আমার হাই স্কুলের সভাপতি ছিলেন সরকার দলীয় এক নেতা। তখন কী তার দাপট! ঐ সময়ে গায়েবি নানা কারণে কয়েকজন শিক্ষকের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। আমার শিক্ষকদের দুরবস্থা ছিল ভয়াবহ। একজন স্যার একদিন কাউকে কিছু না বলে কোথায় হারিয়ে গেলেন! তিনি আর ফিরে আসেননি। আরেকজন ঋণের দায়ে, কন্যাদায়গ্রস্ত হয়ে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন। সভাপতির ইচ্ছায় কেউ ‘পাগল’ হতো কেউবা খেয়েপরে বেঁচে থাকতো। আরেকজন অভিভাবক সদস্যের হাতে একদিন হেডস্যার মার খেলেন। সবচেয়ে গোবেচারা একজন স্যার ঐ এলাকার একজন হেডমওয়ালা নেতার ছেলের হাতে কিলঘুষি খেলেন একদিন। পরীক্ষায় নকল করতে বাধা দেওয়ায় ছুরির আঘাত খেলেন একজন! আমি এই ঘটনাগুলো দেখেছি ক্লাস সিক্স থেকে টেন এ পড়ার সময়ে। তারপর কতোদিন চলে গেলো! নিজেও একদিন এ পেশায় চলে এলাম।
আমি যোগদান করার পর দেখলাম এক বিস্ময়কর ঘটনা। আমার সামনেই ঘটলো। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কয়েকবার লাঞ্ছনা করা হলো। স্যারের অপরিসীম ধৈর্য আর কর্মনৈপুণ্যের গুণে তিনি টিকে থাকলেন। এমন বীভৎস ভাষায় গালিগালাজ আর মারমুখী আচরণ যে কারো পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। অথচ তিনি এমন অবস্থার শিকার হয়েছেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করতে গিয়ে। আমার জানামতে তিনি কোনো টাকাপয়সা তসরুফ করেননি। কখনো কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেননি। তবু তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছে বারবার।
আমি ব্যানার হাতে কয়েকবার রাস্তায় দাঁড়িয়েছি আমার সহকর্মীদের লাঞ্ছনার প্রতিবাদে। কোনো বিচার হয়নি। কলেজের অধ্যক্ষ, নারী সহকর্মী, পুরুষ সহকর্মী কেউই সেই নির্যাতন থেকে বাদ যাননি। একটি বিচারও করতে দেখিনি। শিক্ষকদের সমবেদনা জানিয়ে দু লাইন বলারও সময় কারো হয়নি।
শিক্ষকদের ওপর ছিল শাস্তির খড়গ। ছিল ডিজিটাল প্রযুক্তি আইন। সামান্য ফেসবুকে লেখার কারণে অনেকেই হয়েছেন হয়রানির শিকার। অনেক সহকর্মীর কাছে শুনেছি অনার্স কলেজগুলোয় সরকারদলীয় ছাত্রনেতাদের ত্রাসের রাজত্ব। পরীক্ষায় নকলে বাধা, বখরা না দেওয়া, অনুষ্ঠানে সামনের সিটে আসন না দেওয়াসহ নানা কারণে শিক্ষকদের ওপর নিপীড়ন ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কোনো বড় প্রোগ্রামে সাধারণ শিক্ষকরা যেতেন না। এসব অনুষ্ঠানে ছাত্র নেতাদের প্রাধান্য থাকায় ইজ্জত নিয়ে লুকিয়ে থাকতেন শিক্ষকরা। সরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সরকার দলীয় না হয়ে থাকার কি কোনো উপায় আছে? এই দেশে দশ লক্ষ সরকারি চাকরিজীবীর সবাই গত ১৬ বছর আওয়ামিলিগ করেছে! বলা যায়, করতে হয়েছে। তবে সরকারের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের চেয়ে অন্যদের অবদান বেশি।
স্বৈরশাসনের রোলারগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন কারা করে সেটা এ জাতির বুঝা উচিত। ছাপোষা শিক্ষকদের দিয়ে এদেশের প্রকল্প, আইন, বিচার নিয়ন্ত্রিত হয় না।
শিক্ষকরা এ জাতির ভাঙা কুলা। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা একদিনও শিক্ষকদের ডাকেননি। কারণ তার জানা ছিল কাদের কাঁধে বন্দুক রেখে মতলব হাসিল করা যাবে। সেটা তিনি করেছেন এবং ‘সফল’ভাবেই করেছেন। এদেশের কোনো শিক্ষকের বিদেশে বাড়ি নেই। হাজার কোটি টাকা তারা বিদেশে পাচার করেনি। এদের অনেকের নুন আনতে পানতা ফুরায়। এদের জীবন কচুরিপানার মতো তেজহীন নিরুত্তাপ। একজন মন্ত্রীর স্বৈরাচারিতার বিপক্ষে কথা বলায় বেসরকারি শিক্ষক নেতা কাউসার সাহেবের চাকরি চলে গিয়েছিল। কেউ কি পেরেছিল তার চাকরি ফিরিয়ে দিতে?
এমন হাজারো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কাহিনি বলতে পারবো। কিন্তু কাকে বলবো? বলে কী লাভ? একটা বিপ্লব হলো। ছাত্র জনতার বিপ্লব। শিক্ষাঙ্গনে এর সুবাতাসটা বইবার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ হলো উল্টোটা। প্রতিদিন কী জঘন্যরকম অপমান অপদস্ত করে যার যার মর্জিমাফিক একে তাকে টেনে হিঁচড়ে নামাচ্ছে। ছোটো ছোটো পোলাপান মায়ের বয়সী শিক্ষককে কিলঘুষি মারছে, পুরুষরা মহিলাশিক্ষকদের টেনে চেয়ারছাড়া করছে। ছাত্র শিক্ষককে ঘুষি মেরে বিমলানন্দ ভোগ করছে। অথচ কেউ কিছুই বলছে না। আমি যেসব ঘটনা বলেছি সেগুলোর সময়ব্যাপ্তি ১৯৯৬ থেকে ২০২৪! বলেন তো শিক্ষকরা আসলে কখন ভালো ছিল? এ জাতি কি কখনো শিক্ষকের ভালো চেয়েছে? ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো জাতি গড়ে উঠবে কী করে? শিক্ষকের ভালোর জন্য এ জাতি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? অতীতে, বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে?
গত ১৬ বছর সরকারের সবচেয়ে কাছে থেকে যারা জনগণকে ভুগিয়েছে দেখেন তাদের কেউই বিপদে নেই। ৬ তারিখ থেকেই তারা আবার নতুন মোড়কে নেমেছে। পদোন্নতি নিচ্ছে, নতুন সরকারকেও গ্রাস করে ফেলেছে। যেভাবে স্কুল কলেজের শিক্ষকদের টানছেন একটা টান ডিসি অফিস, এসপি অফিসে দেন তো! অস্তিত্ব থাকবে আপনার? ছাগলনাইয়া কলেজের একজন শিক্ষকের ক্ষমতা কি একজন ডিসি-এসপির চেয়ে বেশি ছিল গত ১৫ বছর?
শিক্ষক হিসেবে না হোক অন্তত মানুষকে সম্মান দিতে শেখেন। কেউ অপরাধী হলে প্রচলিত আইনে বিচার করেন। কাউকে সরাতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। রাস্তায় পেয়েই তার অণ্ডকোষ গলিয়ে দিবেন না। এসব বন্ধ না করলে একদিন নিজেরটাও ফেটে চৌচির হবে। ৫ আগস্ট আপনাকে কি কিছুই শেখাতে পারেনি?
