প্রথম পাতা » শিক্ষা » শিরোনামহীন একজন আলোর ফেরিওয়ালা

শিরোনামহীন একজন আলোর ফেরিওয়ালা

A.K.M. Rezaul Karim

‘’Don’t judge a book by its cover’ জর্জ ইলিয়টের একটি বহুল প্রচারিত বিখ্যাত বাণী।বাল্যকালে পড়া শেখ সাদীর ‘পোষাকের গুণে’ গল্পটির মোরাল লেসনের মর্মানুধাবন করতে আমার উচ্চতর ডিগ্রিও ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য জীবনে এটিই আমার প্রথম ভুল নয়। ভুল জায়গায় ফুল দেয়ার খেসারত আমি নিযুতবার দিয়েছি।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পজিটিভ -নেগেটিভে রোলে বারবার শিরোনাম হওয়া ঐতিহাসিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, প্রখ্যাত সিভিল সার্ভেন্ট আকবর আলী খান সহ বহু কীর্তিমানের জন্মস্থান এই জেলার ভাটি অঞ্চল নবীনগর উপজেলা। তিতাস পাড়ে অবস্থিত সবুজে ঘেরা নবীনগর সরকারি কলেজের ছিমছাম ক্যাম্পাটি এ অঞ্চলের বাতিঘর।

পিএইচডি ছুটির পর এ কলেজে পোস্টিং নামক পেস্টিং হওয়ায় সত্যি বলতে মনটায় কবি গুরুর ‘সোনার তরী’র আষাঢ়ী সকল মেঘ ভর করেছিল। কি আর করা গরীবের শেষ সান্ত্বনা -আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন বাণীকে বক্ষে ধারণ করে পিএইচডির থিসিসকে সযতনে হৃদ প্রকোষ্ঠে বন্দী করে “চোখের জলে আমি ভেসে চলেছি, পথের দেখা আমি পথে নেমেছি…” নামক ছ্যাকা খাওয়া ব্যর্থ বাপ্পা রাজের মতো জিওগ্রাফি হাতড়িয়ে ডাক্তার বন্ধুকে নিয়ে কোনো এক সকালে নবীনগর কলেজ গেটে হাজির হলাম। বন্ধ গেইটের সামনে অনেকক্ষণ হর্ণ বাজিয়েও সাড়া না পেয়ে গেইটে প্রচন্ড জোরে দুই তিন ঘা লাগিয়ে সমস্ত রাগ তার উপর ঝাড়তে লাগলাম। দেখলাম তড়িঘড়ি করে শ্মশ্রুমন্ডিত খুবই সাদাসিধে পায়জামা পাঞ্জাবি পরা একজন প্রসারিত হাসি দিয়ে গেইটের তালা খুলছেন। তাকে প্রিন্সিপাল স্যার আছেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই আরো প্রসস্থ হাসি দিয়ে আশ্বস্ত করে বললেন- স্যার অফিসে আছেন, ভেতরে আসুন।

প্রিন্সিপাল স্যারের অফিসে ঢুকেই থ মেরে গেলাম। কারণ অধ্যক্ষের চেয়ারে গেইট খুলে দেয়া ভদ্রলোকটি বসে আছেন। নিমিষেই মনের সমস্ত রাগ নিশাদলের মতো উবে গেল এবং লজ্জায় উদ্ধতঃ শিরঃ নত হয়ে গেল। স্যারের পবিত্র স্মিত হাসিমাখা মুখখানা দেখে মায়া লাগলো। সেই থেকে কি এক মোহনীয় ভালো লাগায় পড়ে গেলাম। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষক পরিষদে আমি ও আমার পেড্রিয়াট্রিক কনসালটেন্ট বন্ধুকে বরণের সভার আয়োজন করলেন। এরপর ধীরে ধীরে অধ্যক্ষ স্যারকে আরো জানতে শুরু করলাম। স্যারও আমাকে আরো কাছে টানলেন। কলেজের যাবতীয় বিষয়াদি নিঃসংকোচে অকৃপণভাবে শেয়ার করলেন। আমিও সকল প্রকার ভালো প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ও সৃজনশীল কাজে সহযোগিতা করার প্রতিজ্ঞা করলাম।

স্যার একাডেমিক উন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাতদিন প্লান ও বাস্তবায়ন শুরু করলেন। প্রতিটি কাজে কলেজের সকল শিক্ষক-কর্মচারী নিরলসভাবে স্যারকে সহযোগিতা করছেন। ষাটের কাছাকাছি বয়সের একজন মানুষ এত পরিশ্রমী ও সৃজনশীল হতে পারেন অধ্যক্ষ একেএম রেজাউল করিম স্যারকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সকাল থেকে রাত- প্রতিটি পলে,নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে শুধুই নবীনগর সরকারি কলেজ। আমার বিশ্বাস এই কলেজের প্রাক্তন সহকর্মীরা এখন আসলে পূর্বের চিত্রের সাথে মেলাতে পারবেন না।

নির্লোভ শিক্ষার্থী বান্ধব এই মানুষটি ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর যাতে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ না পড়ে কলেজের যৌক্তিক অনেক ফিও প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।প্রতিটি ক্লাস কার্যকরভাবে অনুষ্ঠানের জন্য মৌমাছির মতো সারাক্ষণই কলেজ ক্যাম্পাস চষে বেড়ান। তবে মৌমাছি প্রতিটি ফুল হতে মধু সংগ্রহ করে আর কলেজ পাগল এই স্যার প্রতিটি ফুলে মধু সরবরাহ নিশ্চিত করেন।

সর্বদা পজিটিভ মাইন্ডসেটের এই শিক্ষাবিদ গঠনমূলক কোন কাজে না বলেছেন এমন রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার বিশ্বাস আরো কিছুদিন যদি এই আলোর ফেরিওয়ালা এই বিদ্যাপীঠে থাকেন, সকলের সহযোগিতায় নবীনগর সরকারি কলেজ এ অঞ্চলের একটি অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ এই স্বচ্ছ হৃদয়ের শিক্ষাবিদকে সকল প্রকার সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি দান করুন।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Dr. Salah Uddin Afsar
ড. মোঃ সালাহ উদ্দিন আফছার
ড. মো. সালাহ উদ্দিন আফছার মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত ইউনির্ভাসিটি কেবাংসান (ইউকেএম) হতে মেটাম্যাটিরিয়াল ব্যবহার করে এনার্জি হার্ভেস্টিং পদ্ধতি নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নাল (Q1,Q2) এ তাঁর গবেষণা বিষয়ে ১৪ রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২৪তম বিসিএস-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ঢাকায় কর্মরত আছেন।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *