প্রথম পাতা » বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি » তরুণদের গেইম আসক্তি: এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে

তরুণদের গেইম আসক্তি: এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে

Android game addiction

এক জটিল ও ভয়াবহ সময় পার করছি আমরা। করোনা শুধু আমাদের অর্থনীতির মাজাই ভেঙে দেয়নি, বিনষ্ট করেছে আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এই করোনাকালে আমাদের সন্তানদের কাছেই রাখলাম আমরা। কিন্তু তাদেরকে নিক্ষেপ করলাম একটি অযাচিত বেদনাময় ভবিষ্যতের দিকে, জীবনবিধ্বংসী এক প্রযুক্তির মধ্যে। অনলাইন ক্লাসের নামে যে বিষয়টি অভিভাবকদের মাথায় চাপিয়ে দিলাম তা হলো একটি মাল্টিমিডিয়া মোবাইল সেট – সাক্ষাৎ মরণাস্ত্র! সন্তানের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে অনিচ্ছা ও অপারগতা সত্ত্বেও সম্মানিত অভিভাবকগণ মোবাইল নামক যন্ত্রটি কিনে দিতে বাধ্য হলেন।

ছাত্ররা অনলাইনের ক্লাসে প্রথম প্রথম কিছুটা মনোযোগী হলেও পরে আর যুক্ত হলো না। তারা আবিষ্কার করলো মোবাইলে অনলাইনে ক্লাস করা ছাড়াও অনেক কিছুতে যুক্ত হওয়া যায়। তারা খুঁজে পেলো নানা ধরনের গেমস। পাবজিসহ বহু রঙের ও ঢঙের খেলায় তারা আসক্ত হয়ে পড়লো। গলির মোড়ে, বাউন্ডারির ওপরে, ব্রিজ-কালভার্টের পাটাতনে, গাছের নিচে, চিপায়চাপায় তাদের এখন মাথানিচু করে বসে থাকতে দেখা যায়। একসাথে পনেরো বিশজনের মোবাইলসেট চলে দুর্বার গতিতে। মুখে নানারকম খিস্তি। কেউ কাত হয়, কেউ চিৎ হয়, কেউ দাঁড়িয়ে যায়, কেউ শুয়ে, কেউবা আধাশোয়া হয়ে খেলে যায়, খেলারামের মতো!

গ্রামের অনেক দরিদ্র ছেলে শহরে গেলো টাকা উপার্জনের জন্য। তাদের প্রধান চিন্তা হাজার পনেরোর মধ্যে একটা মাল্টিমিডিয়া মোবাইলসেট কেনা। কারো কারো পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলো চিরতরে। যারা ঝরে পড়লো তাদের আর ফেরানো যাবে না। করোনা তাদেরকে নতুন অভিজ্ঞতার এক পৃথিবী দিয়ে গেলো। আমরা হয়তো বুঝতে পারলাম- প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব আছে, এদেশে স্কুল কলেজ খোলা রাখার প্রয়োজন আছে। অথবা করোনা আমাদের আরও বধির করে তুললো। আমরা কিছুই বুঝলাম না হয়তোবা!

একদিন করোনা হয়তো বা চলে যাবে। অনলাইন ক্লাসের আর প্রয়োজন হবে না তখন। কিন্তু ভয় হয়, ছেলেদের হাতে চলে যাওয়া মোবাইলগুলো কি তারা ফেরত দিবে? তাদের পাবজির আসক্তি কি দূর হবে? আমরা ক্লাসে কী বলবো? কার কাছে মোবাইল আছে দাঁড়াও! নাকি বলবো, কার মোবাইল সবচেয়ে বেশি দামি দাঁড়াও! করোনা-উত্তর আমাদের পাঠদান পদ্ধতি কীরূপে ঠেকবে এটা একটা জিজ্ঞাসা। এই প্রজন্মকে আমরা কোনদিকে নিয়ে যাব?

প্রযুক্তিকে আমরা কোনোদিনই আশীর্বাদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারলাম না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য অসামাজিক লোকের ভিড়। গজবে-গুজবে আমাদের ফেসবুক সয়লাব। মৌমাছি ফুল থেকে মধু নিলেও আমরা ভীমরুলের মতো খালি বিষই নিলাম। সে বিষে জর্জরিত হলো আমাদের সমাজ, জীবন ও রাষ্ট্র।

আমরা একসময় দল বেঁধে সিনেমা দেখতাম, খেলাধুলা করতাম, পরিবারের সাথে বসে টেলিভিশন দেখতাম, ঘুরতে যেতাম। নাটক করতাম, নাটক দেখতাম। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সেই সময়গুলো হারিয়ে গেলো। এখন কেউ আর নাটকের মহড়ায় যোগ দেয় না, সিনেমা দেখে না, টিভি দেখে না, পরিবারের সাথে বসে গল্প করে না, ঘুরতেও পছন্দ করে না। আমাদের আচরণ এখন যেমন জীবনবিরোধী তেমনি আমাদের প্রজন্মও জীবনবিধ্বংসী, বেপরোয়া।

আজকের প্রজন্মও একদিন বড় হবে। হয়তো জীবনের স্টিয়ারিংটা হাতে তুলে নিবে। কীভাবে চলবে সেই জীবনের গাড়ি! কত গতি হবে সেই জীবনের! সেই গতিতে বাংলাদেশ পৌঁছবে কোন সূচকে! ততদিন হয়তো আমরা থাকবো না। কিন্তু আমাদের ঘাড়মাথা সমান করা এক প্রজন্ম থেকে যাবে নতুন দিনকে মোকাবেলা করার জন্য!

তখন কি তারা আমাদের অভিশাপ দিতে থাকবে????

  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন

সুজন হামিদ
সুজন হামিদ
জন্ম: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭ খ্রি., শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম তাওয়াকুচায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পারিবারিক জীবনে তিন পুত্র আরিয়ান হামিদ বর্ণ, আদনান হামিদ বর্ষ এবং আহনাফ হামিদ পূর্ণকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। একসময় থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করেছেন অনেক পথনাটকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শকে লালন করেন হৃদয়ে। স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের। গ্রন্থ : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানগ্রন্থ 'বাংলাকোষ'(২০২১)।

ইতল বিতলে আপনার লেখা আছে?আজই লিখুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *