প্রথম পাতা » মতামত » ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছেঃ মৃত্যুকূপ থেকে তুলে মোহরানা

ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছেঃ মৃত্যুকূপ থেকে তুলে মোহরানা

Women in Islam

পরিবারে নারীর ভূমিকা যেমন অপরিসীম তেমন সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। ইসলামে নারীর সম্মান, মর্যাদা, অধিকার সংরক্ষণে অত্যাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নারীর সম্মান, মর্যাদা, অধিকার সংরক্ষণে একটি পৃথক সূরা আন্-নিসা নাজিল করেছেন এছাড়াও পবিত্র কুরানের অন্যান্য সূরা এবং হাদীসে এ বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

পবিত্র কুরানের সূরা নিসার ১৯ নং আয়াতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নারীদের প্রতি সদাচারণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে ঘোষণা করেছেন “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদাচারণ কর।”

মহান আল্লাহ নারীর অধিকার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সূরা বাকারার ২২৮ নং আয়াতে আরো ঘোষণা করেছেন “নারীদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে পুরুষদের, তেমনি রয়েছে পুরুষদের উপর নারীদের অধিকার”।

সমমর্যাদার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সূরা নিসার ১২৪ নং আয়াতে আল্লাহ আরো ঘোষণা করেছেন “পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে কেউ সৎকাজ করলে ও মুমিন হলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও জুলুম করা হবেনা।”

অধিকার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সূরা নিসার ৩২ নং আয়াতে আরো ঘোষণা এসেছে “তোমরা সেসব কিছুর আকাঙখা করোনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের একজনকে অন্যজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ তারা যা উপার্জন করে তা থেকে এবং নারীদের জন্য রয়েছে অংশ তারা যা উপার্জন করে তা থেকে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে তার অনুগ্রহ চাও। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।”

আবার আল্লাহ তায়ালা বলেন “হে মুমিনগন জোর করে নারীদের উত্তারাধিকারী হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদের অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যান রাখবেন। আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রীকে বদলাতে চাও, আর তাদের কাউকে তোমরা প্রচুর ধনসম্পদ দিয়ে থাকো, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু গ্রহন করোনা। অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে কি তোমরা তা গ্রহন করবে? আর তোমরা তা কিভাবে গ্রহন করবে অথচ তোমরা একে অপরের সাথে একান্তভাবে মিলিত হয়েছ; আর তারা তোমাদের থেকে নিয়েছিল দৃঢ় অঙ্গীকার?” ( সূরা নিসা ১৯-২১)

নারীদের সম্পদের উত্তারাধিকারী ঘোষণা করে সূরা নিসার ৭ নং আয়াতে ঘোষণা করেন মহান আল্লাহ “পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক বা বেশিই হোক, এক নিধার্রিত অংশ।”

আল্লাহ তায়ালা সূরা আহজাবের ৩৫ নং আয়াতে বলেন “নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যর্শীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়াম পালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্বরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।”

আল্লাহ তায়ালা মোহরানা বিষয়ে নারীদের একচ্ছত্র অধিপত্য ঘোষণা করে সূরা নিসার ৪নং আয়াতে বলেন “আর তোমরা নারীদের সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তা থেকে খুশি হয়ে তোমাদের জন্য কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা স্বানন্দে গ্রহন কর।”

মোহরানা বিষয়ে মহান আল্লাহ আরো বলেন “তোমাদের কোন অপরাধ নেই, যদি তোমরা স্ত্রীদের এমন অবস্থায় তালাক দাও যে, তোমরা তাদের স্পর্শ করোনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নিধার্রণ করোনি। আর উত্তমভাবে তাদের ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে আর গরিবের উপর তার সাধ্যানুসারে। সৎকর্মশীলদের জন্য এটি আবশ্যক। আর যদি তাদের স্পর্ষ করার পূর্বে তোমরা তালাক দাও এবং তাদের জন্য কিছু মোহর নিধার্রণ করে থাক, তাহলে উক্ত মোহরের অর্ধেক দিয়ে দাও। তবে যদি স্ত্রীরা মাফ করে দেয় কিংবা যার হাতে বিবাহের বন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়। আর তোমাদের মাফ করে দেওয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর। আর তোমরা পারস্পরিক অনুগ্রহ ভুলে যেওনা। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা বাকারা আয়াত ২৩৬-২৩৭)

আল্লাহ তায়ালা দাম্পত্য জীবনে কোন সংকটের আশংকা করলে পুরুষের ন্যায় নারীকেও মিমাংসার অধিকার দিয়ে মর্যাদার আসনে অধিষ্টিতি করেছেন সূরা নিসার ১২৮ নং আয়াতে “যদি কোন নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে কোন দূর্ব্যবহার কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তাহলে তারা উভয়ে কোন মীমাংসা করলে, তাদের কোন অপরাধ নেই। আর মীমাংসা কল্যাণকর; তবে মানুষের মধ্যে কৃপনতা বিদ্যমান রয়েছে। আর যদি তোমরা সৎকর্ম কর এবং তাক্ওয়া অবলম্বন কর তবে তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।”

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কন্যা সন্তানকে জীবননাশের থেকে রক্ষা করতে সূরা নাহলের ৫৮-৫৯ নং আয়াতে বলেন “ আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে জাতির কাছ থেকে আত্নগোপন করে। অপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা সিদ্ধান্ত নেয়, তা কতই না মন্দ!”

আইয়ামে জাহিলিয়্যার যুগে কন্যা সন্তানের জন্মদান করাকে অপমানজনক মনে করা হতো এবং স্বগোপনেই মাটিতে পুতে ফেলতো আর মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে সেই নারীকে করলেন সম্মানিত। বিশ্বনবী সা. নারীর সম্মান দিয়ে ঘোষণা করেছেন “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।”

আল্লাহ মুমিন নারীদের অপবাদকারীদের অভিশপ্ত বলে ঘোষণা করেছেন “যারা সচ্চরিত্র সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা নুর আয়াত-২৩)

আল্লাহ তায়ালা ভালবাসা ও প্রশান্তির উৎস হিসাবে নারীকে ঘোষণা করেছেন “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের থেকে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে সে জাতীর জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (সূরা রুম আয়াত ২১)

আবার কোন এক সাহাবী রাসুল সা. কে প্রশ্ন করলেন ইয়া রাসুল সা. আল্লাহর পরে আমি সবচেয়ে বেশি কার খেদমত করব রাসুল সা. বললেন তোমার মার, সাহাবী আবার প্রশ্ন করলেন তারপর কার রাসুল সা. আবার বললেন তোমার মার এবং তৃতীয় বারও তিনি মায়ের কথা বললেন চতুর্থবার একই প্রশ্নের জবাবে বাবার কথা বললেন।

শিক্ষার ক্ষেত্রে রাসুল সা. ঘোষণা করেছেন “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ।” এছাড়া বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে ইসলাম নারীর সম্মানার্থে পুরুষের নারীকে মোহরানা এবং ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব করেছে। ইসলাম নারীকে মযার্দার যে আসনে আসীন করেছে সেটি সমুন্নত রাখা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। যারা নারীর সম্মান কেড়ে নিতে চায় তারা ইসলাম তথা বিশ্বমানবতার শত্রু। প্রত্যেকেরই নারীর যথাযথ মর্যাদা প্রদানে সর্বদা সচেতন থাকা একান্ত প্রয়োজন।

মুহাম্মদ আল্-হেলাল
এমফিল গবেষক(এবিডি)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
+৮৮০ ১৯১১ ৯৮১১৪৪
alhelaljudu@gmail.com

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

মুহাম্মদ আল্-হেলাল
মুহাম্মদ আল্-হেলাল
এমফিল গবেষক (এবিডি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *