একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব যখন ধর্মীয় পরিচয়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়, তখন তা কেবল শিক্ষাঙ্গনের সংকট থাকে না, সমগ্র সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করার কথা, সেখানে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যদি নিজেদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপেক্ষা করে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, উচ্চশিক্ষা কি সত্যিই তাদের মননকে প্রসারিত করতে পেরেছে? নাকি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমস্ত আয়োজনের মধ্যেও তাদের চিন্তাজগৎ রয়ে গেছে সংকীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সংস্কারের কাছে বন্দী?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের পাশে গরুর মাংস রান্না এবং পরবর্তী সময়ে গরুভোজ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। ঘটনাটিকে নিছক খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা কিংবা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে বিবেচনা করলে এর গভীরে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষিত থেকে যায়। বিশেষত ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্ন সামনে আসার পরও যখন একই খাদ্যকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করা হয়, তখন সেই আচরণের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী মনস্তত্ত্বের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের একজন নাগরিকের গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। খাদ্যাভ্যাস ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ কি যা ইচ্ছা তাই করা? অধিকারের অর্থ কি নিজের পছন্দকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের বিশ্বাস, অনুভূতি কিংবা মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করা? নিশ্চয়ই নয়। স্বাধীনতা কোনো সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতার নাম নয়। বরং স্বাধীনতার মৌলিক নৈতিক শর্ত হলো অন্যের সমান স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। নিজের অধিকার প্রয়োগের নামে অন্যের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা হলে সেটি আর স্বাধীনতার উদাহরণ থাকে না। সেখানে অধিকারের ভাষা ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত চরিত্র হয়ে ওঠে আধিপত্যবাদী।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী গরুর মাংস খাবেন কি খাবেন না, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের সন্নিকটে, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের আপত্তি ও সংবেদনশীলতার প্রেক্ষাপটে, খাদ্যাভ্যাসকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের উপাদানে পরিণত করার নৈতিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। এখানে বিরোধের বিষয় খাদ্য নয়, বরং খাদ্যকে ঘিরে নির্মিত রাজনৈতিক প্রতীক এবং তার সামাজিক অভিঘাত।
এই মনস্তত্ত্বের সঙ্গে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি অস্বস্তিকর সাদৃশ্য রয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিভিন্ন প্রবণতায় গরুর মাংসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় পরিচয় ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুর খাদ্যস্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাঙ্গনে সংখ্যাগরিষ্ঠের খাদ্যাভ্যাসকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অনুভূতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলে একই ধরনের আধিপত্যবাদী যুক্তির প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং ঘটনার মাত্রা অবশ্যই এক নয়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়কে অন্যের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা যে ধর্মীয় পরিচয়েই প্রকাশ পাক, তার নৈতিক সংকট অভিন্ন। ভারতে মুসলমানের খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা অস্বীকার করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, বাংলাদেশে হিন্দুর ধর্মীয় মর্যাদা ও উপাসনালয়ের পরিবেশের প্রতি অবজ্ঞাও তেমনি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। ধর্মের নাম বদলালেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী মনস্তত্ত্বের চরিত্র বদলে যায় না।
আরও বিস্ময়ের বিষয়, এ ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে সমাজের প্রত্যাশা কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন নয়। তাদের কাছ থেকে যুক্তিবোধ, মানবিক সংবেদনশীলতা, সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার নৈতিক সামর্থ্য প্রত্যাশিত। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষকে নিজের বিশ্বাসের বাইরে অন্যের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে না শেখায়, তাহলে সেই শিক্ষার প্রকৃত অর্জন নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হতে পারেন, অথচ তার চিন্তা গভীরভাবে সাম্প্রদায়িক থাকতে পারে। তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে পারেন, এমনকি নিজেকে প্রগতিশীল বলেও পরিচয় দিতে পারেন। কিন্তু নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাইরে অন্যের বিশ্বাসকে সমান মর্যাদায় গ্রহণ করতে না পারলে তার এই আধুনিকতার ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ আধুনিকতা কেবল জীবনযাপনের বাহ্যিক পরিবর্তন নয়। এটি চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তির চর্চা এবং অপরের অধিকারের প্রতি সচেতন দায়বদ্ধতার বিষয়।
এখানেই বাঙালির বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাচর্চায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল অন্ধবিশ্বাস, সংকীর্ণতা ও চিন্তার জড়তা থেকে মানুষকে মুক্ত করার আহ্বান। শিখা পত্রিকার সেই বিখ্যাত বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।”
প্রায় এক শতাব্দী পরেও এই কথাগুলো বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হলেও যদি মানুষের সহনশীলতা না বাড়ে, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হলেও যদি মননের মুক্তি না ঘটে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হয়তো অর্জিত হয়, কিন্তু বুদ্ধির মুক্তি অধরাই থেকে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আচরণকে কেন্দ্র করে সমগ্র প্রতিষ্ঠান কিংবা সব শিক্ষার্থীকে সাম্প্রদায়িক বলা অবশ্যই অনুচিত। একইভাবে আয়োজকদের ঘোষিত উদ্দেশ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের অভিযোগকে এক করে দেখাও সতর্কতার দাবি রাখে। তবে এটিও সত্য যে কোনো কর্মসূচির উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো নয় বলে দাবি করলেই তার সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক অভিঘাত অস্বীকার করা যায় না। একটি কর্মসূচির নৈতিকতা বিচার করতে হলে তার উদ্দেশ্যের পাশাপাশি পরিস্থিতি, প্রতীকী অর্থ এবং অন্য সম্প্রদায়ের ওপর তার প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়।
একটি বহুত্ববাদী সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রকৃত নৈতিক শক্তি প্রকাশ পায় সংযমে, শক্তি প্রদর্শনে নয়। নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় তার সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজের আচরণ সংযত করাই স্বাধীনতার সবচেয়ে পরিণত প্রকাশ। এই সংযম দুর্বলতা নয়, বরং সভ্যতার পরিচয়।
বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতার সংকট এখানেই। আমরা প্রায়ই সাম্প্রদায়িকতাকে অন্যের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখি। ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ করি, অথচ নিজেদের সমাজে একই ধরনের বর্জনমূলক মানসিকতার প্রকাশ ঘটলে তাকে স্বাধীনতা, সংস্কৃতি কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকারের যুক্তিতে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করি। এই দ্বৈত নৈতিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। অসাম্প্রদায়িকতা কোনো বিশেষ ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এটি সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকারের পক্ষে একটি নৈতিক অবস্থান।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি মানুষের মননকে উদার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাজের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমরা কতটা প্রত্যাশা করতে পারি? যে শিক্ষার্থী অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি বোঝার ন্যূনতম সংবেদনশীলতা অর্জন করেননি, তিনি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র, প্রশাসন কিংবা সমাজের নেতৃত্বে গিয়ে বহুত্ববাদ ও সমঅধিকারের নীতি কতটা ধারণ করবেন, সেই প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক নয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক তাই কেবল একটি গরুভোজের ঘটনা নয়। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রবণতা এবং স্বাধীনতার ধারণা সম্পর্কে সামাজিক বিভ্রান্তির একটি উপলক্ষ। এই ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তা হলো আমরা শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারী অথচ সংকীর্ণ চিন্তার মানুষ তৈরি করছি?
শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার মহত্ত্ব নিজের ইচ্ছা পূরণের ক্ষমতায় নয়, অন্যের স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার সামর্থ্যে। নিজের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার অথচ অন্যের অধিকারের প্রশ্নে নির্বিকার থাকা কোনো মুক্তচিন্তার পরিচয় নয়। যে মন অন্যের বিশ্বাসের অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারে না, সে মন যত শিক্ষিতই হোক, মুক্ত নয়। সে মন অবরুদ্ধ।
আর অবরুদ্ধ মস্তিষ্কের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তুলে দেওয়া সম্ভব হলেও তাকে প্রকৃত অর্থে আলোকিত করা সম্ভব নয়। জ্ঞানের অহংকার থেকে মুক্তি আসে না। মুক্তি আসে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক পরিপক্বতা থেকে, যা মানুষকে নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সমান মর্যাদায় দেখতে শেখায়।
