প্রথম পাতা » সেরা » সত্য, সুন্দর এবং অহিংস আন্দোলনের মহান নেতা গান্ধিজী

সত্য, সুন্দর এবং অহিংস আন্দোলনের মহান নেতা গান্ধিজী

Mahatma Gandhi

বিরাট কোনো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না তিনি। তারপরও তিনি এই উপমহাদেশের মানবতাবাদী অবিস্মরনীয় অতুলনীয় মহান পুরুষ। তার পুরো নাম মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। বিশ্ব মানবতার কল্যানে নিজেকে সপে দিয়ে স্বমহিমায় তিনি মহাত্মা গান্ধী নামেই সমধিক পরিচিত। বিরল-ব্যতিক্রম আদর্শের এই প্রতীক পুরুষ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে নিজেকে করেছেন অনুস্মরণীয়। তাই তিনি আজও নেতাদের মহান নেতা। তাঁর আদর্শের প্রতি সম্মান জানিয়ে সর্বভারতীয়রা তাঁকে গান্ধীজি বলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

২ অক্টোবর গান্ধীজির জন্ম দিবস। ১৮৬৯ সালের অক্টোবর মাসের ২ তারিখে বিরল ও মহান মমতাময়ী এক আত্মা নিয়ে ভারতের পরবান্ধরে জন্ম নিয়েছিলেন গান্ধীজি। অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, শাসন-শোষন, রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে পৃথিবীর মানুষ যখন একে অপরের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিলো তখন এই মহান নেতা তার উদ্ভাবিত দর্শন তত্ত্ব নিয়ে ছুটে গেলেন মানুষের কাছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে সেই দর্শন তত্ত্বটি অহিংস আন্দোলন নামে সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করে। গান্ধীজি বিশ্ববাসীকে সকল সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সত্যাগ্রহ বা অহিংস নীতিকে প্রয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের মূলমন্ত্র হলো- সত্য এবং অহিংসা। একটি মামলার ওকালতি করতে তিনি গিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেটোরিয়ায়। সেখানে বসবাসরত দেড় লাখ ভারতীয় শ্রমিকের উপর ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ শাসকদের অত্যাচার, নীপিড়ন দেখে তিনি ভারতীয় শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। ১৮৯৩ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে মানবাধিকার আন্দোলনের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তারপর তিনি কলকাতায় এসে কংগ্রেস সম্মেলনে যোগ দেন। এখানে এসে তিনি দেখলেন বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতা দামি পোশাক পড়ে জনদরদী বক্তৃতায় জনগণের দৃষ্টি আকর্ষন করছে। সেখান থেকে তিনি তার অহিংস দর্শন প্রয়োগের উপযোগিতা খোঁজে নেন। দেশে এসে সারা ভারতের মানুষের কাছে গিয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা অনুসন্ধান করেন। সময় পেরিয়ে ১৯২০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে তিনি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সুত্রপাত করেন। তাঁর আন্দোলনের মূলনীতি- অন্যায়, অপশাসন, শোষন আর অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিদ্রোহের মাধ্যমে ন্যায়বিচার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন হিংসা-বিদ্বেষ, ক্ষমতার দাপট আর পৈশাচিক শক্তির খেলায় পৃথিবীর মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে পারবেনা। এমনকি মানুষের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখতে পারবেনা। তিনি বিশ্বাস করতেন- ভালোবাসা দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, সহযোগিতা দিয়ে অহিংসার মনোভাবকে জাগ্রত করে পৃথিবীর মানুষের মাঝে শান্তি বিস্তার করা সম্ভব। তাঁর এই ধারণা যুদ্ধ-বিদ্রোহ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপকে নিরুৎসাহিত করে।

গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ১৯৩০ সালের লবণ সত্যগ্রহ, ১৯৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় মানবতাবাদী মহানুভব দর্শন প্রয়োগ করে তিনি নেতাদের মহান নেতায় পরিণত হন। যেকারণে নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, সূ চি কিংবা বারাক ওবামার মতো ক্ষমতাধর নেতার আর্দশ পুরুষ এই গান্ধীজি। বর্তমান বিশ্বের মনুষ্য সমাজে চলমান মানবতা বর্জিত সহিংস অস্থির জীবনধ্বংসী রাজনীতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় গান্ধীজি উদ্ভাবিত অহিংস নীতির প্রয়োগ জানা সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতি চলছে উল্টো পথে। তাই মানুষে মানুষে এত হানাহানি আর রক্ত লুলুপের খেলা। এসব বিষয় অবশ্য সেকালে গান্ধীজিকেও ব্যথিত করত। তবুও তিনি ছিলেন মানবতা প্রতিষ্ঠায় আপোসহীন অনন্য পথের দিশারী।

গান্ধীজির জীবনের শেষ আন্দোলন নোয়াখালীর শান্তি মিশন নামে সমধিক পরিচিত। ১৯৪৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালেল মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি এই এলাকায় হিন্দু-মুসলমানদের মাঝে বিরুধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভুমিকা রাখেন। বিশ্বের মানুষের মাঝে মানবতা, শান্তি, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আপোসহীন এই আজীবন সংগ্রামী মহান দার্শনতাত্ত্বিক নেতা ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারী আততায়ীর অপঘাতে জীবনাবসান ঘটে। গান্ধীজির অহিংস দর্শন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর মানুষের জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অতুলনীয় হয়ে থাকবে।

সেরা থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

S M Mukul
এস এম মুকুল
লেখক-কলামিস্ট, হাওর ও কৃষি অর্থনীতি বিশ্লেষক

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *