পরিচয় পেলাম- উচ্চমান সহকারী! বাহ! একজন বিসিএস পাশ করা লোককে একবার তিনি দেখারও প্রয়োজন মনে করলেন না। অফিসটি থেকে তিন ঘণ্টা কর্মহীন বসে থেকে শূন্য হাতে ফিরলাম। অথচ যে কেউ শুরুতেই এ কথাটা বলে দিলে আমার তিন ঘণ্টা সময় নষ্ট হতো না! ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম- আমার মতো অধমের এই অবস্থা হলে আরো অধমদের অবস্থা কী? একজনকে ঘটনা বলার পর বলল- আপনি আসল জিনিস ধরতে পারেন নাই! আসল জিনিস বাইর করলে দশ মিনিটে কাম শেষ হইতো। আমি আসল জিনিস কী খুঁজতে লাগলাম।

আরেকটা কাজে এদেশের এক মহান পেশাজীবীর শরণাপন্ন হলাম। মরণাপন্ন হয়ে বাসায় ফিরলাম! তাকে পরিচয় দেয়ার পর বিপদ যেন আরো বাড়ল। সিন্দবাদের ঘাড়ে ভূত চেপেছিল আর আমার ঘাড়ে চাপল জিন! তিনি যে ভাষায় কথা বললেন তাতে আমার মনে হলো আমি বৃটিশ উপনিবেশে আছি। তারা ব্রাহ্মণ আর এদেশের বাকি সবাই নমশুদ্র! তার কথা আর বলতে চাই না! শরীর ঘিনঘিন করছে। অথচ এদের আমরা কত যত্ন করে পড়ানোর চেষ্টা করি। ষোল-সতের বছর বয়সে হাতে বন্দুক উঠলে এমনই হয়! ‘হাতে বন্দুক থাকলে নিরীহ মানুষেরও চোখ যায় পশুপক্ষির দিকে’, অন্যকে অপমান করার নেশা বড় নেশা!

ব্যাংকেও একটু কাজ ছিল। ম্যানেজারের কাছে গিয়ে টাস্কি খেলাম। ডিসির চাইতেও বড় অফিসার মনে হলো। অনেক ছবক দিলেন। ভাবলাম, তাইতো এরা সময় পেলেই ক্লাসমুখী হয়! এদেশের সকল পেশাজীবীই ছাত্রবান্ধব, কেবল শিক্ষকরা ছাড়া।

গত কয়েকদিনে কয়েকটি জায়গায় গিয়েছি। সেবা কী জিনিস তা সচক্ষে দেখলাম। জনগণই নাকি সকল ক্ষমতার উৎস! কেমনে কী? যাদের জনগণের সেবক কিংবা চাকর হওয়ার কথা এরা তো সবাই জনগণের বাপের বাপ হয়ে বসে আছে! ও মাই গড! এদেশ চলছে কীভাবে?

বাসে করে বাড়ি ফিরছিলাম। সেখানেই ঘটনা। লোকটি এবার মাথা থেকে হাত সরাল। সবাই জিজ্ঞেস করল এখন সে কী করবে?

লোকটি বলল এখন আর কিছুই করার নেই। ছেলেটিকে বড় করব আর তাকে বড় অফিসার বানাব!

আমি যেন সেই ছেলেটিকেই বিভিন্ন চেয়ারে দেখে এলাম!

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *