প্রথম পাতা » মতামত » গণঅভ্যুত্থান মানেই বিপ্লব নয়: রাজনৈতিক পরিভাষার তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি

গণঅভ্যুত্থান মানেই বিপ্লব নয়: রাজনৈতিক পরিভাষার তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি

Mass Uprising

দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা, এমনকি একাডেমিক পরিসরের অনেকেই অনায়াসে বিপ্লব (Revolution) শব্দটিকে গণঅভ্যুত্থান (Mass Uprising) কিংবা বিদ্রোহ (Rebellion)-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেন। কোনো সরকারের পতন ঘটলেই তাকে বিপ্লবের মহিমায় অভিষিক্ত করার এক অদ্ভুত প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। রাজনৈতিক বক্তৃতা, টেলিভিশনের আলোচনা কিংবা সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয়তে শব্দটির এমন নির্বিচার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান, বিদ্রোহ এবং সামাজিক আন্দোলন (Social Movement) পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন ধারণা নয়। এদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, সংঘটনের প্রক্রিয়া, গণঅংশগ্রহণের প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক আবেগের আতিশয্যে সেই পার্থক্য বিস্মৃত হওয়া সহজ, কিন্তু তাতে ইতিহাসের যথার্থ ব্যাখ্যা যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত চরিত্রও আড়ালে থেকে যায়।

বিপ্লব শব্দটির প্রতি আমাদের রাজনৈতিক সমাজের এক দুর্নিবার আকর্ষণ রয়েছে। সম্ভবত এর অন্তরালে কাজ করে শব্দটির ঐতিহাসিক গৌরব। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব কিংবা চীনা বিপ্লব আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে যে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছিল, তার ফলে বিপ্লব এক বিশেষ রাজনৈতিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সেই মর্যাদার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় যেকোনো সফল গণপ্রতিরোধকে বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং তার তাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস এক বিষয় নয়। একটি গণঅভ্যুত্থান বিপ্লব না হয়েও ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

বিপ্লবের ধ্রুপদি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় থিডা স্কচপলের স্টেটস অ্যান্ড সোশ্যাল রেভল্যুশনস (১৯৭৯) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সামাজিক বিপ্লব কেবল ক্ষমতাসীন শাসকের অপসারণ নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক শ্রেণিকাঠামোর দ্রুত এবং মৌলিক রূপান্তর, যার সঙ্গে নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপ্লবের তাৎপর্য নিহিত রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, সামাজিক সম্পর্কের পুনর্গঠন এবং পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিগত পরিবর্তনে।

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব কেবল রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেনি, সামন্ততান্ত্রিক বিশেষাধিকার ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। একইভাবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতা, সম্পত্তির সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সংগঠনে মৌলিক পুনর্বিন্যাস ঘটেছিল। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার বিপ্লবী চরিত্র অনুধাবন করতে হলে তাই কেবল শাসক পরিবর্তনের হিসাব যথেষ্ট নয়।

তবে বিপ্লবের এই ধ্রুপদি ব্যাখ্যাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় ধারণাটিকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কিলিয়ান ক্লার্ক ২০২৫ সালে অ্যানুয়াল রিভিউ অব পলিটিক্যাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপ্রবন্ধে বিপ্লবকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ব্যাপক গণঅংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে।

ক্লার্কের সংজ্ঞায় তিনটি শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত নির্বাচনী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে রাজনৈতিক প্রতিরোধ। তৃতীয়ত, বিদ্যমান রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার অপসারণ ও প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবদান হলো, বিপ্লবকে তার পরিণতি দিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা। ফলে কোনো বিপ্লবী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও সেটি বিপ্লবী প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। বিপ্লবের জন্য সহিংসতা কিংবা ব্যাপক সামাজিক রূপান্তরও অপরিহার্য নয়।

এখানেই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিপ্লবের ধারণাগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়। গণঅভ্যুত্থান মূলত ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও তীব্র গণপ্রতিরোধকে নির্দেশ করে। এর ফলে সরকারের পতন ঘটতে পারে, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ভেঙে পড়তে পারে, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও আমূল বদলে যেতে পারে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন (Government Change) এবং রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change) অভিন্ন বিষয় নয়। সরকার বলতে নির্দিষ্ট সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনাকারী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বোঝায়। অন্যদিকে শাসনব্যবস্থা নির্দেশ করে সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, ক্ষমতাসম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জিত ও প্রয়োগ করা হয়।

একজন শাসকের বিদায়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটতে পারে, অথচ পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বহাল থাকতে পারে। আবার কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য যদি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করা হয়, তাহলে ক্লার্কের বিস্তৃত সংজ্ঞায় সেটি বিপ্লবী প্রচেষ্টাও হতে পারে। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব পরস্পরবিরোধী নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দুটি পরিচয়।

বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিভ্রান্তি রয়েছে। বিদ্রোহ বলতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধকে বোঝায়। এর লক্ষ্য হতে পারে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, বিচ্ছিন্নতা কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি আদায়। বিদ্রোহ প্রায়ই সশস্ত্র প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সব বিদ্রোহ সশস্ত্র নয়। অন্যদিকে প্রতিবাদ (Protest) বলতে নির্দিষ্ট দাবি কিংবা অসন্তোষ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সংঘটিত সম্মিলিত রাজনৈতিক কার্যক্রমকে বোঝায়। প্রতিবাদ কখনো একদিনের বিক্ষোভে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, আবার বৃহত্তর আন্দোলনের অংশও হতে পারে। সুতরাং প্রতিবাদ ও বিদ্রোহকেও অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যথার্থ নয়।

সামাজিক আন্দোলন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত এবং ধারাবাহিক একটি ধারণা। শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা সংস্কার, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে সংঘটিত সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সামাজিক আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। চার্লস টিলি, সিডনি ট্যারো এবং ডাগ ম্যাকঅ্যাডামের গবেষণায় সামাজিক আন্দোলনের সাংগঠনিক ও প্রক্রিয়াগত বৈশিষ্ট্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি আন্দোলন বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার চাইতে পারে। আবার পরিস্থিতির পরিবর্তনে সেই আন্দোলন শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যও গ্রহণ করতে পারে। ফলে সংস্কারবাদী আন্দোলন থেকে বিপ্লবী আন্দোলনে উত্তরণ সম্ভব, কিন্তু অনিবার্য নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক আলোচনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়। ফলে ঘটনাটি কেবল একজন শাসকের অপসারণে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্লার্কের বিস্তৃত সংজ্ঞায় একে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিপ্লবী প্রচেষ্টা হিসেবে বিশ্লেষণ করার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে।

একই প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উত্থাপিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে। কোটা সংস্কারের দাবিতে সূচিত আন্দোলন ক্রমান্বয়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী গণপ্রতিরোধে রূপান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটনাটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু ঐতিহাসিক গুরুত্ব আর বিপ্লবী চরিত্র অভিন্ন বিষয় নয়। ২০২৪ সালের ঘটনাকে বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি মৌলিক তাত্ত্বিক আপত্তি রয়েছে।

প্রথমত, আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিল বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট নীতিগত সংস্কারের দাবিতে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু সরকার উৎখাতের দাবি এবং সমগ্র রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য এক নয়। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হলেও তাকে একটি সুসংহত ও সর্বসম্মত বিপ্লবী কর্মসূচি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক প্রমাণের প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত ফলাফল ছিল ক্ষমতাসীন সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা কিংবা সামাজিক শ্রেণিসম্পর্কের মৌলিক পুনর্গঠন তখন সংঘটিত হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ফলে স্কচপলের সামাজিক বিপ্লবের সংজ্ঞায় ঘটনাটিকে বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া যায় না।

তৃতীয়ত, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক বিষয় নয়। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণে দেখতে হয় ক্ষমতার বণ্টন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সম্পর্ক এবং শাসনের মৌলিক নিয়ম কতটা পরিবর্তিত হয়েছে। কেবল নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আবির্ভাব কিংবা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কোনো ঘটনাকে সামাজিক বিপ্লবে পরিণত করে না।

অবশ্য এখানে ক্লার্কের বিস্তৃত সংজ্ঞার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, বিপ্লবের সফলতা নয়, বরং শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত গণপ্রতিরোধই প্রধান বিবেচ্য। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৪ সালের ঘটনাকে বিপ্লবী প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ একেবারে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য দেখাতে হবে, আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল শেখ হাসিনার সরকারের পতন ছিল না, বরং বিদ্যমান রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রতিস্থাপনও ছিল তার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য। গণঅংশগ্রহণের ব্যাপকতা কিংবা সরকারের পতন এককভাবে এই শর্ত পূরণ করে না।

এখানেই ২০২৪ সালের ঘটনাকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করার পরিবর্তে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করা অধিকতর ধারণাগত সতর্কতার পরিচায়ক। ১৯৯০ সালের মতো ২০২৪ সালেও ব্যাপক গণপ্রতিরোধের মাধ্যমে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটেছে। উভয় ঘটনার প্রেক্ষাপট, আন্দোলনের চরিত্র এবং রাজনৈতিক পরিণতি অভিন্ন নয়। কিন্তু এই সাদৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। যে ঘটনাকে আমরা ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান বলেছি, অনুরূপ সরকার পতনের ঘটনাকে ২০২৪ সালে বিপ্লব বলার স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক ভিত্তি কী? কেবল রাজনৈতিক প্রজন্মের পরিবর্তন কিংবা আন্দোলনের তীব্রতা কি একটি ঘটনার ধারণাগত পরিচয় বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?

সমস্যা হলো, আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে বিপ্লব প্রায়ই বিশ্লেষণাত্মক ধারণার পরিবর্তে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিপ্লবের দাবির মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি কেবল অতীতের একটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে না, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে নিজেদের বিশেষ নৈতিক কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিপ্লবের নামে পুরোনো কর্তৃত্ববাদের অবসান ঘটিয়ে নতুন কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠাও সম্ভব। আবার বহু গণঅভ্যুত্থান ব্যাপক সামাজিক বিপ্লব ছাড়াই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ উন্মুক্ত করেছে।

সুতরাং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে বিপ্লব না বলার অর্থ তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়। বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণে তাত্ত্বিক সততা বজায় রাখা। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনকে বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকার পরিবর্তনের বাইরে শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য অথবা সামাজিক বিপ্লবের সংকীর্ণ সংজ্ঞায় মৌলিক রাষ্ট্রিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

আমার বিবেচনায়, ২০২৪ সালের ঘটনাকে একটি সফল গণঅভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করাই অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ এর প্রত্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত ফলাফল ছিল ক্ষমতাসীন সরকারের পতন, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক বিপ্লবী পুনর্গঠন নয়। বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি এবং একটি বিপ্লব সংঘটিত হওয়া সমার্থক নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আর সেই পরিবর্তনের বাস্তবায়নের মধ্যেও বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ রাজনৈতিক আবেগকে তাত্ত্বিক সত্যে উন্নীত করা নয়, বরং ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে সুস্পষ্ট ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে। তাকে বিপ্লবের অভিধায় ভূষিত করতেই হবে, এমন কোনো ঐতিহাসিক কিংবা তাত্ত্বিক বাধ্যবাধকতা নেই।

বিপ্লবের ঘোষণা দিয়ে বিপ্লব সংঘটিত হয় না। একটি সরকারের পতন ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, কিন্তু তা নিজেই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্মের নিশ্চয়তা নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত তার গণপ্রতিরোধের শক্তিতে, বিপ্লবের অলংকারে নয়। ইতিহাসকে যদি রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে তাত্ত্বিক বিবেচনায় বিচার করি, তবে স্বীকার করতেই হবে, শাসকের পতন ঘটেছে বলেই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

মোঃ আল-আমিন
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *