প্রথম পাতা » গল্প » গুলশানে ছয় ঘন্টা

গুলশানে ছয় ঘন্টা

Justice Shahabuddin Ahmed Park

ছয় ঘন্টা সময় কিভাবে কাটাব তা আগে থেকেই মনে মনে ভেবে রাখলাম। সকাল সাড়ে সাতটায় উঠে আটটার মধ্যে রওনা হতে পারলে নয়টা নাগাদ কলাবাগান থেকে গুলশান-১ এ পৌঁছানো যাবে। সময়মতো রওনা হয়ে পৌনে নয়টার মধ্যে শেবতির অফিসের সামনে হাজির হলাম। শেবতিকে নামিয়ে দিয়ে প্রথম কাজটা হবে একটা ভালো নাস্তার দোকান খুঁজে বের করা। সকালের নাস্তা নাকি করতে হয় রাজা বাদশাদের মতো। আজকে আমাকে বেলা তিনটা পর্যন্ত মোট ছয় ঘন্টা গুলশানের রাস্তাঘাট, অলিগলি আর পার্কে কাটাতে হবে। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে বেশি এনার্জি দরকার হয়, আজকে আমাকে তাই নাস্তা করতে হবে সম্রাটদের মতো। অনেকদিন ডাল ভাজিতে লেবু চিপড়িয়ে নিয়ে পরোটা খাই না, সাথে থাকবে একটা ডিম পোচ। নাস্তা শেষ করে চীনা মাটির কাপে কড়া এক কাপ দুধ চা। নেহারী বা কলিজা দিয়ে গার্লিক নান খেলে সম্রাটদের নাস্তার কাছাকাছি হতো কিনা জানি না তবে সম্রাটরা নিশ্চয়ই ফুলকপি ভাজি আর বুটের ডালের মধ্যে লেবু টিপে খায় না।

নাভানা টাওয়ারের পাশে রবি অফিসের পেছনে ভোজন ঘর রেস্তোরাঁ দেখেই মনে হল এখানেই বাদশাহী নাস্তা পাওয়া যাবে। দেয়ালঘেঁষা লোহার সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠে গেলাম। কোণার দিকে একটা টেবিলে বসতেই দশ বারো বছরের গ্লাস বয়টি প্লেটে করে লেবু, পিয়াজ, কাঁচা মরিচ আর এক গ্লাস পানি দিয়ে গেলো। তেমন ভিড় নেই। হাতেগোনা কয়েকজন কাস্টমার। কেউ নাস্তা খাচ্ছে, কেউ আবার নাস্তার জন্য অপেক্ষা করছে, কেউকেউ নাস্তা শেষ করে চা খাচ্ছে। সবাই আমার মতোই, বাসা থেকে হয়তো শুধু চা খেয়ে বের হয়েছে এখন নাস্তা খাচ্ছে। পার্থক্য তারা সবাই নাস্তা শেষ করে যে যার অফিসে ঢুকবে আর আমি হয়তো গুলশান-২ এর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কে গিয়ে হেঁটেহেঁটে কখনওবা পার্কের বেঞ্চে বসে  গাছপালা, পাখপাখালি আর মানুষ দেখে মনের কোণায় জমে থাকা কুয়াশা পরিস্কার করব।

সাহাবুদ্দিন পার্কে আগে কখনো যাই নি। এই পার্কটি পূর্বে গুলশান ট্যাংক পার্ক নামে পরিচিত ছিল। পার্কটি নাকি অনেক সুন্দর আর নানা রকম নতুন পুরাতন গাছপালায় ভর্তি। কোন কাজ ছাড়াই গুলশানে ছয় ঘন্টার মতো থাকতে হবে তাই আগে থেকেই খানিকটা ভেবে রেখেছিলাম কফি শপে বসে থাকব নাকি কোন পার্কে গিয়ে গদাই লস্করি চালে হেঁটে বেড়াব। সে হিসেবে আমাকে পরিকল্পনাহীন মানুষ বলা যাবে না, তবে কিনা এরকম তুচ্ছ ব্যাপারে দাবাখেলাসুলভ পরিকল্পনার ঘনঘটা একটু বাড়াবাড়িই বলতে হবে। ভোজন ঘরে নাস্তা করতে করতেই জানালা দিয়ে রাস্তার ঐপাশেই কফি ওয়ার্ল্ড চোখে পড়ল। চীনা মাটির কাপে কড়া দুধ চা খাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে গেলাম কফি ওয়ার্ল্ডে। কফি খাওয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। এরকম পশ কফিশপগুলোর বাথরুম হয় তকতকে ঝকঝকে ধরণের। দরকার হলে আরামে বসে কাজটা সেরে নেয়া যাবে। নাস্তা খেয়ে কফি খাওয়ার পর আমার আবার চাপটা উঁকি দেয়। একটা রেগুলার ক্যাপুচিনো শেষ করে ওয়েটারকে বাথরুম কোনদিকে জিজ্ঞেস করতেই একটা চাবি ধরিয়ে দিল। যেসব বাথরুম তালাবন্ধ করে চাবি নিজেদের কাছে রাখা হয় সেসব বাথরুম হবে নোংরা, টয়লেট পেপার থাকবে না, হ্যান্ডওয়াশ থাকবে না আর কমোড সিটে লেগে থাকবে হাগুর কালচে ছিটা। চাবি দিয়ে তালা খুলেই হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে গেলাম। ভাগ্যিস পকেটে টিস্যু ছিল। কমোড সিটটি টিস্যু দিয়ে মুছে কোনরকমে কাজ সারলাম। আপনারা দেখি উপরে ফিটফাট আর ভেতরে সদরঘাট, চাবি ফেরত দিতে গিয়ে এই বহুল ব্যবহার করা কথাটা বলতে গিয়েও বললাম না। ভোজন ঘরের তো বাথরুমই নাই।

নির্ভার মনে ঠিক করলাম ফুটপাত ধরে হেটেই গুলশান ১ থেকে গুলশান ২ এ যাব। কিছু দূর হেঁটেই আমার মনে হল কেউ একজন পেছন থেকে আস্তে করে বলল, এরকম নবাবি কায়দায় হাটতে হলে পার্কে যান, ফুটপাতে কেন! ভুল কিছু বলেনি। ফুটপাতে হাটতে হবে হন্তদন্ত হয়ে, শরীরের প্রতিটা অঙ্গে ব্যস্ততা ফুটিয়ে, হাপিত্যেস করে। পার্কের নিয়মে ফুটপাতে হাঁটা যায় না। ফুটপাত ধরে হেঁটে আমি পার্কেই যাচ্ছি ভাই। নিজের মনেই কথাটি বললাম। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নাকি শান্তিতে যেতে হয়, আমি ফুটপাত দিয়ে পার্কে যাচ্ছি।

ফুটপাত ছেড়ে দিয়ে রিক্সা নিলাম। মনের মধ্যে কোন কাজের চাপ খচখচ না করলে আশপাশটা মাথা তুলে দেখতে ইচ্ছা করে। আজকে আমি কাজহীন। আগে যা চোখে পড়েনি আজ তার অনেক কিছুই চোখে পড়ছে। হঠাৎ মনের মধ্যে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হওয়ার সেই পুরাতন অনুভূতিটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। এই ক্ষুদ্রতা কিছুটা অর্থনৈতিক, বেশিটা দার্শনিক। অর্থনীতি আর দর্শনের মাপামাপি করতে করতেই রিক্সা এসে থামল পার্কের গেটের সামনে। পার্কটি আসলেই সুন্দর, দারুণ রুচির পরিচয় আছে, গুলশান বলে কথা!

পাঁচ টাকার বাদাম কিনে বেঞ্চে বসে খেয়ে খোসা ফেলে পার্কটির পাথরকুচি মোড়ানো রাস্তা নোংরা না করে হাটতে শুরু করলাম। মাঝখানে লেক রেখে চারপাশে হাটার রাস্তা। লেকের উপর দিয়েও কাঠের তৈরী ওয়াক ওয়ে আছে। মেরামত কাজের জন্য আপাতত সেটা বন্ধ। গাছে গাছে কাঠবিড়ালিরা কাঠঠোকরা পাখিদের সাথে পাল্লা দিয়ে গাছের বাকলের তলা থেকে পোকামাকড় বের করে খাচ্ছে। লেকের পানিতে একটা পানকৌড়ির মাছ ধরা ওয়াক ওয়ের রেলিং এ বসে হিংসা নিয়ে দেখছে একটা মাছরাঙ্গা পাখি। পানকৌড়িটি প্রতিবার ডুব দিয়েই ঠোঁটে করে উঠিয়ে আনছে রুপালী ছোট মাছ। মাছরাঙাটি অপেক্ষা করছে কখন উপরে ভেসে উঠবে একটা মাছ আর পানকৌড়িকে উপযুক্ত জবাব দেবে। সব মাছ আজকে পানির গভীরে। মাছরাঙার আজকে পানকৌড়ি হতে ইচ্ছা করছে। ডুবসাঁতারের ফাঁকে পানকৌড়িটি যখন সূর্যের দিকে পাখা মেলে বসে থাকে মাছরাঙ্গাটি এটাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো ভেবে উড়ে চলে যায়।

আমাকেও আশেপাশের মানুষগুলো বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে বলে মনে হতে থাকল। সবাই দুইজন করে অথবা দলেদলে হেঁটে বেড়াচ্ছে আর মুক্তমঞ্চের সিঁড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি একা। আমি হেঁটে গিয়ে বসলাম কোণার দিকে একটা সিঁড়িতে। সকালের হাল্কা রোদে বসেই কড়া এক কাপ দুধ চা খাওয়ার চিন্তা আবার সুড়সুড়ি দিয়ে উঠল। ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতা কিংবা বাদাম ওয়ালা চোখে পড়ে নাই। এই পার্কে এসব চলে না বোধহয়। চললেও যে খেতাম তা নয়। এসব চা হয় পোঁতানো ধরনের। চায়ের নেশায় নিতান্ত বাধ্য না হয়ে এসব চা খাওয়া যায় না। পার্কের এক কোণায় “গ্রামচা” নামে  চাকাওয়ালা একটা টঙ দোকান চোখে পড়েছিল। কিন্তু বিকেল না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় না খুলবে বায়োস্কোপ এর মতো দেখতে এই চায়ের দোকান। চায়ের তৃষ্ণা মুখে নিয়ে রোদ পোহাতে থাকলাম।

পার্কে কোন কারণ ছাড়াই আপনমনে বসে থাকা যায়, চাইলে শুয়েও পরা যায়, কেউ এসে বলবে না এই যে ভাই আপনার কোন কাজকাম নাই! সেই যে সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে এখন পর্যন্ত পার্কেই বাতাস খাচ্ছেন! কার্য-কারণের পৃথিবী পার্কের বাইরে রেখে এসেছি। হিমুদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা তাই পার্ক। হিমুরা কারণ বুঝে না, বুঝে ভালো লাগা। ভালো লাগার কারণ থাকতে পারে কিন্তু সেটা হিমুদের কাছে গৌণ। ভালো লাগাটাই মূখ্য। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের হিমু উপহার দিয়ে অনেক ঝামেলা থেকে রেহাই দিয়ে গেছেন। নানা ধরনের সব পাগলামি হিমুকে ডেকে এনে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। হিমু কিংবা মিসির আলী কাউকেই এখন ডাকাডাকি করে  আমার তেমন লাভ নাই, আমার ডাকতে হবে এক চা ওয়ালাকে। হিমুকে ডেকে ওকে দিয়ে এক কাপ চা আনানো গেলে ভালো হতো। গুলশান-১ এর ২১ নম্বর রোডে একটা কড়ই গাছের নিচে সারি করে অনেক চায়ের দোকান দেখে এসেছি। নাজিম নামে এক চা বিক্রেতা আছে। নাজিম ভাই বালতিভরা গরম পানিতে লম্বা লম্বা চীনা মাটির কাপ ধুয়ে ডুবিয়ে রাখেন। বড়শির মতো বাঁকানো সাইকেলের স্পোক দিয়ে সযত্নে কাপ তুলে জ্বাল দেয়া কড়া দুধ চা ঢেলে কাপের নিচটা গামছা দিয়ে মুছে স্যার বলে এগিয়ে দেন। নাজিম ভাইয়ের বড়শি চা খাব আজকে।

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *