প্রথম পাতা » গল্প » গগন তলে আগুন জ্বলে

গগন তলে আগুন জ্বলে

summer days childhood

“গঙ্গাফড়িং লাফিয়ে চলে

বাঁধের দিকে সূর্য ঢলে৷”

“দুই মুসাফির” গল্পটা পড়ছিলাম। সিলেবাসে নাই তারপরও পড়ছি। সিলেবাসের সব পড়া শেষ। বৈশাখের দুপুর বেলার হাহাকার ধামাচাপা দেয়ার জন্য গল্পটা পড়ছি সেটাও বলা যায়। সারা শরীর বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। গলায় ঝুলিয়ে রাখা গামছা দিয়ে মোছার সাথে সাথে আবার ঘেমে উঠছে। টিনের ঘরে গরম বেশি লাগে। বাঁশের তালাইয়ের সিলিং দেয়া, তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। সিলিং ফ্যানের বাতাসও গরম। বেলা বারোটা বাজলেই বড় পুকুরে গিয়ে ডুবাডুবি করব। বারোটার সময় রতন, আনোয়ার, সুমন আর কোদন আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে। দেয়াল ঘড়ির মিনিটের কাঁটাটাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বারোটা বাজাতে ওর প্রাণ যেন বের হয়ে যাচ্ছে। এরকম গরমে কেউই নিস্তার পায় না, সময়ও না। গরমে সময় নিজেও রেললাইনের মতো প্রলম্বিত হয়ে যায়। এই না পড়া দুই মুসাফির গল্পটা ছিল বলে রক্ষা। তা নাহলে প্রলম্বিত সময়ের কবলে পড়ে তড়পা তড়পি করতে হত। 

আমার বাল্যবেলার একজন বন্ধু কোদন। আজ এতদিন পরেও ওর নাম নিয়ে আমার বিব্রতবোধ আর রহস্য কাটেনি। ওর নাম কোদন কেন! নাচন কোদন এর সাথে কিছু সম্পর্ক আছে কি? কেইবা ওর নাম কোদন রেখেছিল কে জানে। ওর একটা ভাল নাম ছিল, ভুলে গেছি বেমালুম। ২০ বছরের মতো হবে ওর কোন খোঁজ জানি না। ছোটবেলাতেই ওর মা বাবা দুইজনেই মারা যায়। দাদির কাছে কিছুদিন ছিল। তারপর হঠাৎ করেই একদিন গ্রাম থেকে উধাও হয়ে গেল ওরা দুই ভাই। কোদন ছিল বড় ভাই। 

কোদন এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। এর মধ্যেই দুই মুসাফির গল্পটা পড়া শেষ করে ফেলেছি। রতনেরা বাজারে বটগাছের নিচে অপেক্ষা করছে। বাজারের পাশে ছোট পুকুরে যাওয়া যাবে না, পুকুরের পানি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত গরম হয়ে রয়েছে। জমিদার বাড়ির বড় পুকুরে গেলে নিচের দিকে ঠান্ডা পানি পাওয়া যাবে। এই ভেবে আমরা সবাই বড় পুকুরের দিকে রওনা হই। চান্দিফাটা রোদ যাকে বলে। রাস্তার পাশের মন্টু কাকার মিষ্টির দোকান থেকে জগের পানি দিয়ে গামছা ভিজিয়ে চান্দিতে ভাঁজ করে দেই। পুকুর পাড়ে যেতে যেতে গামছা শুঁকিয়ে যায়। পুকুরের পানি চায়ের পানির মতো গরম হয়ে আছে । চা পাতা ঢেলে দিলেই এক পুকুর চা হয়ে যাবে। 

আমরা শান বাধাঁনো ঘাটলা থেকে লাফ দিয়ে পুকুরের তলদেশের দিকে চলে যাই। নিচের পানি ঠান্ডা ঠান্ডা। দম আটকিয়ে যতক্ষন পারি পুকুরের নিচের কাদা বালিতে ডুব দিয়ে বসে থাকি। জমিদার আমলের বিশাল পুকুর। বর্ষাকালে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। এই পাড় থেকে ঐপাড়ে সাঁতরে যাওয়ার সাহস কেউ করে না। আর এখন গলাপানি। সারা পুকুর হেঁটে বেড়ানো যায়। পায়ের নিচে ঠান্ডা বালি। পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করে গলা শুকিয়ে আসে। পুকুর থেকে উঠে আমাদের হাই স্কুলের দেয়াল টপকিয়ে চাপকলের ঠান্ডা পানি খেয়ে আসি। 

আর পানিতে নামব না। রতন হঠাৎ করে বেঁকে বসে। বাস্তাখোলা গ্রামের চকের শ্যালো মেশিনের পানির নিচে গোসল করি চল। রতন প্রস্তাব করে। ক্ষেতওয়ালারা অনেক সময় আপত্তি করে। গোসল করতে যেয়ে অনেকেই ক্ষেতে পানি দেয়ার নালা ভেঙ্গে ফেলে। তবে ইরিগেশনের পানিতে গোসল করতে পারলে শরীরটা জুড়িয়ে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। নাম শ্যালো মেশিন বা অগভীর নলকূপ হলেও বেশ গভীর থেকে ঠাণ্ডা পানি উঠিয়ে আনে। দেখলাম বেশ অনেকগুলো ইরিগেশন প্রজেক্ট। গাছের ছায়া আছে এরকম একটাতে গেলাম আমরা, ক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে। প্রজেক্টের মালিক প্রথমে নামতে দেয় না। হাকিমদের ক্ষেত। আব্দুল হাকিম আমার ক্লাস এইটের সহপাঠী। হাকিমের আব্বা আমাদের চিনতে পেরে আর কিছু বলল না। আমরা পালাবদল করে মেশিনের পাইপের নিচে বসে থাকি। পানির বেশ চাপ আর ধাক্কা। বেশ টালমাটাল অবস্থা করেই বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবে পানি বরফ শীতল ঠান্ডা।  ঠান্ডা পানির ধাক্কা খেয়ে চোখ লাল করে ভেজা কাপড়েই বাড়ির দিকে রওনা হই আমরা। 

 এই গরমে একটুখানি স্বস্তির জন্য গঙ্গাফড়িং এর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে কত ঘাটের পানিতে শরীর ডুবালাম কিন্তু বাড়িতে যেতে যেতে ঘামে আবার নেয়ে উঠলাম। যেতে যেতে ভাবলাম ভেজা কাপড় বদল করে খালপাড়ে গিয়ে বসব । পশ্চিম দিকের খালপাড়ে বেনজির, আসমানি আর আলমাসদের বাড়ি। খালপাড় ভরা কাঁঠাল, মেহগনি আর নানা রকমের গাছ। সব সময় ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। এখানে বসলেই শরীরটা একটু শীতল হয়। গিয়ে দেখি অনেকেই পাটি বিছিয়ে শুয়ে আছে। কেউ কেউ রীতিমতো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সাথে করে একটা পাটি নিয়ে আসলে ভালো হতো! বেনজিরদের বাড়ি থেকে একটা কাঠের পিঁড়ি নিয়ে বসলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই শরীরটা জুড়িয়ে এল। গাছপালার দিকে কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। 

“অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান

প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ ;

……………………………

শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায়।” 

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *