তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমাদের এক ক্লাসমেট ছিল বয়সে আমাদের সবার বড়। চুরিধারির নানারকম কূটকৌশল ছিল তার মুখস্থ। টিফিনের সময় মেয়েদের কাছ থেকে টাকা তুলতো টিফিন কিনে দেবে বলে। আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়। এই বদের সাথে এতো দ্রুত আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কারণ আমি আজো বের করতে পারিনি। দুই টাকায় পাওয়া যেতো মজাদার কলিজার সিংগারা। দুই টাকায় টাটকা বাটারবন, এক টাকায় বাসিটা। টাকা খুব বেশি উঠতো না। পঞ্চাশ টাকা মিল করতেই আমাদের কালো ঘাম বের হতো। মেয়েরা টাকা আনতো কম, উপরন্তু আমাদের প্রতি অনাস্থা ছিল বেশি। আমরা প্রায়ই টাকা মেরে দিতাম। আমরা মানে মূল কাজটা করতো ও। আমরা দুই তিনজন ছিলাম ওর সাগরেদ। একদিন টাকা মেরে পরের তিন চারদিন ও আর স্কুলে আসতো না। আমরা চাপে পড়তাম। ও যে আমাদেরও ধোঁকা দিয়েছে এমন কিচ্ছা বলে জানে বাঁচতাম। মূলত টাকার ভাগ আমরা পেতাম না। পাঁচ দশ টাকার সিঙ্গারা, পুরি খাইয়ে বাকিটাকা নিয়ে ও চম্পট দিতো।
একদিনের ঘটনা। আমরা ঠিক করলাম সিনেমা দেখতে যাবো। তিনটায় শো আছে। স্কুলে টিফিন হবে একটায়। সবাই হাত চালালে আধা ঘণ্টায় ষাট টাকা ম্যানেজ করা সম্ভব। টিকেট রিয়ারটা পনের টাকা। যাওয়া আসা হাফ ভাড়ায় পাঁচ টাকাতেই হবে। নিজেদের কাছে যা আছে তা দিয়ে আঙ্গানি, সমুচা, সিঙ্গারা। সেদিন ছিলাম আমরা তিনজন। খুব দ্রুত টাকা তুলে ‘আল্লাহর নামে চলিলাম’ লেখা টেম্পুতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলে গেলো দ্রুত। আমাদের হাতে সময় আছে এক ঘণ্টারও বেশি। হলের সামনে নানা কিসিমের মানুষজন নানা ধান্দায় থাকে। এক লোক তিন কার্ডের খেলা চালাচ্ছিল। আমি দেখলাম টেক্কার কার্ডটার এক কোণা ভেঙে একজন রেখে দিল। পাশাপাশি তিনটা কার্ড। প্রতি কার্ডে টাকা ধরা যাবে। টেক্কায় যে যা ধরবে পাবে সে তার ডাবল। আমিতো টেক্কা দেখেছি! টাকা ধরলেই ডাবল! প্রথমবার দশ টাকা ধরে বিশ টাকা পেলাম। আজ রিয়ারে সিনেমা দেখব না। সিনেমা দেখলে ডিসিতেই দেখব। আবার কার্ড ফেলা হলো। একইভাবে একজন কার্ড ভেঙে আমাকে দেখালো। আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাঁপছি আর সব টাকা ধরে বসে আছি। কার্ড তোলা হলো। আমার শরীর শিরশির করে উঠলো। একটা চিকন ঘাম বেরিয়ে এলো মাথা বরাবর। কার্ড ভেঙে দেওয়া লোকটা লালদাঁত বের করে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বললো- ‘ধূর মিয়া তুমি খেলাই বুজো না।’
খেলা না বুঝলেও বুঝলাম ঐ লোকটা ওদেরই দলের। তিনজনের কেউ আমাকে কিছু বললো না। সবাই রেললাইন ধরে হাঁটা দিলাম। একজন এক লোকের কাছ থেকে রসিদা বিড়ি চেয়ে উদাস ভঙ্গিতে টানতে লাগলো। চারটার দিকে এলাকায় পৌঁছলাম আমরা। সিনেমা দেখা হলো না এই দুঃখে সবারই চোখে জল।
এবার শুরু হলো আসল সিনেমা! বুদ্ধি বের করা হলো- একজন এখন অভিনয় করবে। বই হারিয়ে গেছে। তাই বই কেনার জন্য টাকার দরকার। আমাদের পরিচিত একজনের বাবা ব্যাংকে চাকরি করেন। আমাদের ঐ ক্লাসমেট বন্ধু টাকাপয়সা উড়ায়। কোকাকোলার বোতল ঝাঁকিয়ে ছিপি খুলে ছেড়ে দেয় উপরে। সবটা পানীয় উপরে উঠে যায়। মজার দৃশ্য। প্রায়ই এই কাজটা ও করে। আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। একটু কোকাকোলা যদি মুখে পড়তো!
সিদ্ধান্ত হলো ওর বাবার কাছে গিয়ে দুঃখের ‘সিন’ করতে হবে। টাকা দিবে নিশ্চিত। ছয়টার শো ধরা কোনো ব্যাপারই না। এখন গরিব সাজবে কে? যেহেতু সবাই প্রকৃত গরিব তাই নকল গরিব পাওয়া কঠিন হয়ে গেলো। আমি প্রথমেই ‘না’ বলে দিলাম। পরীক্ষায় আমার খাতা দেখে লেখার একটা বিষয় ছিল বলে আমাদের ‘বড়বন্ধু’ আমাকে ঘাঁটাল না। বাকিজনই গরিবের অভিনয় করবে বলে সাব্যস্ত হলো। প্রথমে কোকাকোলা বন্ধুকে ঘুম থেকে ডেকে এনে বিষয়টা বলা হলো ভিন্নভাবে। ‘ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পানির পাইপ ফেটে গেছে। যে লোকের পানির পাইপ ফেটে গেছে সে মামলাও করতে পারে! সন্ধ্যার আগে জরিমানা না দিতে পারলে সমূহ বিপদ।’ আমাদের কোকাকোলা বন্ধু সব শুনে বললো- “এই কথা বললে আব্বু টাকা দিবে না। বইখাতার কথা বললে দিতে পারে। তোরা কেউ একজন আয়। একটু মিথ্যা বলতে হবে। জান বাঁচাতে মিথ্যা বলা যায়।”
আমরা দুজন পাশেই লুকিয়ে থাকলাম। যাকে পাঠালাম সে বিষণ্ন মুখে ফিরে এলো। আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি। সে আমাদের হাতে দেড়শ টাকা তুলে দিল। একটি একশ টাকার নোট, আরেকটি পঞ্চাশ টাকার। দুটোই চকচকে নতুন নোট! কিন্তু গরিবের অভিনয় সে এখনো ধরে রেখেছে কেন?
আমরা রওনা হলাম। ছয়টার শো যেন কোনোভাবেই মিস না হয়! আমরা সেদিন মনখারাপ করে পুরো সিনেমা দেখে বিষণ্ন মনে ফিরে এলাম। বিদায় বেলায় কেউ কারো সাথে কথাও বললাম না! সিনেমার কাহিনিও সবাই ভুলে গেলাম দ্রুত। সেদিনের পর আমি আর কোনোদিন টিফিনের টাকা তোলার দলে যাইনি।
আজ বইদিবসে কেন এই গল্প মনে পড়লো আমি জানি না। এই গল্পের সাথে সম্পৃক্ত কেউ এই গল্প কোনোদিনই পড়বে না!
(দ্যাশে একদিন বইদিবস ছিল। এখন লাভারস ডে আসছে। তাই গত বছরের লেখাটা রিপোস্ট করলাম। দ্যাশের লাভারসরা এসিরুমের কেএফসিতে বসে লদকা লদকি করুক। বই থাকুক ফুটপাতে! )
