প্রথম পাতা » গল্প » জীবন জ্যামিতির নীল ক্যানভাস

জীবন জ্যামিতির নীল ক্যানভাস

Unlucky boy

কৃষি নির্ভর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে পরপর দু’টি মেয়েসন্তানের পর জন্ম নিলো কাঙ্খিত এক পুত্র সন্তান। সকল অগ্রজ মায়ের মতো দুধে-আলতা গাত্রবর্ণ নিয়ে জন্মালেও ফাল্গুনের শুক্লপক্ষের  মোম-কোমল শুভ্র জোৎস্নার এক রাতে শ্যামবর্ণ পিতার চেয়ে আরেক ডিগ্রি বাড়তি কৃষ্ণবর্ণ নিয়ে সদ্য ধরায় পা রাখলেন এক নবজাতক। এ যেন জন্মকুষ্টির গুষ্ঠি কিলিয়ে চাঁদের ওপর এক টুকরো মিশকালো মেঘের হানা। দাদী-ফুপিরা নিজেদের গাত্রবর্ণ বেমালুম ভুলে সদ্য প্রসূত এঁড়ে বাছুরটির গায়ের রঙ নিয়ে আঁতুড়ঘরের প্রসূতির দিকে একের পর এক বাঁকা কথার তীর ছুঁড়তে ব্যস্ত।নিজের গায়ে সকল তীর নিয়ে দুখীনি মা তার কালো মানিককে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে রাখতেন। শিশুটির জন্মের ফাগুনের ফুলফোটা সুবাসিত ঐ দিনে মা-বাবা ছাড়া আর কেউ খুশি হয়েছিল কিনা ইতিহাসে সন্দেহ থেকেই যায়। বাবা ক্ষীণকায়ার এই অপুষ্ট শিশুটির নাম রাখলেন তৃতীয় ক্রসেডের সিপাহশালার কুর্দিবীর সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর সাথে মিল রেখে।অনেকটা তালপাতার সেপাইকে অর্ধমণ ওজনের তলোয়ার ধরিয়ে দেয়ার মতো। ভাগ্যস্রষ্টা ছেলেটির ভাগ্যলিপি লিখা সমাপ্ত করার আগে বড্ড তাড়াহুড়ো করে সম্ভবতঃ  পৃথিবীতে চলে এসেছিল।

জন্মের পরপরই বিলুপ্তপ্রায় গুটি বসন্তে টিকে থাকতে শিশুটিকে দিতে হয় এক কঠিন পরীক্ষা!সেই যাত্রায় কোনোরকম বেঁচে গেলেও সকল অগ্রজরা গ্রেপ ওয়াটার (সেই সময়ে নেটালদের খাওয়ানো হতো) খেয়ে বেড়ে উঠলেও চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষের কঠিন দূর্দিনে শিশুটি মায়ের বুকের দুধ ও মিছরির পানি খেয়ে শম্বুক গতিতে বেড়ে উঠতে থাকে। শিশুটির নানার বাড়ির রীতি অনুযায়ী বছরের একটি বিশেষ মাসে পুরো পরিবারকে মামারা এসে নাইওর নিয়ে যেতো। হাঁটিহাঁটি পা পা হতে সদ্য ভালোভাবে হাঁটতে শুরু করা চঞ্চল বালকটির দূরন্তপনা সবাইকে হাঁফিয়ে তুলেছিল।

বাবা মা সব সময় তাকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকতেন।কারণ তাঁদের দৃষ্টি একটু এদিক-ওদিক হলেই সে একটি অঘটন ঘটিয়ে ফেলতো। একদিন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে রাত আটটা কিংবা ন’টার সময় পঞ্চাশ পয়সার একটি আধুলি নিয়ে বাড়ির পাশের দোকানে চলে যায়। সেই পয়সায় পকেটভরে মুড়ি আনার সময় ছাড়াবাড়ির (পরিত্যক্ত জঙ্গল বাড়ি) ঝোপ থেকে মচমচ শব্দ করে হঠাৎ একটা কুকুর বেরিয়ে এলে ভয়ে ছেলেটির বিকট চিৎকারে বাড়ির সবাই ছুটে আসে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ছেলেটি হিসু করে পরনের হাফপ্যান্টটি ভিজিয়ে ফেলে। সবাই চোখ  ছানাবড়া করে একের পর প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন। ভুত দেখেছিস! গায়ে কালো পশম ছিল? নখ-দাঁতের আঁচড় লাগেনি তো! শিশুটির মা হায় হায় রব তুলে জড়িয়ে ধরে বললেন- আর একটু হলেই আমার ছেলেটাকে পরী গাছের উপর তুলে ফেলতো! এর আগেও নাকি ছেলেটি একটি গাছের মগডালে উঠে বসেছিল। পাশ থেকে বাবা আফসোস করে বললো- এই তো সেদিন আরেকটু হলেই আমার ছেলেটাকে দীঘির দানবটা  পাতালে টেনে নিয়ে যেতো। ভাগ্যিস পা না ধরে পরনের লুঙ্গি ধরে টান দিয়েছিল বলে লুঙ্গি নিয়েছে বটে সেই যাত্রায় ছেলে আমার বেঁচে ফিরেছিল। প্রকৃত ঘটনা হলো- ছেলেটি তার বন্ধুদের সাথে দীঘির মাঝজলে ডুব-লুকোচুরি খেলছিল।সাতারের এক পর্যায়ে গিট খুলে লুঙ্গিটি পানিতে তলিয়ে যায়। বন্ধুরাসহ অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেটি না পেয়ে অগত্যা লুঙ্গি ছাড়াই তাকে বাড়িতে ফিরতে হয়েছিল। গ্রামে রটে যায় যে, ছেলেটি লুঙ্গির কারণেই অল্পের জন্য বেঁচে যায় না হয় পাতাল্পুরির দানবের আহার হতো। বাতাসের বেগে ছড়ানো সেই সংবাদ শুনে তার বড় বোন শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ কাঁদতে কাঁদতে চলে এসেছিল।

ঘরে পোষা গাই গরুর দুধের সাথে বাজার হতে পাঁকা কলা কিনে শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে দেয়া ছিল বালকটির বাবার নিত্যদিনের কাজ। একদিন বাবাটি দুধ-কলার সাথে তার প্রিয় সুপার বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে হাজির হলেন। চঞ্চল বালকটি বাবার হাত থেকে বিস্কুটের প্যাকেট কেড়ে নিয়ে উঁচু পুকুরপাড়ে খেলারত সমবয়েসিদের সাথে খেলায় যোগ দিল। খেলার সময় হঠাৎ করে সাতার না জানা বালকটি পাড় হতে গড়িয়ে পুকুরে পড়ে যায়। প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করার সময় পুকুরে ভিজিয়ে রাখা ধারালো বাঁশের কঞ্চির আঘাতে ছেলেটির বাম হাতের শিরা ধমনীসহ মাংস ছিঁড়ে বগলে চলে আসে। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে এক পর্যায়ে ক্লান্ত বালকটি বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে স্রষ্টার কাছে সঁপে দিয়ে ব্যথাহীন এক স্বর্গীয় সুখ অনুভব করতে লাগলো এবং আস্তে আস্তে পানির তলদেশের দিকে ছুটে চললো।

সহপাঠিদের চিৎকার শুনে রান্নাঘরে থাকা টুনি খালা নামে কেউ একজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে উদ্ধার করে চিৎকার করে বালকটির মা আফিয়াকে ডাকতে থাকে। পাগলের মতো ছুটে গিয়ে মা বাবা তার রক্তাক্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে আকাশভাঙা আহাজারি করতে করতে হাসপাতালে ছুটে যান। ডাক্তার ছিঁড়ে যাওয়া ত্বক ও ধমনীকে জোড়া দিতে গেলে ব্যথায় ছেলেটির কান্নায় তার বাবাও কান্না শুরু করেন। অবশেষে বিরক্ত হয়ে ডাক্তার তাঁকে ওটিরুম থেকে বের করে দরজা লাগিয়ে দেন। ছেঁড়া চামড়া জোড়া লাগাতে দশটি সেলাই দিতে হয়েছিল।।ছেলেটির পল্লী চিকিসক বাবা তাকে দিনে তিনবার ইঞ্জেকশন দিতে সাইকেল চালিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ছুটে যেতেন। কাঁধের সাথে বেঁধে দেয়া  ঝুলানো হাত নিয়ে বালকটি আবারো খেলায় মেতে উঠতো। একদিন খেলতে গিয়ে আবারো পড়ে গিয়ে ডাক্তারের দেয়া সবগুলো সেলাই ছিঁড়ে ফেলে। পূনঃর্বার সেলাই করায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হয় সেই ক্ষতচিহ্ন বালকটি আজো বয়ে চলেছে। বাচ্চাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সেইবার নাইওর সংক্ষিপ্ত করে সবাইকে নিয়ে নিজে বাড়িতে ফিরে আসেন।

বাড়ির কাছের সরকারি প্রাইমারিতে বাচ্চাটিকে ভর্তি করানো হয়েছিল। দলবেঁধে হৈ-হুল্লোড় করতে করতেই ক্লাস ওয়ানে ফার্স্ট হওয়া ছেলেটিকে ডাবল প্রমোশন দিয়ে থ্রিতে উঠিয়ে দেয়া হলো। প্রত্যহ স্কুল ছুটির পর বইপত্র ও শার্ট খুলে জমিনের আলে রেখে ছেলেটি বন্ধুদের সাথে হাডুডু খেলতে নেমে পড়তো। একদিন প্রতিপক্ষের কাজল নামের এক বন্ধু তাকে ধরে রাখতে না পেরে পিছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে প্রচন্ড গতিতে পড়তে গিয়ে ছেলেটির ডান হাতের কবজির দু’টি হাঁড়ই (রেড়িও-আলনা) ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। হঠাৎ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিরঃচ্ছেদ করলে ব্যথাহীন মস্তকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে খোলা চোখে আশ্চর্য হয়ে যেমনি চেয়ে থাকে ঠিক তেমনিভাবে ছেলেটিও প্রচন্ড আওয়াজ করে ভেঙে গুটিয়ে যাওয়া হাতটির দিকে বাকহীনভাবে হয়ে চেয়ে থাকে। পাশের দোকানে আড্ডারত বেকার বড়ভাইটি দৌঁড়ে এসে নিকটস্থ ফার্মেসিতে নিয়ে হাতের দু’পাশে চ্যাপ্টা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ব্যাণ্ডেজ করে কোনোরকম বাড়িয়ে নিয়ে আসে।

আবারো দুখিনী মায়ের আকাশ কাঁপানো আহাজারি কান্নায় সর পড়া নিস্তব্ধ বিকেলের নীরবতা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। রাতে ভাঙা হাঁড়ের প্রচন্ড ব্যথায় ছেলেটি ককিয়ে উঠলেও দাঁতে দাঁত চেপে চুপ থাকার চেষ্টা করে। অনেক রাতে ঘরে ফেরা বাবার একশন-রিয়্যাকশনের ভয়ে ভাঙা হাঁড়ের ব্যথা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। যথাসময়ে ঘরে ফিরে ছেলেটির বুদ্ধিমান বাবা ঘরের থমথমে অবস্থা দেখে কিছু একটা আঁচ করতে পারেন এবং চোখে চোখ রেখে ছেলের মাকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার টিংটিঙে নেংটি ইঁদুরটির কী কিছু হয়েছে? মা ভয়ে ভয়ে পুরো ঘটনা  বর্ণনা করলেন। সবশুনে বাবা কিছুক্ষণ থমধরে বসে থেকে ছেলের খাটের কাছে আসলেন। আলতো করে ছেলেটার হাত স্পর্শ করে দেখলেন। অসুস্থ ছেলের ভয়ার্ত চেহারা দেখে পিতৃবাৎসল্যের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন- আরে ব্যাটা হাতইতো ভেঙেছে, পেটতো ভাঙে নি! খেতে ওঠ, অসুস্থ শরীরে খালিপেটে ঘুমাতে হয় না বলে টেনে তুলে ডান হাত ভাঙা বলে দুধ-ভাত কচলিয়ে  চামচ দিয়ে খাওয়ালেন এবং বললেন সকালে এক্স-রে করিয়ে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবেন। উল্লেখ্য যে, ছেলেটির বাবা প্রতি রাতে বাহির হতে ফিরেই ঘুমন্ত বা আধোঘুমন্ত প্রতিটি সন্তানের পেটে হাত বুলিয়ে বুঝার চেষ্টা করতেন তার সন্তানগুলো খেয়ে ঘুমিয়েছে কিনা। তাঁদের পঞ্চার্ধো ছেলেটি আজও মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে এপাশ-ওপাশে হারানো সেই স্বর্গীয় সুখের পরশকাটি মা-বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। সম্বিৎ ফিরলে বুঝতে পারে যে সোনার নোলোক হারিয়ে গেছে তা কখনো ফিরে পাবে না।

তাই অশ্রুসিক্ত বিগলিত হৃদয়ের অলিন্দ-নিলয়ের ফুটো ভেদ করে মনের অজান্তে বেরিয়ে আসে- “রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সগিরা”।

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

Dr. Salah Uddin Afsar
ড. মোঃ সালাহ উদ্দিন আফছার
ড. মো. সালাহ উদ্দিন আফছার মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত ইউনির্ভাসিটি কেবাংসান (ইউকেএম) হতে মেটাম্যাটিরিয়াল ব্যবহার করে এনার্জি হার্ভেস্টিং পদ্ধতি নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নাল (Q1,Q2) এ তাঁর গবেষণা বিষয়ে ১৪ রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২৪তম বিসিএস-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ঢাকায় কর্মরত আছেন।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *