প্রথম পাতা » মতামত » কী পেলাম, কী হারালাম!

কী পেলাম, কী হারালাম!

Bangladesh now and before

লোকজ প্রবাদ আছে : যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ! কেমন আছে বাংলাদেশ? বুকে হাত দিয়ে কতোজন মানুষ বলতে পারবে যে ন্যূনতম সুযোগ থাকলে তারা দেশ ত্যাগ করবে না?

বাংলাদেশে একটি শিশু জন্ম নেয় অনিশ্চিত ভবিষ্যত, অনিরাপদ পরিবেশ, উচ্ছৃংখল জনজীবনকে সামনে নিয়ে। তার পদে পদে অবহেলা। পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্র পর্যন্ত শিশু খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান অর্থাৎ সমস্ত মৌলিক উপাদান ও অধিকারের বিষয়ে চরম উদাসীন। একটি দেশে হামের মতো সাধারণ একটি রোগে ৬০০ শিশু মৃত্যুবরণ করে কাদের অবহেলায়? তারা কি কোনোদিন শিশুহত্যার দায়ে দণ্ডিত হবেন? কোনোদিন কি তারা জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন? জাতি কি তাদের নির্লজ্জ ও ঘৃণিত হত্যাকাণ্ডের অপরাধকে ক্ষমা করবে? গত এক বছরে শিশুহত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকারের চিত্রগুলো কী বার্তা দেয়? এদেশে সবচেয়ে রুগ্ন জনগোষ্ঠী শিশুরা, সবচেয়ে অসহায় শিশুরা, সবচেয়ে অনিশ্চিত তাদের জীবন।।

নিজেদের ভাগ বাটোয়ারার সুবিধা, ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান, দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ বানানোর চক্রান্ত কি চলমান নয়? দেশের ক্রিকেট কোথায় গেলো? ফুটবল? অথচ এখন তো দুর্নীতিমুক্ত নিষ্কলুষ একটি অধ্যায় গড়ার কথা ছিল। এ জগতে কোনো সফলতা কি আছে? ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে সাকিব, মাশরাফির মতো বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়কে ক্রিকেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। কতোগুলো কাগুজে বাঘ, বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো কুলাঙ্গাররা হলো দেশের মা বাপ, জাতির মুখপাত্র! ফুয়াদের মতো থার্ড ক্লাস রাজনীতিবিদ, জনপ্রত্যাখ্যাত, বটতলার ব্যারিস্টার ক্রিকেটের ছবক দেয়! এদেশের বিশ্বায়নে একজন সালাউদ্দিন আম্মার আর একজন মাশরাফির অবদান কতটুকু? অথচ সেদিন মাশরাফির সেই বিধ্বস্ত পোড়াবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সালাউদ্দিন যে ভাষায় ও অঙ্গভঙ্গিতে কথা বলেছে তা কি সুস্থ সমাজ গঠনের লক্ষণ? এদেশে ঘৃণিত, দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা কি রাজনীতির সুযোগ পায়নি? তারা সংসদে যায়নি? মাশরাফি কি রাজাকার আল বদর আল শামসদের চেয়েও অপরাধী? অপরাধী হলে প্রচলিত আইনে তাকে ফাঁসি দেন। সে বাইরে কেন?

আসাদুজ্জামান নূর, মমতাজের মতো গুণী শিল্পীদের জীবন এখন দুর্বিসহ। এরাও কি খুনী? অথচ আসল খুনীরা তো প্রকাশ্যে। ডা. প্রাণ গোপালের মতো বিশ্বখ্যাত ডাক্তার আজ ফেরারী। তিনিও নাকি খুনী! এদেশ গঠনে যারা অসামান্য অবদান রেখেছিলেন তারাই এখন সবচে অপমানিত, অবহেলিত, নির্যাতিত। একটি গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিষোদগার করছে একাত্তর নিয়ে। অথচ জাতির শোণিতে, অস্থিতে চির অম্লান মুক্তির সংগ্রাম। মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েলদের জায়গায় মধ্যমণি এখন তাসনিম ঝুমা ঝামা পারুল পার্বতী ধইনচারা। হায়রে অভাগা জাতি!

এদেশে গত এক বছরে কতগুলো হত্যার বিচার হয়েছে? আছিয়া, রামিসার প্রতি নৃশংসতায় পুরো দেশই তো কেঁদেছে। এখনো বিচার কি পেয়েছে এই জাতি? রামিসার হত্যাকারীর পক্ষেও যে দেশের উকিল দাঁড়ায় সে জাতির ফিউচার বলতে জ্যোতিষী হতে হবে?

ক্রিকেট, সিনেমা, গান, শিল্প, সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধেয়ে আসছে প্রচণ্ড মৌলবাদী অপঘাত। কারণ তারা মনে করে এগুলো হারাম। সুতরাং এগুলোর সাথে যারা সম্পৃক্ত তারা হলো কালচারাল ফ্যাসিস্ট! বাহ! দারুণ ন্যারেটিভ! দেশে এতোগুলো শিশুর মৃত্যু, খুন, ধর্ষণ, বলাৎকারে কোনো ধর্মীয় সংগঠন রাস্তায় নামেনি। তারা নেমেছে একটি সিনেমাকে কেন্দ্র করে। রুমিন ফারহানা আজানকে সুমধুর ধ্বনি বলেও ফেঁসে গেছেন! তিনি নাকি ধর্ম অবমাননা করেছেন! তালি বাজান। ধর্ম অবমাননা কী জিনিস শিখে নেন।

কথায় কথায় বাউলকে মারেন, তাদের ধরেন, মাজার ভাঙতে গিয়ে সুফিবাদের কবর দেন অথচ এদের কেউ তো খুন, ধর্ষণ, শিশুহত্যা, মবসন্ত্রাসের সাথে জড়িত নন। কোনো ফকির কি শিশু বলাৎকার করেছে? কোনো বাউল কি খুন-ধর্ষণ করেছে? অথচ যারা ধর্মীয় শিক্ষা দিতে গিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে বিকৃত যৌনাচারের হাতিয়ার বানাচ্ছে তাদের প্রতি কি ব্যবস্থা নেবে দেশ?

আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই। যাদের এদেশেই থাকতে হবে তাদের হয় ধর্ষণকে উপভোগ করতে হবে নয়তো গলায় ফাঁস দিতে হবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখা ছাড়াও আর কোনো উপায় দেখছি না। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে থেকেছেন। তাদের জীবনমান প্রত্যক্ষ করেছেন। আশা করি তিনি আমাদের কষ্ট বুঝবেন।

এই জাতি শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির সকল দিক দিয়েই ধ্বংসের দিকে ধাবমান। আমাদের লাইব্রেরি, শিল্পকলা, নাট্যশালা, থিয়েটার, সিনেমা সবকিছুকে গ্রাস করেছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। এগুলোকে উদ্ধার করতে না পারলে এই জাতি আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ব্যতীত কোনো প্রজন্মকেই রক্ষা করতে পারবেন না।

একটি জাতির সুর যখন বন্ধ হয় তখনই অসুরের জন্ম হয়।

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Sujon Hamid
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *