ফলের রাজা আম। জাতীয় ফল হিসেবে জায়গা না পেলেও, জাতীয় গাছ হিসেবে স্বিকৃতি পেয়েছে আম গাছ। সংস্কৃতে আম্র, বাংলায় আম, ইংরেজিতে ম্যাংগো, মালয় ও জাভা ভাষায় ম্যাঙ্গা, তামিল ভাষায় ম্যাংকে এবং চীনা ভাষায় ম্যাংকাও। আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা। সুস্বাদু ফলের তালিকায় আম প্রথম দিকেই আসে। আম অর্থ সাধারণ। ভারতে মাথাপিছু আম উৎপাদনের পরিমাণ ১১ কেজি, পাকিস্তানে ৬ কেজি এবং ফিলিপাইনে ৬ কেজি বাংলাদেশের দেড় কেজির মতো।
সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় আমের নাম আলফানসো। ভারতে উৎপাদিত এ জাতের এক কেজি আমের দাম ৪০০ রুপি। আমাদের দেশে আবাদ না হলেও ভারত থেকে সামান্য পরিমাণে আসে, আমাদের দেশীয় টাকায় প্রতি কেজি আমের দাম আসে প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ভারতের মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আলফানসো সবার সেরা। স্থানীয় ভাষায় এ আমকে বলা হয়, ‘কাকডি হাপুস’- অর্থ, কাগজের মতো পাতলা খোসা।
আমের আছে বাহারি নাম- চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, খীরসাপাত এ জাতীয় কিছু আম ছাড়া সব আমকেই গুটি জাতের আমের কাতারে ফেলা হয়। নামের তালিকায় আরো আছে- ফজলি, গোপালভোগ, মোহনভোগ, জিলাপীভোগ, লক্ষণভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, বোম্বাই ক্ষীরভোগ, মিছরিভোগ, সিঁদুর, গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশাভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালিভোগ, সুন্দরী, গোলাপবাস, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালাপাহাড়, মল্লিকা, আম্রপালি প্রভৃতি জাতের।
সাধারণের ফল আম। রসাল বা মধু ফলও বলা হয় আমকে। রামায়ণ ও মহাভারতে আম্রকানন এবং আম্রকুঞ্জ শব্দের দেখা মেলে। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে আম ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। বাংলাদেশে যেসব ফল উৎপন্ন হয় তার মধ্যে আমের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। আমের নানাবিধ ব্যবহার, স্বাদ-গন্ধ ও পুষ্টিমাণের জন্য এটি একটি আদর্শ ফল হিসেবে পরিচিত। তাই আমকে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশের মাটি, জলবাযু, আবহাওয়া সবই আমচাষের উপযোগী। দেশের প্রায় সব জেলায়ই আম ফলে। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমিতেও এখন মিষ্টি আমের চাষ হচ্ছে।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। ১৯৪৫ সালের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর মোট আম উৎপাদনের বেশির ভাগ এ দেশে উৎপাদিত হতো। ১৯৭৫ সালে ভারত, মেলাঙ্কা ও ব্রাজিলের পরই বাংলাদেশ আম উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে ছিল। এখন বাংলাদেশের স্থান ১৫-১৬টি দেশের নিচে।
পরিসংখ্যান বিভাগের এক হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর ফলন হচ্ছে ৮,০২,৭৫০ টন আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলায়ই কম বেশি আমের চাষ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র মতে, এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ হাজার ৪৭৫ হেক্টর, শিবগঞ্জে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর, গোমস্তাপুর উপজেলায় ১ হাজার ৬৯০ হেক্টর, ভোলাহাটে ১ হাজার ৬২৫ হেক্টর ও নাচোলে ৪৪০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। জেলায় প্রায় (কম বেশি)১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ লাখ ৬ হাজার গাছ আছে। জেলায় প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদিত হয়।
জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম কানসাট। সড়কপথে এটাই সবচেয়ে বড় আমের বাজার। কানসাটের বিস্তর এলাকা এখন আমের বাজার। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম এখান থেকে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, ফেনীসহ দেশের সর্বত্র। এরপরেই গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর বাজার আমের অন্যতম মোকাম। তবে এখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে উৎপাদিত গুটি আমের আধিক্যই বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রত্যেকটি পাইকারি আমের বাজারে ৪০ কেজিতে ১ মণের স্থলে ৪৫ থেকে ৫০ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম বিক্রি হয়। এটা শুধু পাইকারি ক্রেতাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রাজশাহীর প্রবেশদ্বার পুঠিয়ায় প্রবেশ করার পরপরই রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে বিশাল আম কেনাবেচা দেখেই বোঝা যায় এটিই বানেশ্বর আমের হাট। পুঠিয়ার বানেশ্বর আমের হাটে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পুঠিয়া ছাড়াও কাটাখালি, দুর্গাপুর, বাগমারা, বাঘা ও চারঘাট উপজেলার বিক্রেতারাও আম বিক্রি করতে আসেন এ হাটে। এ কারণে আম বেচাকেনায় ইতোমধ্যেই উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। জানা যায়, এই হাটে প্রতিদিন পাঁচ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়।
