প্রথম পাতা » শিক্ষা » শিক্ষক আমি সবার সেরা!

শিক্ষক আমি সবার সেরা!

Teaching

একটা ভুয়া শিরোনাম দিয়ে লেখাটি শুরু করলাম। বাংলাদেশে শিক্ষক সম্প্রদায়কে যাবতীয় নিপীড়নের ও বঞ্চনার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে এই বাক্য। এই সমাজ, রাষ্ট্র কোনোকালে শিক্ষক চায়নি, এখনো চায় না। এদেশ শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় ও মোহনীয় করতে পারেনি কোনোকালে। দু চারটি ব্যতিক্রম বাদে এদেশে বাধ্য হয়ে শিক্ষকতার পেশাকে বেছে নেয় অনেকে। অতি মেধাবীরা শিক্ষক হয় না, হতে চায় না।

সুযোগ পেলে এদেশ থেকে মেধাবীরা চলে যায়। অনেকে এটাকে ‘মেধাপাচার’ বললেও আমি বলি ‘কায়দা করে বেঁচে যাওয়া’। এভাবেই চলছে এবং চলবে। অতি নিকট ভবিষ্যতে আমরা সবকিছুর মতো হয়তো প্রকৃত বুদ্ধিজীবীও ভাড়া করে আনব। কারণ, যে দেশে জ্ঞানীর কদর নেই সেদেশে তো জ্ঞানী জন্মায় না।

বর্বরতার যুগে জন্মেছিলেন সক্রেটিস। জ্ঞানসমুদ্র সক্রেটিসকে সেকালে নাস্তিকতার অভিযোগে হেমলক পানে হত্যা করেছে সমাজ-রাষ্ট্র। প্রকৃত জ্ঞানতৃষ্ণার সাক্ষাৎ দিতেন তিনি। সত্যকে খুঁজে বের করার পথের সন্ধান দিয়েছেন। যুবসমাজকে সত্য ও সুন্দরের অনুসন্ধানী করে গড়ে তুলতে গিয়ে বিরাগভাজন হয়েছিলেন ধর্মহীন ধার্মিকদের। ফলে, মৃত্যুই ছিল তাঁর অনিবার্য সত্য। কিন্তু এখন আমরা কোন যুগে বাস করছি? সক্রেটিসের কালে তো নয়।

একজন হৃদয় মন্ডল। বিজ্ঞানের শিক্ষক। বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত বাহাস রয়েছে। তাঁরই এক ছাত্র কৌশলে হৃদয় মন্ডলের কিছু বক্তব্য রেকর্ড করেছে। পুরোটা আমি পড়েছি। এবং আশ্চর্য হয়েছি এই ভেবে যে, অতি অল্প টাকায় জীবন পরিচালিত করা একজন প্রকৃত শিক্ষক এখনো এদেশে আছেন! আমার মনে হয় হৃদয় মন্ডলের মতো মুক্তমনের প্রকৃত শিক্ষক আজো আমাদের দেশে আছে অনেক। তবে এই ঘটনার পর আর কোনো হৃদয় মন্ডল ধরা দেবেন না। গুরুমারা শিষ্য এদেশে অনেক আছে। সেই ছাত্রটি হতে পারতো হৃদয় মন্ডলের মতো সত্যসন্ধানী এক জ্ঞানপিপাসু। সক্রেটিস যেমন নির্মাণ করেছিলেন প্লেটোকে, প্লেটোর ফসল এরিস্টটল, এরিস্টটলের ছাত্র আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। অথচ হতভাগা সেই ছাত্রটি তার শিক্ষককে ধরিয়ে দিয়েছে। ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে হৃদয় মন্ডল এখন শ্রীঘরে।

আমাদের প্রচ্চুর ধর্মানুভূতি! আমরা রোজায় সব জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিলাম। ২০ টাকার বেগুন এখন ৮০ টাকা! দশ টাকার লেবু ৩০ টাকা! ২৫ টাকার শশা ৬০ টাকা!

ধর্মহীন ধার্মিকের দেশে শিক্ষকরাই বারবার হাতকড়া পরে! নারায়ণগঞ্জেও পরে, মুন্সিগঞ্জেও পরে! ব্যবসায়ীদের এখানে পোয়াবারো, রাজনীতিবদদের লাড়ে লাপ্পা!

আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। গ্রামগুলো শহর হয়েছে। অশিক্ষিত মানুষের হাতে টাকা হয়েছে অনেক। বগুড়ায় সেদিন এক শিক্ষিকাকে দৌঁড়ানি দিল, তার শাড়ী ধরে টান দিলো এক লম্পট অভিভাবক। কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখিনি। শরীয়তপুরে এক বিসিএস শিক্ষক-কর্মকর্তাকে লাথি কিল ঘুষি মারল ছাত্র নামের সন্ত্রাসীরা। দেশের সুশীল ও বুদ্ধিজীবী মহল চুপ থাকল।

যশোরে এক প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি ও অকথ্য গালাগাল দিলো তাঁরই সাবেক ছাত্র। ম্যানেজিং কমিটির বর্বরগুলো প্রতিদিন শিক্ষকদের নিপীড়ন করে। এদেশে সবার টার্গেট শিক্ষকরা। সেদিন এক পুলিশ সদস্য টিপ পরাকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষিকাকে হেনস্তা করল। মেরে ফেলার জন্য আক্রমণ করল। সারাবছর পুলিশকে গালি দেওয়া তাওহিদি ভায়েরা পুলিশটিকে ভায়রা বানালো আজ। দাঁড়ি পেলেই একদল লোক এদের জন্য ডিফেন্ড করে। এরা তো মাওলানা মামুনুল হককেও ডিফেন্ড করল। পরে বউ বের হলো একে একে তিনটি! এরপর সব কীভাবে যেন জায়েজ হয়ে গেলো!

জন্মগত ভাবেই বাঙালি সংকর জাতি। সুতরাং রঙ্গ ভরা বঙ্গ দেশে বহু বিচিত্র রূপধারী মানুষ নতুন নয়। এদেশের সাহিত্য পাঠ করলেও শিক্ষকদের পরিচয় পাবেন। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষকরা ভাঙা ছাতা নিয়ে চলেছেন সারাজীবন। বিদ্যাসাগর শিক্ষকদের ঠ্যাঙানি খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। তাঁর কথা আজ বাস্তবসত্য। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে, গল্পে, সিনেমায় প্রায় সব শিক্ষকই বেশি কথা বলে, আধা পাগল, বিএ, বিএড গোল্ড মেডেলিস্ট এইসব শিক্ষকরা তৃপ্তি পান অতীতচারী হয়ে! কবে কোনযুগে তার এক ধমকে দারোগার হাতের লাঠি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল! সেই গল্প তিনি করে বেড়ান যত্রতত্র! আহারে অসহায়ত্ব!

যদি শিক্ষক হয়ে থাকেন তবে চাকরি করেন। সক্রেটিস হতে যায়েন না। পড়াবেন, এ প্লাস পাইয়ে দিবেন, ডাক্তার বানাবেন, ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন আর মাঝে মাঝে মাইর খাবেন ( মাইরের মইদ্যে নাকি ভাইটামিন আছে?)।

আপনার শিক্ষক হওয়ার দরকার নেই। আপনার কাজ পড়ানো। পড়ান। আমাদের সন্তানদের জন্য ধর্মীয় বই আছে, ওয়ায়েজিনে কেরামরা আছেন, তাঁরাই শেখাবেন কীসে কী হয়! যেদেশে জাতীয় গাছে জাতীয় ফল পাওয়া যায় না সেদেশে শিক্ষকদের শিক্ষকতা করা নিষ্প্রয়োজন।

সবশেষে, হৃদয় মন্ডলের মুক্তি চাই। শিক্ষক নিপীড়কদের শাস্তি চাই।

জয় বাংলা

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *