প্রথম পাতা » গল্প » না নড়ে উপায় থাকে না

না নড়ে উপায় থাকে না

peace+nature

টাংগাইলের পালপাড়ায় একটা দুইতলা বাসার উপরের তলায় আমি থাকি। বাসার সামনে দিয়ে চলে গেছে একটা পিচঢালা রাস্তা। দুই একটা অটোরিক্সা ছাড়া গ্রামের মানুষজনেরই চলাফেরা বেশি এই রাস্তায়। সকালবেলা স্কুলের ছেলেরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। স্কুল ড্রেস পড়া মেয়েরা গল্প করতে করতে হেঁটে যায়। পালপাড়ার হিন্দু মহিলারা ডায়বেটিসের হাঁটা হাটতে বের হয়। রোদ বাড়লে বউ ঝিয়েরা কাপড় ধুয়ে রাস্তার পাশে টানানো বাঁশে শুকাতে দেয় আর একজন আরেকজনের সাথে টুকটাক গল্প করে। প্রতিদিন সকালে উঠে এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসলেই এসব চোখে পড়ে৷ রুটিনের মতো প্রতিদিন একই ঘটনা। মানুষের রুটিন কাজের পাশাপাশি পাখিদের রুটিন কাজও দেখা যায় বারান্দা থেকে।

আমার বারান্দা থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে একটা জিগা গাছ আছে। বয়সে কিশোর বলা যায়। শরীর থেকে এখনো আঠা বের হওয়া শুরু হয় নাই। প্রতিদিন সকালে দুইটা ঘুঘু পাখি এই জিগাগাছে এসে বসে। একটা নির্লিপ্তভাবে বসে থাকে আর অন্যটা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কয়েকবার কুর্নিশ করে। তারা দম্পতি। একটা শালিক পাখি আরেকটা ডালে গোসল করে এসে বসে পাখায় আর বুকে ঠোঁট চালিয়ে আর শরীর ঝাঁকিয়ে পালক শুঁকায়। আমার চা শেষ হতে থাকে। দূরে গাছে গাছে দেখা যায় সোনালী আমের মুকুল। এক বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল গাছ। লাল ফুলে ছেয়ে আছে মাথা। গাছের নিচে ঝরে পড়া শিমুল ফুলের লাল বৃত্ত।

বারান্দা দিয়ে বসন্তের বাতাস এসে চা ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে। শরীরে লেগে হাল্কা হিমহিম ভাব হচ্ছে। গানে শুনা আর বইয়ে পড়া বসন্তের বাতাস এটা নয়। একান্ত নিজের অনুভূতির বসন্ত বাতাস। এই বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ নেই। আছে শৈশবে আর কৈশোরে হারানো বসন্তের জন্য বিলাপ। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পাড়ে একটা শিমুল গাছ ছিল। একটা বাঁশের সাঁকো দিয়ে খাল পাড় হতে হতো। সাঁকো পার হলেই শিমুল গাছের গোড়া। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম। শিমুল ফুল গাছ থেকে ঘুরেঘুরে খালের পানিতে পড়ে ভেসে যাচ্ছে। যে গাছের ফুল এতো সুন্দর আর যে গাছের ফল দিয়ে এতো নরম বালিশ বানানো যায় সেই গাছের গায়ে এতো বড় বড় ভয়ংকর কাটা কেন ভাবতাম! তখন বসন্ত মানে ছিল কোকিলকে ভেঙ্গানো। কোকিল ডাকে কু আমিও ডাকি কু।

গাছপালা, পাখি আর মানুষের এসব কর্মকান্ড দেখে চা শেষ হয়ে যায়। বাসা থেকে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়ি। কাজ শেষ করে বিকেলে ঢাকায় ফিরতে হবে। বিকেলের বাসে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি এসব নিয়ে ভাবনা ন্যাকামী ছাড়া আর কিছু নয়। কারও কাছে আলাপ করলে ভাববে আমি ভাববাদী। বস্তুবাদী দুনিয়ায় ভাবের জায়গা নাই। নরম চিন্তা, নরম অনুভূতি আদিখ্যেতা মনে হয়। কঠিনের জয় জয়কার চারপাশে। তারপরও গাছ, ফুল, পাখি এসব মনকে নাড়া দিলে নিজেকে অপরাধী ভাবার কারণ নাই। এসব দেখে না নড়ে উপায় থাকে না। এখনও মানুষ আছি। এই নড়াচড়া তার ইঙ্গিত। বাসের জানালার পর্দা সরিয়ে দেই। ধানক্ষেতে নতুন চারা লাগানো হয়েছে। হলুদ চারা সবুজ হয়ে উঠেছে। এর ভেতর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে বেড়াচ্ছে সাদা বকের ঝাঁক। সবুজের জমিনে সাদা সাদা ছোপ। পেছনের সিটে দুইজন ইউক্রেন-রাশিয়া নিয়ে আলাপ করছে। সাদা বক উড়ে চলে যাচ্ছে। ইউক্রেন বা রাশিয়ায় নয়, ঝিনাই নদীর তীরে নিজের বাসায়।

গল্প থেকে আরও পড়ুন

লেখক পরিচিতি:

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *