প্রথম পাতা » মতামত » বিশ্বকাপ ফুটবল , অলিম্পিক ও রাজনৈতিক বৈধতা: খেলার মাঠের বাইরের রাজনীতি

বিশ্বকাপ ফুটবল , অলিম্পিক ও রাজনৈতিক বৈধতা: খেলার মাঠের বাইরের রাজনীতি

World Cup and politics

বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা অলিম্পিককে আমরা সাধারণত মানবিক ঐক্য, ক্রীড়া নৈপুণ্য এবং বৈশ্বিক উৎসবের প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই মেগা ক্রীড়া আসরগুলো কেবল খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার (Soft Power), আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণ, জাতীয়তাবাদ উজ্জীবিত করা এবং রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে যেসব সরকার অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে থাকে, তারা প্রায়ই এসব আয়োজনকে নিজেদের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

এ কথা সত্য যে বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক আয়োজন কেবল অটোক্রেটিক রাষ্ট্রগুলোই করে না। গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে একটি প্রবণতা স্পষ্ট, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এসব মেগা ইভেন্ট আয়োজনের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী। কারণ, এই ধরনের আয়োজন সরকারের জন্য একদিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে দেশের জনগণের দৃষ্টি অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানবাধিকার, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন কিংবা শাসনব্যবস্থার সংকট থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে জাতীয় গৌরবের দিকে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে অনেক গবেষক “legitimacy through spectacle” বা প্রদর্শনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইতালি। সে সময় দেশটি ছিল বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে। ইতিহাসবিদদের মতে, মুসোলিনি বিশ্বকাপকে ইতালির জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একইভাবে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকও অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক প্রচারণার একটি বড় সুযোগ ছিল। যদিও সেই অলিম্পিকে আফ্রিকান-আমেরিকান অ্যাথলেট জেসি ওয়েন্স চারটি স্বর্ণপদক জিতে নাৎসি বর্ণবাদী মতাদর্শকে প্রতীকীভাবে চ্যালেঞ্জ জানান, তবুও জার্মানি এই আসরের মাধ্যমে নিজেদের আধুনিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় আর্জেন্টিনায়, যখন দেশটি সামরিক জান্তার অধীনে ছিল। সেই সময় হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধীকে গুম, নির্যাতন ও হত্যা করা হলেও বিশ্বকাপের উন্মাদনা অনেকাংশে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগকে মাঠের খেলায় কেন্দ্রীভূত করে। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় সামরিক সরকারের জন্য জাতীয় গর্বের এক বড় রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক সময়েও একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করে রাশিয়া। পশ্চিমা বিশ্বে দেশটির গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে রাশিয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। একইভাবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত বিশ্বকাপগুলোর একটি। অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও কাতার বিশ্বকাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে এবং বিশ্বের নজর কাড়ে। এটিই দেখায় যে একটি মেগা ক্রীড়া আসর আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনর্গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

Soft Power

তবে শুধু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও রাজনৈতিক প্রয়োজনে এসব আয়োজনকে ব্যবহার করে। উদাহরণ হিসেবে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের কথা বলা যায়। ব্রাজিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও বিশ্বকাপের আগে বিপুল সরকারি ব্যয়, দুর্নীতি এবং জনসেবায় অবহেলার অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। প্রতিবাদকারীদের একটি স্লোগান ছিল, “আমাদের স্টেডিয়াম নয়, হাসপাতাল ও স্কুল চাই।” অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও সরকার আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের জন্য বড় আয়োজন করলেও জনগণ সবসময় সেটিকে সমর্থন করে না।

একইভাবে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ আফ্রিকা মহাদেশের জন্য গর্বের বিষয় হলেও, পরবর্তীকালে অনেক অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেছেন, বিপুল অবকাঠামোগত ব্যয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ মেগা ইভেন্টের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে বিতর্ক সব দেশেই রয়েছে।

আগামী আয়োজনগুলোর দিকেও তাকালে একই চিত্র দেখা যায়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজন করছে। তিনটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও, এমন একটি আয়োজন জাতীয় ঐক্য, আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব। দেশটি ইতোমধ্যেই ফুটবল, গলফ, ফর্মুলা-১ এবং বক্সিংয়ে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এই কৌশলকে “sportswashing” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, অর্থাৎ খেলাধুলার মাধ্যমে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সমালোচনা থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ সরিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। যদিও সৌদি আরব এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের অবস্থান হলো, এসব বিনিয়োগ দেশকে আধুনিকায়ন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং পর্যটন সম্প্রসারণের অংশ।

অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো দেশ বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক আয়োজন করছে বলেই সেটি অটোক্রেটিক—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি আয়োজনের একমাত্র উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন, এটিও অতিসরলীকরণ হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যটন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার মতো বৈধ উদ্দেশ্যও এসব আয়োজনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু যখন একটি সরকার অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে থেকেও বিপুল ব্যয়ে মেগা ক্রীড়া আসর আয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

মোঃ আল-আমিন
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *