প্রথম পাতা » মতামত » নন্দনকাননে ভ্রমে দুরাচার দৈত্য?

নন্দনকাননে ভ্রমে দুরাচার দৈত্য?

Eden Mohila College

যৌবনে একবার একটা অর্ধ-প্রণয়ে পড়তে পড়তেও ওঠে এসেছিলাম। আমি তখন ঢাবির বাংলায় পড়ি। রাবীন্দ্রিক রসে সিক্ত, নজরুলে আসক্ত, জীবনানন্দে বিলীন আমার মন তখন আঁকুপাকু করে। যাকে দেখি তাকেই ভালো লাগে! একপাক্ষিক প্রতিটা প্রেমই আমার জীবনে প্রথম প্রেমের অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়! যৌবনে কাকও নাকি সুন্দরী। আর রমণীর দেখা পেলে তো হালে পানি! অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো একবার! নারীকণ্ঠ! আহ্লাদে গদগদ আমার মনে তখন কাব্যিক সুধা লদকা লদকি করছে। তখন ডিজুসের কাল! সারারাত আমরা জুস করতাম ডিজুসে! টাকা ছাড়াও প্রেম হতো তখন! আমাদের কথা ফুরায়ে আবার শুরু হতো কয়েকবার! ‘এই ফোন রাখো’ ‘না তুমি রাখো সোনা’ এসব আকথা কুকথায় ফজরের আজান পড়লে সোনা অথবা ময়না যে কোনো একজন ফোন রাখতো! পরদিন ফোন রাখাকে কেন্দ্র করে অযাচিত বাতচিত দিয়ে আবার শুরু হতো জুসের খেলা! আহা! জীবনের কতো অপচয়!!

নারীকণ্ঠটি সুধাময়। ‘অপরিচিতা’র কল্যাণীর মতোই হবে। আমি আবারো প্রথমবার প্রেমে পড়লাম। সে মাঝে মাঝে ঢাবিতে আসত। এটা সেটা নিয়ে আসতো। আমরা ঘুরতাম, আড্ডা দিতাম। একরাতের আকাশে বাঁধভাঙা জোছনা আমার সর্বনাশ করলো। তাকে বলছিলাম পূর্ণিমার চাঁদ দেখার জন্য। ছাদে গিয়ে সে চাঁদ দেখে এসে আমাকে জানালো সেদিনের আকাশে নাকি পাঁচশ পাওয়ারের লাইট জ্বলছিল! কোনো চাঁদটাদ সে দেখেনি! আমি সেদিনই মানে মানে কেটে পড়লাম। প্রেমের কপালে লাত্থি সাড়ে সাত কুড়ি!

সে কোথায় পড়তো আজ তা বলব না। বেরসিক মানুষ নিয়ে কথা বলার মানে হয় না। তার চেয়ে ইডেন কলেজ নিয়ে খুব হৈচৈ হচ্ছে। সেটা নিয়ে দু চার কথা লিখি বরং।

ঢাকার সুপ্রাচীন এই বিদ্যাপীঠটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। নারীশিক্ষার অভিপ্রায় থেকেই এই বিদ্যালয়টি ক্রমে আজকের রূপ লাভ করেছে। এখানে পঁয়ত্রিশ হাজার নারী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। ছয়টি ছাত্রীনিবাস আছে। কলেজটি ১৫০ বছর উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এশিয়া মহাদেশে নারী শিক্ষার জন্য এই কলেজটির সাফল্য অনবদ্য। এটি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এ কলেজের নারীরা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। বুয়েটের গণিত বিভাগের পাঁচজন গবেষক এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী! এখানকার নারীরা শিক্ষা নিয়ে দেশগড়ায় ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সারাদেশে কলেজটি নিয়ে সমালোচনা চলছে। চলাটাই স্বাভাবিক। কারণ এখানে নারীরা পড়ে, নারীরা রাজনীতি করে, নারীরা ক্ষমতায় কেন্দ্রীভূত হয়, নারীরা দেশসেবায় নিয়োজিত হয়। বাংলার লাখো মুসলমান যখন নারীর ক্ষমতায়নকে হারাম মনে করে, নারীর নেতৃত্বকে মানতে চায় না সেখানে সামান্য তিলকে তাল করবে এটাই স্বাভাবিক। রোকেয়া নারীশিক্ষার আন্দোলন শুরু করার পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি শুরু হয়েছে! ভাবা যায়, কতোটা সুচিন্তিত পরিকল্পনায় এটি গড়ে তোলা হয়েছিল!

পঁয়ত্রিশ হাজার মেয়ের মধ্যে একশজন বখে গেলে কী করার আছে? দু চারজন জোছনাকে লাইট বললেই কি প্রেম থেমে থাকে? কতজন তো আবার জোনাকি পোকার তুচ্ছতার মধ্যেও অপূর্ব জীবনের দেখা পায়। ইডেনের কতজন তো আমার শিক্ষার্থী। আমি তাদের চিনি। তারা যারতার রুমে বললেই যাবে না। কোনো চাপেই না। এখানে এমন অনেক মেয়ে পড়ে যার শুচিতা শুভ্রতা সম্পর্কে আপনি কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। অথচ আপনি সবাইকে একবাক্যে নটি / বেশ্যা বলছেন! বাংলার নারীর উন্নতি এদেশের পুরুষরা কোনোদিনই মেনে নিবে না। সেটা হাফপ্যান্ট পরাই হোক, আর ফুলপ্যান্ট পরাই হোক!

এবার প্রগতিশীল দেশের একটি গল্প বলি : আমেরিকায় একবার এক ফ্লাইট শুরুর আগে আগে একটি জরিপের জন্য ঘোষণা হলো বিমানটি চালাবেন একজন নারী পাইলট! এ কথা শোনার পর পরই পঞ্চাশ ভাগ যাত্রী নেমে গেলো! নারী পাইলটকে তারা বিশ্বাস করতে পারল না। এমনকি অনেক নারী যাত্রীও নেমে গেলো! আমাদের মানে পৃথিবীর সকল মানুষের মনে নারীবিদ্বেষী মনোভাবটা এতোই প্রগাঢ় যে এটা দূর করা এতো সহজ নয়।

ইডেন শব্দের অর্থ নন্দনকানন। লঙ্কায় রাম লক্ষ্মণ প্রবেশ করলে মেঘনাদ ভর্ৎসনা করে আক্ষেপ নিয়ে বলেছিল : ‘নন্দনকাননে ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্লকমলে কীটবাস?’ সাম্প্রতিক সময়ে যারা ইডেনকে কলঙ্কিত করেছে তাদের কীট মনে করছি। এসব দুরাচার দৈত্য তাড়াতে না পারলে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি বিবেকবানদের আস্থা হারাবে।

আপনি কি জানেন- ইডেনে পড়া একজন নারী বর্তমান পৃথিবীতে ক্ষমতাধর নারীদের একজন? তিনি বাংলাদেশের চারবারের প্রধানমন্ত্রী! আপনি কি প্রীতিলতা ওয়াদদেদাকে চেনেন? বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে যিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন আপনার, আমার জন্য? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রীতিলতার মতো গুণীজন ইডেন কলেজের ছাত্রী।

ইডেন কলেজটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ভাবতে হবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাপদাদার সম্পত্তি ভেবে যারা ইডেনে পদায়ন নিয়ে বের হতে চান না আজকের পরিস্থিতির দায় তাঁরাও এড়াতে পারবেন না!

ইডেন হয়ে উঠুক সত্যিকারের নন্দনকানন, নারীর যথার্থ ভূ- স্বর্গ।

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *