আমার ফুপুরা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই দাদা বাড়িতে যেতো।আমাদের বাড়িতে পা-ও দিত না । হাতির পা গরিবের বাড়িতে পড়ে মাটিতে ডেবে পা আটকে যাওয়ার ভয়ে আর কি! আমাদের বাড়ি আর দাদার বাড়ি আলাদা কেন সেটা আরেক গল্প। বলার মতো তাই পরে বলা যাবে।
আমার আব্বার অর্থনৈতিক অবস্থা এক সময় খুব খারাপ ছিলো। এখন যে অবস্থা খুব ভালো তা বলা যাবে না। দুই ছেলেই মাস্টার। মাস্টারদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো এরকম গুজব ছড়ালে কেউ কান দেবে না। গুজবই যার “জব” সেও না। কিন্তু দাদার অর্থনৈতিক অবস্থা বরাবরই ভালো ছিল। যার অনেক জমি আছে তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালই হয়, গ্রামে তাই মনে করা হয়। তার উপর ছিলেন আবার ডিলার। এই সুবাদেই সবার কাছে আজিজ ডিলার নামে পরিচিত। ভালো মানুষ হিসেবেও সুনাম ছিল। আমার দাদা এই বছরেই পরলোক গমন করেছেন। পরলোকগত মানুষের শুধু ভালো ভালো কথা বলতে হয়। এটাই নিয়ম। আমি নিয়মের বাইরে যেতে চাই না। জীবন মৃত্যুর ব্যাপার বলে কথা। আমি মরে গেলে আমাকে নিয়ে সবাই ভালো ভালো কথা বলবে সেটা আমিও চাই। বুঝে না বুঝে অনেক খারাপ কাজ করবো আর পরলোকগত হয়ে ভালো ভালো কথা শোনার জন্য কবরে শুয়ে কান পেতে থাকবো হাসরের ময়দানে দাঁড়ানোর অপেক্ষা নিয়ে। কথাগুলো অসংবেদনশীল মনে হলে আমাকে নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলতে পারেন। আমি এখনো জীবিত আছি। যাই হউক আমার দাদা “জমিদার” আর বাবার দিনান্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা কেনো, সেটাও আরেক গল্প। এটাও তাই শিকেয় তোলে রাখবো।
ফুপুরা গরিব ভাইয়ের পরিচয় দিতে কুন্ঠা বোধ করতো একরকম বলা যায়। আমার কাছে তাই মনে হয়। ভেতরে ভেতরে ব্যাপার অন্যরকম থাকতে পারে। আমি ভেতরের খবর অতো জানি না। জানতে চাইলেই জানা যাবে৷ কিন্তু জানার আগ্রহ নাই৷ দেখা থেকেই জানা ভাল৷ শুনে জানার চেয়ে৷ ছোটবেলা থেকে যা দেখেছি তাই বলছি। আমার আব্বা শ্যাম বর্ণের মানুষ। ভনিতা করে না বললে বলা যায় কালো। ফুপুরা আর আমার একমাত্র চাচা ফর্সা। আমার আব্বা দেখতে এক সময় ভালো ছিলো। দুধের মতো সাদা না যদিও। দুই ছেলে কে মানুষ বানাতে গিয়ে চেহারা পুড়ে ফেলেছেন। দুই ছেলে মাস্টার হয়ে মানুষ হবে জানলে চেহারা পোড়াতেন না মনে হয়। তাঁর বোনেরা তখন ভাই বলে পরিচয় দিত। আব্বার আফসোস। একে তো গরিব তার উপর চেহারা কালো । এরকম ভাই না থাকলেই বোনেরা খুশি। সব বোনেরা না। আমার আব্বার বোনেরা। দুর্ভাগা আব্বা আমার!
ফুপুদের ভিলেন বানাচ্ছি নিজের বাবাকে হিরো সাজাবার জন্য৷ এটাও ভাবা যায়৷ আবার এরকম বোন আর ভাই থাকতেই পারে এবং আছে সেটাও ভাবা যায়৷ গল্পের খাতিরে অনেক কিছু ভাবা যায় আর করা যায়৷ জীবন গল্পের বাইরে না৷ নিজের জীবনকে গল্প হিসেবে দেখতে না পারলে আপনি নাকি বেচেঁই ছিলেন না৷ কার কথা এটা মনে নাই৷ জীবনে এতো গল্প যে নতুন করে গল্প বানানোর আর সাজানোর দরকার হয় না৷ সবার জানা কথা৷ গল্প আপনার উপরে চড়ে থাকলে আপনি গল্প বলতে পারবেন না৷ গল্পের উপর আপনি নিজে চড়ে বসতে পারলে পারবেন৷ আমি গল্পের পিঠে চড়ার চেষ্টা করছি৷ চেষ্টাই সার৷
আমার আম্মা আব্বাকে মাঝেমাঝেই কাঠুরে বলে ডাকতো। সত্যিকার অর্থে না। প্রতীকী অর্থে। আমার আম্মাও মার্কা আর প্রতীক চিনে। সারা জীবন বনে গেলো, কাঠ কাটলো কিন্তু সোনার বা রূপার কুড়াল নিয়ে হাজির হলো না আব্বা। কুড়াল নিয়ে কাঠুরের বনে যাওয়া, কুড়াল নদীতে পড়ে যাওয়া, সোনার, রুপার, ও লোহার কুড়াল দিয়ে সততা পরীক্ষা করার গল্প আমার আম্মারও অজানা ছিল না। সোনার বা রূপার কুড়াল পেলে আব্বার আফসোস কমতেই পারতো । ভাইয়ের পরিচয় খুঁজে পেত। আবার কুড়াল অন্য ভাবেও ভাঙতে পারতো । রক্ষে যে আব্বা নেহায়েতই ভালো মানুষ। নিজের বাবা বলে বলছি না। বাবাদের ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ দেয়া কঠিন। আর এটা সোনার বা রূপার কুড়াল দিয়ে পরীক্ষা করারও দরকার হয় না। বাবারা স্বতঃসিদ্ধ ভালো মানুষ। ভালো মানুষ হলেই যে বোনেরা “ভাই ভাই” বলে মুখে ফেনা তুলবে তা কেনো হবে। ভালো মানুষি অর্থের পাল্লায় মাপতে পারলে হবে।
লেখাটি সংশ্লিষ্ট কেউ পড়লে, কথা-গোলা দীর্ঘকাল ঘরে বন্দী থাকার কুফল হিসেবে দেখবেন দয়া করে।
এবার কিছু নীতিকথা কথা বলে ঈশপের গল্প বানানোর অপচেষ্টা করি।
নীতিকথা একঃ গরিবের আত্মীয়তা কেউ স্বীকার করে না। “গরিব হয়ে জন্মানো অপরাধ না, গরিব হয়ে মরলে অপরাধ”। এক সময় অনেক “motivational self help” ধরনের বই পড়েছি। গরিব থেকে ধনী হতে হবে বলে কথা! সবাই কম বেশি পড়েছে এবং পড়ছে। ঐ পড়ার জ্ঞান থেকে মেরে দিলাম উপরের লাইনটা। কে বলেছে কই বলেছে অত শত মনে নাই। মনে আছে শুধু কথা। এই কথা কতটুকু কাজে লাগে তা পরীক্ষা করতে নীলক্ষেত গিয়ে নতুন করে বই কেনার দরকার নাই। প্রায় সবার বাসায় একটা না একটা আছেই এরকম বই। আমার আছে “Rich Dad, Poor Dad” বইটা। যদিও বইটা যখন দারিদ্র্য সীমার নিচে থেকে একটু উপরে উঠে এসেছি তারপর কেনা।
নীতিকথা দুইঃ এখন তো বর্ণবাদ নিয়ে অনেক কথা চলে। আমি আর নতুন করে কিই-বা বলবো। “ভাই কালো হউক আর সাদা হউক”,“গরিব হউক আর ধনী হউক” তাকে মেনে না নিয়ে বর্ণবাদ কে উস্কে দেবেন না। সকল বর্ণবাদ নিপাত যাক। সাথে সকল অর্থনৈতিক বৈষম্য। সোনার কুড়াল, রূপার কুড়াল সবাই পাক। লোহার কুড়ালও যে ফেলনা না সেটাও মনে থাক।
নীতিকথা শেষঃ “এক পুরুষে করে ধন আরেক পুরুষ খায়”। এটা সত্য কিনা জানি না তবে, আমার আব্বা আগের পুরুষের কিছুই পায়নি আর খায়নি। নিজেরটা নিজে করে আর খেয়ে পুরুষ হয়েছেন। ধারা হয়েছেন৷ শিরদাঁড়া আর বংশধারা৷ আমার আব্বার পরের সব পুরুষ একে অপরেরটা খেয়ে যাক। ধারা বজায় থাকুক৷ শূণ্য থেকে যেন শুরু করতে না হয় কাউকে। শূন্য থেকে সব কিছু বানানো স্রষ্টার কাজ। মানুষের কাজ না। “In the beginning, there was nothing. Then God said, ‘Let There Be Light.’ Still there was nothing. But you could now see it much better.” My father had nothing but light of goodness and humility. He still has.
লেখাটি আসন্ন বাবা দিবস উপলক্ষ্যে লেখা বলেও ভাবা যেতে পারে৷ কিন্তু লেখাটি লিখেছিলাম আগেই, উপলক্ষ্যের ব্যাপার মাথায় এসেছে পরে৷ বাবারা কোন উপলক্ষ্য নয়৷ সতত৷ দিবস কেন্দ্রীয় বিষয় আশয়ে এসব কথা বলতে হয়৷
