প্রথম পাতা > শিক্ষা > শিক্ষক দিবসের কড়চা

শিক্ষক দিবসের কড়চা

বিশ্বে শিক্ষকদিবস আছে, বাংলায় নেই। বাঙালি শিক্ষক চায় না। ফলে এতদ্বিষয়ক দিবস নিয়েও তাদের মাথাব্যথা নেই। আমজনতার কাছে শিক্ষকতা কোনো পেশা না। যারা চাকরি পায় না তারাই এদেশে মাস্টারি করে জীবনের গুরুভার বহন করে। গ্রামবাংলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আর থানার দারোগা একসাথে চা খেতে বসলে দারোগার চা আগে আসবে। দারোগার কাপ ধুয়ে দিবে গরম জলে। দোকানি লজ্জায় নত হয়ে দারোগার চায়ের বিল নিবে। ভিসির চা’য়ে আবার চিনি চাইলে দশকথা শুনতে হবে তাঁকে। অপরাধপ্রবণ এই জাতিগোষ্ঠীর কাছে “অসতেরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত।” শিক্ষকতায় লাঠি নেই, উপরি আয়ের ব্যবস্থা কম। সমাজে সে অস্বচ্ছল। তাই তার কদর কম। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বেতন বঙ্গীয় শিক্ষকদের। এদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। এখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসবভাতা, নববর্ষভাতা আসে নামমাত্রে। ননএমপিও ও কিন্ডারগার্টের শিক্ষকরা এদেশে বাজারে যায় সন্ধ্যার পর। রাতে মাছ-সবজির দাম কিছুটা কমে তাই। ঢাকা শহরে একজন আয়ার বেতন তিন থেকে পাঁচহাজার। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকের বেতন শুরু হয় আড়াই হাজার থেকে। তাই এদেশে “শিক্ষকের জীবনের থেকে চোর, চোরাচালানি, দারোগার জীবন অনেক আকর্ষণীয়। এ সমাজ শিক্ষক চায় না, চোর – চোরাচালানি চায়।”

বেসরকারী শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রক স্থানীয় রাজনীতির নটিরা (দুষ্টু অর্থে)। এরা স্কুল, কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়। নিজেরা কখনো এসএসসি পাশ, কখনো ফেল। কিন্তু প্রভাব আছে রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে – পাঠের প্রভাব নয়, দৌরাত্ম্যের। এরা ছড়ি ঘোরায় শিক্ষকের ওপর। চেয়ারে পা তুলে বসে থাকে। শিক্ষক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তোবা ভাগ্যের ফেঁড়ে তারও শিক্ষক ছিলেন ঐ হেডমাস্টার। কিন্তু তাতে কী? একাধিক ধর্ষণ মামলা, চালচুরি, গমচুরি মামলার আসামি এখন তো তার বস! শিক্ষকরা কখনো শিক্ষার নিয়ন্ত্রক হয় না এখানে। আমলারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালায়। ওসি, ডিসিরাও কখনো কখনো ক্লাস নেয়। শিক্ষকে তাদের ভরসা কম। জাতীয় রাজনীতিতে শিক্ষকদের স্থান নেই, মন্ত্রীসভায় নেই, সংসদে নেই। দু একটি সংসদীয় আসনে থাকলেও শিক্ষক পরিচয়ে এমপিরা আর স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না।

বাংলাদেশে একটি রুগ্ন জনগোষ্ঠীর নাম শিক্ষক। এরা আক্রান্ত হয় নিজেদেরই ছাত্রদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাথমিক পর্যন্ত – এদেশে শিক্ষকেরা মার খায়। এ সমতলে শিক্ষকদের আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস খুব ভারী। আজিজ মাস্টার থেকে শুরু করে মুনীর চৌধুরী, সময়ে কিংবা মহাসময়ের বলী হয়েছেন শিক্ষকরা। মুনীর চৌধুরী প্রাণ দিয়েছেন দেশের জন্য, এখন অনেকে মান দেন ক্যাশের জন্য। ছাত্রনেতাদের বখরা দিয়ে শিক্ষকের চেয়ার ঠিক রাখতে হয়! রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভোস্ট হওয়া যায় না, ভিসি হওয়া যায় না, অধ্যক্ষের চেয়ার ধরে রাখা যায় না।

বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজ পেশা শিক্ষকতা। ‘একরাত্রি’ গল্পের মতো। সব জায়গায় ধরা খেয়ে জীবনে কিছুই পেলেন না, শিক্ষক হবেন নিশ্চিত। ভাঙা স্কুল হোক আর কোচিং সেন্টার হোক। এখানে সবাই শিক্ষক। কিন্ডারগার্টেনের প্রধানও অধ্যক্ষ, কলেজপ্রধানও অধ্যক্ষ! মানে কোনো ঘাটতি নেই! শিক্ষা দিয়ে ডালভাতের ব্যবস্থা কেবল এদেশেই সম্ভব। আপনার বৌ, শালি, ভাই, শালা চারজনে একটি স্কুল তুলে চুপচাপ বসে থাকুন। একদিন জাতীয়করণের ডাক আসবে। আপনার স্কুল নিয়ে আপত্তি? জায়গামতো টাকা মারেন। কামসারা। স্কুলই নেই? বলেন কী! ঐ যে মেশিনঘর দেখা যায়! ঐটা দেখান। টাকা বাড়ান। সরকারির তালিকায় নাম দেখে চোখ ছানাবোড়া হয়ে গেলোতো! আপনার কপাল বটে! আর আপনার সুমুন্দির তো রাজকপাল! জাল সার্টিফিকেটে পাঁচলাখে কৃষিশিক্ষার কলেজ শিক্ষক! পরের বছর সরকারি! বিসিএস ক্যাডার???? আপনার কাছে একটু বিষ হবে ভাই?

মেধাবীরা কেন আসবে শিক্ষকতায়? কী আছে এখানে? অথচ এখানে তাদেরই দরকার ছিলো বেশি। সাহিত্যে এম.এ পাশ করে ব্যাংকে টাকা গোনে সকাল-সন্ধ্যা। তবু শিক্ষকতায় আসে না। সে মহান পেশাকে ধারণ করতে চায় না। ‘শিক্ষকতা মহান পেশা’ এই কথাটির মধ্যে আছে সামহিক বঞ্চিতকরণের মূলমন্ত্র। শিক্ষকতা ‘মহান’ পেশা হলে এই পেশার বেতনও ‘মহা’ হতো।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে, নাটকে একজন করে শিক্ষক চরিত্র থাকে প্রায়ই। এদের সবাই প্রায় আধাপাগল। সমাজের কমিক চরিত্র। লেখক সমাজ-বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেন। একজন শিক্ষকের যখন কিছুই থাকে না, তখন সে কোনদিন কোন দারোগাকে ধমক দিয়েছিলো আর সেই ধমক খেয়ে তার হাতের লাঠি পড়ে গিয়েছিলো মাটিতে সে গল্পই হয়ে উঠে জীবনের সার্থকতার কথকতা। তাঁর জীবনের প্রাপ্তি বলতে কতোগুলো গোল্ড মেডেল! ঐসবে আবার জীবনের চাকাও ঘোরে না। হুমায়ূনের গল্পের শিক্ষকেরা আমাদের সমাজ থেকেই নেওয়া। জীবনের ভারে এরা কখনো উন্মাদ, কখনো কমিক।

শিক্ষকতা যেমন একটি পেশা, তেমনি একটি ব্রতও। এখন শিক্ষকরাও ধর্ষক হয়, জালসনদধারী হয়, নিপীড়ক হয়। এটি জাতির জন্য লজ্জারও বটে। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন মেনে নেওয়া কঠিন।

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন- শিক্ষকরা নিজে পুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলো ছড়ান। দেশে সত্যিকার আলোর সন্ধ্যান করতে চাইলে যার যার প্রাপ্য সম্মান দিয়ে রাষ্ট্রকে শিক্ষকদের স্বার্থে কাজ করতে হবে। তবেই এদেশে শিক্ষকদিবসের তাৎপর্য উপলব্ধ হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সুজন হামিদ
সুজন হামিদ
আমার কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না। কবিতা না লিখলেও আমার দুটি মহাকাব্য আছে।আরিয়ান হামিদ বর্ণ আর আদনান হামিদ বর্ষ - আমার দুই পুত্রের মাঝে জীবনের সকল প্রশান্তি খুঁজে পাই।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?    আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *