গল্পটা আমার দাদার কাছ থেকে শোনা। দাদা এই বছরই ইন্তেকাল করেছেন। দাদার বেহেশত নসিব হউক। দাদা পাকুটিয়া বাজারে এক সময় ডিলারি করতো। আজিজ ডিলার নামে মোটামুটি সবাই চিনে। কেউ কেউ তো দাদাকে জমিদার মনে করতো। কোলকাতার বৃন্দাবন্দ চন্দ্র জমিদার না। অনেক জমি আছে যার জমিদার। এরকম এক কথায় প্রকাশের জমিদার। আমরাও এগুলা মানুষ কে বলতে শুনেছি। আজিজ ডিলারের জমি জমা হিসাব ছাড়া ।
যাই হউক জমি জমার ব্যাপার আমি অতো বুঝি না। একদমই বুঝি না। আমার আব্বা তো আরও না। তাই তো আব্বার বাজান এক কথায় প্রকাশের জমিদার হয়েও আব্বার দিনান্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা দিয়ে শুরু করে আজকে মোটামুটি দিনের পান্তা দিনে আর রাতেও চলে। এসব পান্তা পান্তা করে পান্তা বুড়ির গল্প না মনে করালেও চলবে। আজিজ ডিলারের জমির হিসাব আর তার ছেলের পান্তার হিসাব বাদ দিয়ে ভূতের গল্পে যাওয়া যাক।
বাজারের মাঝখানে বড় বট গাছের নিচে অনেক পুরাতন একটা কালি মন্দির ছিলো তখন। এখনো আছে। কিন্তু চেহারা বদলেছে। নতুন বিগ্রহ, নতুন টিনের ঘর আর গ্রিল দেয়া মন্দির হয়ে গেছে। তার ভেতরে পুরাতন কালি মূর্তিটাও আর নাই। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি। ছোটখাটো গড়নের কালি জিহ্বা বের করে আছে। দুপুর বেলায় স্কুল থেকে টিফিন করতে বাসায় আসার সময় মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হতো। ভয়ে জিহ্বা বের করা কালির দিকে তাকাতে পারতাম না পর্যন্ত। দিন দুপুরে। আর মাঠে খেলা শেষ করে সন্ধায় বাড়ি ফেরার সময় তো দৌড় দিতাম। রাতে বিরাতে বের হওয়ার চিন্তাই তো মাথায় আসবে না স্বাভাবিক।
ঢাকের বাড়ি পড়ত বৈশাখ মাসে। দিঘুলিয়া পাল পাড়া থেকে ঢাক ঢোল বাজিয়ে আর মুখে রঙ মেখে বাজারে আসত ভিখ মাগার দল। আসল ভিক্ষুক না। সাজোয়া ভিক্ষুক। কেউ কৃষ্ণ সাজতো কেউ রাধা। আরও কয়েকজন অন্য কিছু সাজতো। চার থেকে পাচজনের দল। দোকানে দোকানে আরতি করে আর নেচে ভিখ মাগতো । এই ভিখ মাগার ব্যাপারটা পরে জেনেছি। এটাকে ঢাকের বাড়ি আর তার অনুষঙ্গ হিসেবেই ভাবতাম আগে। এটার নাম ভিখ মাগা তাই জানতাম না।ভিখ মাগার দলকে দোকানিরা যা পারতো দিত। ভিখ মাগা শেষে কালি মন্দিরের সামনে আরতি দিয়ে শেষ। দিঘুলিয়া গ্রামে ফেরত যেতো ভিখ মাগার দল। ঐ দলের কয়েকজন বর্তমানে আমার বন্ধু তালিকায় আছে।
“আবার এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি। ভূত আসলো না এখনও। খালি মন্দির, দাদা বাড়ির গল্প আর ঢাকের বাড়ি দিয়েই এতদুর। এবার ভূতে যাওয়া যাক।”
দাদা ডিলারি করতো আর ঐ দোকানেই মাঝেমাঝে রাতে থেকে যেতো। রাতে পায়খানায় যাওয়ার দরকার হলে যেতে হতো বাজারের পূর্ব দিকে জমিদারদের বানানো পুরাতন পাকা পায়খানায়।
“এই গল্পেও পায়খানা। পায়খানা ছাড়া আপনি গল্প বাধতে পারেন না? এইবার আর দয়া করে বার পনেরো পায়খানা পায়খানা কইরেন না। দাদা কে তাড়াতাড়ি পায়খানায় পাঠান আর ফেরত আনেন। মাঝখানে ভূত দেখান।”
আচ্ছা।
দাদা একবার অনেক রাতে পায়খানায় গেল। কাজ সেরে আস্তে আস্তে ফেরত আসতেছে। না, তাড়াতাড়ি করে। ভোট ঘরের কোনায় এসে থমকে দাঁড়ালো। হুম ভূত দেখেছে। ইউনিয়ন পরিষদকে আমরা ভোট ঘর বলতাম। বর্তমানের ভোট ঘর দুই তলা পাকা। তখন ছিলো টিনের ঘর পূর্ব পশ্চিমে লম্বা।
সাদা ধুতি কাপড় পড়া এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী টাইপ মহিলা হাতে হারিকেন আর লাঠি নিয়ে কালি মন্দিরের সামনে থেকে হেটে হেটে আসছে। হারিকেনের আলো বেশি দূর যাচ্ছে না। লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে আগাচ্ছে। “এই হিসাব কে মেলাবে এখন! কে উনি, এতো রাতে কি করে, অতো রাতে কালির সাথে দেখা করার কি দরকার পড়ল, কালি সাধক কিনা কে জানে!”
যে সাধকই হউক না কেন দাদার সাধনা তখন ঘরে যাওয়া। হারিকেনওয়ালা কালি সাধক বট গাছের নিচ দিয়ে হেটে হেটে উত্তর দিকের পুকুরের দিকে যেতে লাগল।
“এবার পুকুর পাড়ি দেবে। আগের গল্পে খাল পাড়ি দিল। এই গল্পে পুকুর। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পাড়াপাড়ির গল্প শেষ করলেই পারতেন।”
সন্ন্যাসীনী মহিলা পুকুর পাড়ে চলে গেলেন। হটাৎ মহিলা উধাও । শুধু পড়ে আছে হারিকেন আর লাঠি। তারপর, আস্তেধীরে হারিকেন উপরে উঠে ভাসতে লাগলো। লাঠি পড়ে থাকলো। হারিকেন ভেসে ভেসে পুকুর পাড় হয়ে হাড়িপাড়া গ্রামের দিকে ক্ষেতে চকে গিয়ে মিশে গেলো। গল্প শেষ।
দাদা আরও কয়েকবার এই ঘটনা দেখেছে। কিন্তু কোন বারই পড়ে থাকা লাঠি সকালে গিয়ে আর খোজে পায়নি।
বাজারের অন্য কেউ এই মহিলাকে দেখেছে কিনা আমার জানা নাই। আমার দাদার মতো রাত বিরাতে কেউ পায়খানায় যেতো না মনে হয়। দাদার বাহ্যি সমস্যা ছিল। ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা পাকুটিয়ার অনেকে এই গল্প পড়তে পারে। আরও কেউ এই হোয়াইট ল্যান্টার্ন মহিলাকে দেখেছে জানলে বুঝতে পারব দাদা আসলেই ভূত দেখেছিল। অন্যথায় দাদার কল্পনা ভাল ছিল বলে সান্ত্বনা। গ্লাস অর্ধেক ভরা। দাদাও ভালো মানুষ ছিলো। একজ ভালো মানুষ কখনোই হয় না। মন্দ আর ভালোর মিশেল হলো মানুষ। পরলোকগত মানুষের মন্দ মন্দ কথা ভুলে যেতে হয়। ভালো ভালো কথা বলতে হয় শুধু। মৃতুর উপর কোন কথা চলে না।
ভূতে বিশ্বাস করলে আর না করলেও অন্য গল্পটি নিচেই-
